আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হবার জন্য আরো প্রয়োজন প্রচণ্ড পরিশ্রম করার ক্ষমতা। যা বয়স, দৃঢ় মনোবল আর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তৈরি হবে। আর সবশেষ জিনিসটা হল একজন খেলোয়াড় বছর চল্লিশ পেরোলেই কেবল ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।
এবার হাসিমুখে নরম স্বরে শাসাকে কাছে ডাকলেন ব্লেইন, “শাসা, একটু কথা বলা যাবে?”
“অবশ্যই স্যার।” শ্রদ্ধাভরে মাথার টুপি খুলে এগিয়ে এল শাসা।
“আচ্ছা প্রথমে তুমি চার গোল দিলে; কিন্তু শেষে ম্যাক্স পাঁচ দিয়ে দিল। ভাবো তো, কোথায় হয়েছে পরিবর্তনটা?”
মাথা নাড়তেই আচমকা বুঝতে পারল শাসা, “ও আমাকে নিজের অফ সাইডে টেনে নিয়ে গেছে।”
“রাইট।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন, “পাঁচদিন কেউ ওকে অন্য দিক দিয়ে হারাতে পারেনি। তুমি তাই তোমার ঘোড়া নিয়ে সোজা এসে অন্তত একবার হলেও ওর কাছে তেড়ে যাবে। ম্যাক্স দেখো নিজের ওষুধে নিজেই কুপোকাৎ হয়ে পড়বে। এক ডোজই যথেষ্ট হবে।”
“মানে ফাউল করব স্যার?” হা হয়ে চেয়ে রইল শাসা। জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে এরকম একটা উপদেশ দিল। পরিচিত হবার আগে থেকেই ব্লেইনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে শাসা। আর ব্লেইন সত্যিই চায় যে তাদের দুজনার মধ্যেকার সম্পর্কটা আন্তরিক হোক। শুধু যে তার ভালোবাসার নারীরই সন্তান শাসা তাই না, এই বুদ্ধিমান চমৎকার ছেলেটা নিজেকে উদ্যমী আর নির্ভীক হিসেবেও প্রমাণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা, ব্লেইন জানেন তিনি নিজে কখনো পুত্রসন্তানের বাবা হতে পারবেন না।
“ওর নিজের চাল দিয়েই ওকে হারাতে হবে শাশা।” ব্লৈইনের পরামর্শ শুনেই আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শাসার চেহারা।
“ধন্যবাদ স্যার।” শক্ত টুপিটাকে আবার মাথায় পরেই চলে গেল শাসা। তারপর সহিসকে ডেকে বলল, “বান্টি, আমরা দিক পরিবর্তন করব।” টাইগার মার্ককে নিয়ে এগিয়ে এল অ্যাবেল। হালকাভাবে তার কাঁধে হাত রেখে শাসা জানাল, “তুমি ঠিকই বলেছো, আমিও বেল্ট চেক করেই নিয়েছিলাম।” তারপর আবার একই কাজ করার ভঙ্গি করে উঠে দাঁড়াতেই দাঁত বের করে হেসে ফেলল অ্যাবেল। পা-দানি স্পর্শ না করেই টাইগার শার্কের পিছনে উঠে বসল শাসা।
নিজের ওয়াগন হুইল নিয়ে গ্রাউন্ডস্টান্ডের দিকে চলে এলেন ব্লেইন। এদিক-সেদিক তাকিয়ে সেনটেইনকে খুঁজলেন।
একগাদা পুরুষকে নিয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন মিসেস কোর্টনি। স্যার গ্যারি, জেনারেল স্মুট ছাড়াও একজন ব্যাঙ্কার কেবিনেট মিনিস্টার আর ম্যাক্সের বাবাও আছেন।
দেশের খ্যাতিমান খেলোয়াড়ের দল শুধু নয় সেনটেইনের আমন্ত্রণে ওয়েন্টেভ্রেদেন এসেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, মাইনিং ম্যাগনেটসহ প্রভাবশালী আর গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তিত্ব।
দুর্গে প্রত্যেকের জায়গা না হওয়ায় কাছের আলপেন হোটেলেরও সমস্ত রুম ভাড়া নেয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাঁচ দিন ধরেই অবিরাম চলছে এ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। দিন-রাত গান, ক্যাবারে, ফ্যাশন শো, চ্যারিটি সেল, ট্রেজার হান্ট, টেনিস, তাস খেলা, ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য পাঞ্চ অ্যান্ড জুডিসহ আছে নানা অনুষ্ঠান।
“আর আমিই শুধু জানি যে এখানে আসলেই কী ঘটছে।” চোখ খুলে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন। “এতটা পাগলামি সত্যিই অবিস্মরণীয়, দুর্দশার মাঝে থেকেও ওর যে এত সাহস, সে কারণেই এই নারীকে আমি এতটা ভালোবাসি।”
কেউ উনার দিকে তাকিয়ে আছেন অনুভব করেই ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন সেনটেইন, এক মুহূর্তের জন্য মনে হল যেন থেমে গেল পুরো বিশ্বচরাচর। দুজনের মাঝে নেই কোনো সময় কিংবা বাস্তব। তারপরেই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলে সেনটেইন।
ব্লেইনের মনে হল এক্ষুণি ছুটে যান ওই নারীর কাছে; বুক ভরে ঘ্রাণ নেন সেনটেইনের পারফিউমের। কিন্তু তা না করে সংকল্পচিত্তে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোলেন স্ট্যান্ডে ইসাবেলার হুইল চেয়ারের দিকে। আজই প্রথম টুর্নামেন্টে আসার মতন নিজেকে সুস্থ মনে করেছেন ইসাবেলা। তাই তার হুইল চেয়ার ওঠার মতন র্যাম্প বানানোর আদেশ দিয়েছেন সেনটেইন।
বাবাকে দেখেই স্ট্যান্ড থেকে নেমে দৌড়ে এল দুই মেয়ে। এক হাতে হাঁটু পর্যন্ত স্টার্ট ধরে রেখেছে দুজনেই, আরেক হাতে সামলাচ্ছে চওড়া কানঅলা টুপি। ব্লেইনের হাত ধরে হাসতে হাসতে টেনে নিয়ে গেল মায়ের হুইল চেয়ারের কাছে। ইসাবেলার এগিয়ে দেয়া বিবর্ণ গালে কিস্ করলেন ব্লেইন। ওষুধের প্রভাবে তার চোখ দুটো ও ঢুলুঢুলু হয়ে আছে।
“আই মিস ইউ ডার্লিং” ফিসফিস করে সত্যি কথাটাই জানালেন ইসাবেলা।
“আমি ছেলেটার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলাম। এখন ভালো লাগছে?”
“ধন্যবাদ। ওষুধে সত্যিই কাজে দিয়েছে।” এত করুণ হলেও সাহসমাখা ছিল ইসাবেলার হাসিতে। তাই উপুড় হয়ে পরীর গালে আবার কিস করলেন ব্লেইন। তারপর চোখ তুলেই আবার চোরা চোখে সেনটেইনের দিকে তাকালেন। দেখা গেল তিনিও এদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। চোখে চোখ পড়তেই মাথা ঘুরিয়ে নিলেন সেনটেইন।
“পাপা, দলগুলো নেমে আসছে।” বাবাকে ধরে সিটে বসিয়ে দিল তারা। “কামঅন ওয়েল্টেভেদ্রেন” আনন্দে চিৎকার জুড়ে দিল মেয়েটা।
দিক পরিবর্তন করে সাইড লাইনে দলবলসহ চলে এল শাসা। চিবুকের সাথে টুপির দড়ি ঠিকঠাক করেই ব্লেইনের খোঁজে স্ট্যান্ডে তাকাল।
