“ওহ!” অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন সেনটেইন।
“এত সুন্দর কিছুর এতটা নিষ্ঠুর পরিণতি কেমন করে হয়? আমরা একে অন্যকে তো বটেই ধ্বংস করেছি আমাদের ভালোবাসার সন্তানকেও।”
কাছেই কারো উপস্থিতি টের পেয়ে অবশেষে চোখ খুলে তাকালেন। ব্লেইন এসেছেন।
“এবারে বুঝতে পারছি যে তোমাকে ভালোবাসা কতটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।” ম্যালকমসূকে দেখেই অপরাধবোধ আর সকল ব্যথা ভুলে গেলেন সেনটেইন।
তাঁর হাত দুটো ধরে ব্লেইন জানালেন, “নিজের সাথে অনেক যুদ্ধ করছি যেন তোমার সামনে না আসতে হয়। তবে আজ তুমি যা করলে এরপর দায়িত্ব অথবা সম্মান কোনোকিছুই আমার কাছে আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুমি আসলে আমারই অংশ। তোমার সাথেই থাকতে চাই।”
“কবে?”
“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”
“ব্লেইন, আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনে অন্যদেরকে শুধু যন্ত্রণাই দিয়েছি। আর নয়। আমিও তোমাকে চাই কিন্তু তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে নয়।”
“ব্যাপারটা হয়ত সত্যিই বেশ কঠিন; কিন্তু আমি তোমাকে চাই”
“আমি জানি।” উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন, “আমাকে জড়িয়ে ধরে। ব্লেইন, খানিকক্ষণের জন্য হলেও জড়িয়ে ধরো।”
অন্যদিকে শূন্য আদালত প্রাঙ্গণে সেনটেইনকে না পেয়ে কোর্ট রুমের দরজা খুলে ঢুকতে যাবেন অ্যাবি আর চোখের সামনে দেখলেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন কর্নেল আর সেনটেইন। যেন পরিবেশ নিয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আস্তে করে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালেন অ্যাবি। আর মনে মনে প্রার্থনা করলেন, “ঈশ্বর, এই লোকটা যেন তাকে পূর্ণ করতে পারে।”
***
“ইডেন বোধ হয় এরকমই ছিল” আপন মনেই ভাবলেন সেনটেইন, “আর ইও নিশ্চয় আমার মতই অনুভব করেছিলেন।”
শূন্য কোর্টরুমে কাটানো মুহূর্তগুলোর পর প্রায় পাঁচ মাস কেটে গেছে। এর মাঝে একবারও কর্নেল আর সেনটেইন দুজনের সাথে দেখা করেননি। এর মাঝে ব্লেইন ছিলেন উইন্ডহকে আর সেনটেইন ওয়েন্টেভেদ্রেনে যুদ্ধ করেছেন হিরের লোকসান সামলে নিজের খনিকে তুলে দাঁড় করানোর জন্যে।
এতদসত্ত্বেও ক্লান্ত, শ্রান্ত সেনটেইন প্রতি মুহূর্তে ভেবেছেন ব্লেইনের কথা। স্বভাবসুলভ দ্রুতগতি ছেড়ে এখন গাড়ি চালাচ্ছেন অত্যন্ত ধীরে। সেই ভোরবেলায় ওয়েল্টেভ্রেদেন ছেড়ে চলে এসেছেন একশ বিশ মাইল। রিয়ার ভিউ মিররে নিজের চেহারা দেখে নিয়ে ভাবলেন, “আজ কোনো হতাশা নয়। কেবল ব্লেইন আর এই জাদুকরী প্রকৃতির কথাই ভাবব।” উপত্যকার একেবারে চূড়ায় উঠে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন সেনটেইন। চোখের সামনে বিশাল সমুদ্র, বেন গুয়েলার সবুজ স্রোত। খোলা জানালা দিয়ে আসা সমুদ্রের বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল চুল। লাল, কমলা আর হলুদ রঙের বুনোফুলে ছাওয়া সমুদ্র তীরের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালেন সেনটেইন।
শেষ চিঠিতেই ব্লেইন সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, “জায়গা দেখে আঁতকে উঠো না। মাত্র দুইটা রুম, মাটির ল্যাট্রিন আর মাটির চুলা। ছোটবেলায় এখানেই ছুটি কাটাতাম আমরা, তবে বাবা মারা যাবার পর থেকে আমি একাই আসি। আর কাউকে কখনো আনিনি। তার মানে তুমিই প্রথম।” রাস্তার একটা ম্যাপও দিয়েছিলেন সাথে।
তাড়াতাড়ি কাগজটা বের করে নিচে তাকালেন সেনটেইন। খড়ের ছাদ। বয়সের ভারে কালো হয়ে গেলেও হোয়াইট ওয়াশ করা দেয়ালগুলো ফেনার মতই উজ্জ্বল। চিমনি থেকে ধোয়াও উড়ছে। দালানের পেছনেই দেখা যাচ্ছে মানুষের অবয়ব। সাথে সাথে চঞ্চল হয়ে উঠলেন সেনটেইন।
কিন্তু বহুল ব্যবহৃত ফোর্ডের ইঞ্জিন কিছুতেই স্টার্ট নিচ্ছে না। এতই দুরাবস্থা চলছে যে অতীতের প্রতিবছর নতুন ডেইমলারের স্মৃতি যেন গত জন্মের কথা মনে হল।
অতঃপর হ্যান্ডব্রেক ছেড়ে ধাক্কা দিয়ে কোনোমতে পৌঁছালেন নিচে। দূর থেকেই সেনটেইনকে দেখে দৌড়ে এলেন ব্লেইন। পরনে কেবল একজোড়া খাকি শর্টস আর হাতে জ্যান্ত লবস্টার। সমুদ্রের নোনা জল লেগে লম্বা চুলগুলো ভিজে কোঁকড়া হয়ে আছে। কর্নেলের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেনটেইন।
***
খোলা চুলার সামনে তেপায়া টুলের উপর বসে আছেন ব্লেইন। শেভিং মগ আর ব্রাশ নিয়ে তৈরি সেনটেইন। ক্ষুণ্ণ মুখে অনুযোগ করলেন কর্নেল।
“পুরো পাঁচ মাস লেগেছে এত বড় করতে, আমার কত সাধের দাড়ি।”
“না” দৃঢ়কণ্ঠে জানালেন, সেনটেইন, “এর চেয়ে বরঞ্চ একটা শজারুকে কিস করা ভালো হবে।” নিচু হয়ে কর্নেলের উপরের ঠোঁটের দু’পাশে ফোম লাগিয়ে দিলেন।
উদ্দাম ভালোবাসবাসির পর এখনো উদাম শরীরেই টুলের উপর বসে আছেন ব্লেইন। খেয়াল হতেই তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন সেনটেইন। বুঝতে পেরে চট করে তোয়ালে টেনে নিলেন কর্নেল। মাথা নেড়ে সেনটেইন বললেন, “দ্যাটস বেটার। এবার কাজ করা যাক।” টেবিলের উপর থেকে রেজার তুলে দ্রুত একের পর এক টান দিলেন।
“এটা তুমি কোথায় শিখেছ?”
“আমার পাপা! বাবার দাড়ি সবসময় আমিই টেনে দিতাম। এখন স্থির হয়ে বসো!”
কী যেন একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন ব্লেইন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কাজ সেরে, রেজার রেখে সরেও এলেন। পিছিয়ে এসে পরীক্ষা করে বললেন, “হুমম।” তারপর একটুও দ্বিধা না করে ঝপাৎ করে বসে গেলেন ব্লেইনের কোলে। খুলে পড়ে গেল কর্নেলের কোমরের ভোয়ালে।
খানিক বাদে আগুন থেকে ব্লেইনকে চুরুট ধরিয়ে এনে দিলেন সেনটেইন। তারপর দুজনেই ঢুকে পড়লেন কম্বলের নিচে।”
