“আচ্ছা তুমি কি সেই ছেলেটাকে খুঁজে পেয়েছিলে? অ্যাবি আমার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন।” অলস কণ্ঠে জানতে চাইলেন কর্নেল।
সাথে সাথে শক্ত হয়ে গেল সেনটেইনের শরীর; ব্লেইনকে বুঝতে না দিয়ে কোনোমতে মাথা নেড়ে জানালেন, “না।”
“আমার ধারণা ও লোথার ডি লা রে’র ছেলে? তাই না।”
“হ্যাঁ।” একমত হলেন সেনটেইন। “আমার শুধু চিন্তা হচ্ছিল যে পিতার রায়ের পর নিশ্চয় ছেলেটা একা আর অসহায় হয়ে গেছে।”
“ঠিক আছে। আমি ওর খোঁজ করব। আর যদি কোনো খবর পাওয়া যায় তাহলে তোমাকে জানিয়ে দিব।” সেনটেইনের চুলে বিলি কেটে দিলেন ব্লেইন।
এরপর দুজনেই চুপ করে গেলেন। বাইরের দুনিয়ার কথা উঠতেই কেটে গেল দু’জনার আবেগঘন মুহূর্তের রেশ।
“ইসাবেলা কেমন আছে?” সেনটেইনের মনে হল গালের নিচে ব্লেইনের বুকের পেশি আচমকা শক্ত হয়ে গেল। চুরুটে লম্বা একটা টান দিয়ে উত্তর দিলেন ব্লেইন, “অবস্থা দিনকে দিন খারাপই হচ্ছে। এ আলসার ভালো হবার নয়।”
“আয়্যাম সরি ব্লেইন।”
“সে গত সোমবার থেকে হাসপাতালে। তাই তো আমি বাইরে আসার সুযোগ পেলাম। মেয়েরা তাদের দাদীর কাছে।”
“শুনে তো আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে।”
“তোমার সাথে দেখা না হলে আমি মরেই যেতাম।”
খানিক চুপ করে থেকে হাতের চুরুটটাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ব্লেইন, “মনে হচ্ছে ইসাবেলাকে ইংল্যান্ড যেতে হবে। সার্জন দেখবেন। গাইজ হাসপাতালে কাজ করেন। উনি নাকি অলৌকিক কাণ্ডও ঘটাতে পারেন।”
“কখন?” সেনটেইনের বুকের মাঝে যেন কামানের গোলা ঢুকে গেল। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
“বড়দিনের আগেই।”
“তাহলে তো তোমাকেও ওর সাথে যেতে হবে।”
“তার মানে হবে আমার দায়িত্বে ইস্তফা দিয়ে সুযোগগুলো নষ্ট…” চুপ করে গেলেন ব্লেইন। এর আগে নিজের উচচকাক্ষা নিয়ে এভাবে আর সেনটেইনের সাথে কথা বলেননি।
“ভবিষ্যৎ কেবিনেটে যোগ দিয়ে হয়ত প্রধানমন্ত্রিত্ব পেয়ে যাওয়া।” ব্লেইনের কথা শেষ করে দিলেন সেনটেইন।
“আমাকে কি খুব নির্দয় মনে হচ্ছে?” জানতে চাইলেন ব্লেইন, “নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ইসাবেলাকে একা ছেড়ে দিচ্ছি?”
“না”, সিরিয়াস হয়ে উঠলেন সেনটেইন। “উচ্চাকাঙ্ক্ষা কী তা আমি ভালোভাবেই জানি।”
“তারপরেও আমি বলেছিলাম, কিন্তু ইসাবেলাও জোর দিল যেন আমি এখানেই থাকি।” সেনটেইনকে নিজের বুকে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন ব্লেইন। “ও আসলেই এক অসাধারণ মানুষ, এত সাহস। ব্যথা এখন প্রায়ই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। প্রতি রাতেই ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হয়।”
“নিজেকে খানিকটা অপরাধী মনে হলেও তমাকে কাছে পেয়ে সত্যিই খুশি হয়েছি ব্লেইন। ওর কাছ থেকে আর কিছু কেড়ে নিচ্ছি না।”
কিন্তু এটা যে কতবড় মিথ্যে সেটাও তিনি ভালোভাবেই জানেন। ব্লেইন ঘুমিয়ে পড়লেও বহুক্ষণ অব্দি জেগে রইলেন সেনটেইন।
সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখ মেলে দেখলেন যে বাঁশের ফিশিং রড নিয়ে তৈরি হয়ে গেছেন ব্লেইন।
“বিশ মিনিটের মধ্যে নাশতা তৈরি হয়ে যাবে বলে বের হতে না হতেই ফিরে এলেন নিজের হাতের সমান লম্বা এক রুপালি মাছ নিয়ে। তারপর সেনটেইনের কাছে এসে কুটিল হাসি দিয়ে বললেন, “সাঁতার।”
চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন, “তুমি পাগল! জমে নিউমোনিয়ায় মারা যাব এত ঠাণ্ডা পানিতে নামলে।” টেনে নিয়ে তাকে পাথর ভর্তি গভীর পুলের মধ্যে ডুবিয়ে ধরলেন ব্লেইন।
স্বচ্ছ আর পরিষ্কার পানি এতটাই ঠাণ্ডা যে গোসল শেষে দেখা গেল দু’জনেই পুরো গোলাপি হয়ে গেছেন। যাই হোক, এরপর লেবুর রসে ভেজা সুস্বাদু মাছ, বাদামি ব্রেড আর খামারের হলুদ বাটার দিয়ে নাশতাও বেশ উপাদেয় লাগল।
ভরপেট খেয়ে আবারও দুজনে মিলে বিছানায় শুয়ে আছেন; এমন সময় বালিশ থেকে খসে পড়া পালক দিয়ে ব্লেইনের বন্ধ চোখের পাতা আর ঠোঁটের উপর খেলতে গিয়ে সেনটেইন নরম স্বরে জানালেন, “ব্লেইন, আমি ওয়েল্টেভেদেন। বিক্রি করে দিচ্ছি।”
সাথে সাথে চোখ মেলে উঠে বসলেন কর্নেল, “বিক্রি করে দিচ্ছি মানে?”
“অর্থাৎ দিতে হচ্ছে।” সহজভাবেই উত্তর দিলেন সেনটেইন, “এস্টেট, বাড়ি আর যাবতীয় সবকিছু।”
“কিন্তু কেন ডার্লিং? আমি জানি তোমার কাছে এগুলোর মূল্য কতটা তাহলে কেন বিক্রি করে দিচ্ছো?”
“ইয়েস। ওয়েল্টেভ্রেদেন আমার কাছে অনেক কিছু। কিন্তু তার চেয়ে বেশি হচ্ছে হানি মাইন। যদি এস্টেটটা বিক্রি করে দেই তাহলে নগণ্য পরিমাণে হলেও খনিটাকে বাঁচাবার সুযোগ পেয়ে যাব।”
“অবস্থা যে এতটা খারাপ, আমার তো ধারণাই ছিল না।”
“তুমি কেন, কেউ জানে না মাই লাভ।”
“কিন্তু তারপরেও হানি থেকে কি কোনো লাভ হচ্ছে না?”
“না ব্লেইন। আজকাল কেউই আর হীরে কেনে না। এই ভয়ংকর সন্ধ্যা আমাদের কোর্টকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে যা পেতাম এখন তার অর্ধেকেরও কম পাই। কিন্তু এ সময়টা যদি কাটিয়ে দিতে পারি কিংবা পৃথিবীর অর্থনৈতিক অবস্থা যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে হয়ত” থেমে গেলেন সেনটেইন। “তাই ওয়েন্টেভেদেনটা বিক্রি করতেই হবে। তাহলে আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত টিকে থাকতে পারব আর ততদিন পর্যন্ত নিশ্চয় এই মন্দা আর থাকবে না।”
“হ্যাঁ, তা তো বটেই, আচ্ছা সেনটেইন, আমার কাছে টাকা আছে। যদি
কর্নেলের ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হাসলেন সেনটেইন।
