গোমড়া মুখ করে উঠে দাঁড়ালেন প্রসিকিউটর। তারপর বললেন, “না। মিসেস কোর্টনির জন্য আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।”
মিসেস কোর্টনি, আপনার আনীত প্রমাণের জন্য আদালত আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এখন আপনি নিজ আসনে গিয়ে বসুন।”
আরো একবার গ্যালারির দিকে তাকিয়ে ছেলেকে দেখার জন্য সেনটেইন এতটাই উদগ্রীব হয়ে উঠলেন যে, নামতে গিয়ে বেঞ্চে পা বেঁধে পড়ে গেলেন। সাথে সাথে যার যার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন অ্যাবি আর কর্নেল ব্লেইন। আব্রাহামই আগে সেনটেইনের কাছে পৌঁছে অতঃপর হাত ধরে নিয়ে এসে বসিয়ে দিলেন চেয়ারে।
“অ্যাবি” ফিসফিস করে উঠলেন সেনটেইন, “আমি যখন বয়ান দিচ্ছিলাম তখন গ্যালারিতে একটা কিশোর ছেলে ছিল। আমি বর্ণনা দিচ্ছি। সোনালি চুল, বয়স তের হবে, যদিও সতের দেখায়। নাম ম্যানফ্রেড, ম্যানফ্রেড ডি লা রে, আমি ওর সাথে কথা বলতে চাই।”
“এখন?” অবাক হয়ে গেলেন অ্যাবি।
“এক্ষুণি।”
“কিন্তু চূড়ান্ত রায় মিস্ করে ফেলব তো।”
“গো!” ফোঁস করে উঠলেন সেনটেইন, “ছেলেটাকে খুঁজে বার করুন। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ত্রস্ত ভঙ্গিতে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন আব্রাহাম।
আবার উঠে দাঁড়ালেন রেজিনাল্ড ওসমন্ড। সেনটেইনের বাক্যসমূহের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আবেগপ্রবণ ভাষায় জানালেন, “বন্দির বিশ্বাস যে তিনি মিসেস কোর্টনির দাক্ষিণ্য পাবার যোগ্য।” এভাবে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে কেন লোথারকে দয়াশীলতা দেখানো উচিত তার ওপরে বক্তৃতা দিলেও সেনটেইন বাবার চেয়ে বেশি ছেলেকে নিয়েই ভাবছেন। ওর চোখের দৃষ্টিতে এমন এক ঘৃণা ছিল যা তিনি চাইলেও ভুলতে পারছেন না আর ম্যানফ্রেডের সেই তাকেই অভিযুক্ত করেছে অপরাধী হিসেবে। বহু বছর ধরেই যে অপরাধীকে তিনি মাটিচাপা দিয়ে রেখেছেন।
বুঝতে পারছেন কেন এতদিন স্বার্থপরের মত ছেলের চেহারা না দেখে থেকেছেন। কারণ মাতৃহৃদয় ভালোভাবেই জানে যে ওই মুখ দেখার সাথে সাথে এত কষ্ট করে গড়ে তোলা অবরোধ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। আর ঠিক তখন রেজিনাল্ড ওসমন্ড তার সবশেষ আর্তি পেশ করলেন।
“লোথার ডি লা রে’র বহু কর্মই তাকে একজন সৎ আর সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে মাই লর্ড, যদিও উনার সাজা অনেক তীব্র হওয়া উচিত তথাপি আমি সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আকুতি জানাব যেন এই অঙ্গ হারানো দুর্ভাগা মানুষটার প্রতি দয়া দেখানো হয়।”
আবারো নিশুপ হয়ে গেল পুরো কক্ষ। এভাবে বেশ কয়েক সেকেন্ড কেটে যাবার পর চোখ তুলে তাকালেন হর্থন, বললেন
“ধন্যবাদ মি. ওসমন্ড। দুপুর দুইটা পর্যন্ত কোর্ট মুলতবি করা হল। তারপর রায় ঘোষণা করা হবে।”
তাড়াহুড়া করে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে অ্যাবিকে খুঁজলেন সেনটেইন। কোর্ট হাউজের সামনের দিকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পুলিশের গার্ডদের সাথে কথা বলছিলেন আব্রাহাম। কিন্তু সেনটেইনকে দেখার সাথে সাথে দৌড়ে এলেন। “খুঁজে পেয়েছেন ওকে?” উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“অ্যায়াম সরি! কিন্তু এরকম চেহারার কেউ নেই এখানে।”
“যেভাবেই হোক ছেলেটাকে খুঁজে বার করুন অ্যাবি। যত টাকা লাগে খরচ করুন। পুরো শহরে খুঁজে দেখুন। ছেলেটাকে আনা চাই।”
“অল রাইট, সেনটেইন। আমি দেখছি কী করা যায়। ওর নাম বললেন ম্যানফ্রেড ডি লা রে, বন্দির কিছু হয় নাকি?” .
“ওর ছেলে।”
“ঠিক আছে।” তারপর চোখে গভীর দুর্ভাবনা নিয়ে সেনটেইনের দিকে তাকালেন অ্যাবি, “আমি কি জানতে পারি কেন এত মরিয়া হয়ে ছেলেটার সাথে দেখা করতে চাইছেন?”
“না, পারেন না।”
অ্যাবি চলে যেতেই আপন মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলেন সেনটেইন, “কেন আমি ওকে দেখতে চাই” কারণটাও বেশ স্পষ্ট, “কারণ ও আমার ছেলে।”
***
৫. রায় ঘোষণা
“প্রথম তিন অপরাধের জন্য বন্দির সর্বোচ্চ শাস্তি হল ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু,” রায় ঘোষণার জন্য পুনরায় বিচারকের আসনে বসে জানালেন হর্থন, “তথাপি, আমার তেত্রিশ বছরের কর্মজীবনে যা দেখিনি আজ তাই অবলোকন করলাম এই কোর্টরুমে। মিসেস সেনটেইন ডি থাইরী কোর্টনি স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে সাক্ষ্য দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উনার মহানুভবতা আমলে নিয়ে এখন পরবর্তী রায় ঘোষণা করা হবে। নিজ আসন থেকে সেনটেইনের উদ্দেশে খানিক মাথা ঝুঁকিয়ে হর্থন আদেশ দিলেন,
“বন্দিকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য বলা হচ্ছে।”
“লোথার ডি লা রে তোমার বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণসহ প্রমাণিত হওয়াতে তোমাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হল।”
বিচারকার্য শুরু হবার পর থেকে এই প্রথমবারের মত লোথার ডি লা রে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। রায় শুনে কেঁপে উঠল তার ঠোঁট, অক্ষত হাতটা উঠিয়ে কালো রোব পরিহিত বিচারকের কাছে আকুতি জানিয়ে চিৎকার করে বললেন,
“আমাকে বরঞ্চ মেরেই ফেলুন, জন্তুর মত খাঁচায় আটকে না রেখে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিন।
তাড়াতাড়ি কারারক্ষীরা এসে দু’পাশ থেকে লোথারকে টেনে নিয়ে গেল বাইরে। এমনকি প্রধান বিচারক পর্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেলেন কথাগুলো শুনে। আর দর্শকেরা তো এমনভাবে দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল যেন শেষকৃত্যের শোকার্ত বাহিনি।
“আমাকে মেরে ফেলুন। নিজের আসনে বসে রইলেন সেনটেইন। বুঝতে পারছেন এ তিনটা শব্দ তাকে সারা জীবন ধরে তাড়িয়ে বেড়াবে। মাথা নিচু করে হাত দিয়ে চোখ ঢাকলেন আর সাথে সাথে ভেসে উঠল সেই কালহারি মরুভূমিতে দেখা লোধারের চিত্র।
