দ্বিধায় পড়ে গেলেন সেনটেইন, “আমি সর্বদা ব্যবসায়ের নীতি মেনেই পদক্ষেপ নিয়েছি। যাই হোক, লোথার ডি লা রে’র অবস্থান থেকে অবশ্য আমার কর্মপন্থা ইচ্ছেকৃত বলেই মনে হবে।”
“আপনি উনাকে ধ্বংস করে ফেলেছেন এ ধরনের কোনো অভিযোগ কি তিনি তুলেছেন?”
চোখ নামিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলে উঠলেন সেনটেইন।
“আয়্যাম সরি মিসেস কোর্টনি, আপনি কি একটু উচ্চস্বরে জানাবেন কী বলেছেন?”
ভয়ংকরভাবে ক্ষেপে উঠলেন সেনটেইন; গলা কাঁপিয়ে বললেন, “ইয়েস; তার ধারণা আমিই তাকে ধ্বংস করেছি।”
“মিঃ ওসমন্ড!” নিজের চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন হর্থন। তীব্রকণ্ঠে জানালেন, “আপনার সাক্ষীর সাথে আরো নমনীয় আচরণ করার জন্য আদেশ করা হচ্ছে। তারপর আবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ঘোষণা দিলেন যে মিসেস কোর্টনির সুবিধার্থে কোর্ট ১৫ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হল।
নির্দিষ্ট সময় শেষে আবারো কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন সেনটেইন। জেরা করার জন্যে উঠে এলেন মি. ওসমন্ড।
তৃতীয় সারি থেকে ব্লেইন ম্যালকমস হাসির মাধ্যমে সেনটেইনকে উৎসাহিত করতে চাইলেন; কিন্তু দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন সেনটেইন। নয়ত কোর্টরুমে উপস্থিত প্রতিটি লোক জেনে যাবে তার অনুভূতির কথা।
তবে ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝে গেলেন প্রতিদিন সকালবেলায় লোথার ডি লা রে’র চঞ্চল চোখ জোড়া কাকে খোঁজে। গ্যালারির একেবারে কোনার দিকে যেন লোথারেরই চোখ তার দিকে তীব্র হলুদ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। টোপাজ পাথরের মত হলুদ, ভয়ংকর আর উজ্জ্বল চোখ জোড়ার ওপর বাঁকানো দ্রু। কিন্তু এগুলোর মালিক লোথার নয়; তরুণ আর শক্তিশালী এই চেহারা কার তৎক্ষণাৎ বুঝে গেলেন সেনটেইন কোর্টনি। নিজের ছোট ছেলেকে তিনি কখনোই দেখেননি। এমনকি তার ইচ্ছাতেই জন্ম নেবার সাথে সাথে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ওই ছোট্ট শরীর। হঠাৎ করেই নিজের সমস্ত সত্তাজুড়ে এমন এক শূন্যতা অনুভব করলেন যে, কেঁদে ফেললেন সেইটেইন।
“মিসেস কোর্টনি! মিসেস কোটনি!” হর্থনের চিৎকারে সচকিত হয়ে মাথা তুলে তাকালেন সেনটেইন।
“আপনি ঠিক আছেন তো মিসেস কোর্টনি?”
“ধন্যবাদ, মাই লর্ড, আমি পুরোপুরি সুস্থ।” বহু কষ্টে নিজেকে সামলালেন যেন ওই চেহারাটার দিকে আর চোখ না চলে যায়।
“তো মিসেস কোর্টনি, আপনি শটগান নিতে যাবার সময়েও কি উনি আপনাকে বাধা দেননি?”
“না।”
“আপনি আমাদেরকে এরই মাঝে জানিয়েছেন যে, শটগান হাতে নিয়ে অস্ত্রটাকে রিলোড করার চেষ্টা করেছিলেন?”
“কারেক্ট।”
“তাহলে রিলোড করতে পারলে কি অস্ত্রটাকে ব্যবহারও করতেন?”
“ইয়েস।”
“মানে আপনি হত্যা করার জন্যে গুলি করতেন?”
“এবারে অবজেকশন জানালো বাদী পক্ষের উকিল। হর্থনও জানালেন সেনটেইন চাইলে এ প্রশ্নের উত্তর নাও দিতে পারেন। কিন্তু সেনটেইন উত্তরে পরিষ্কার কণ্ঠে জানালেন, “ইয়েস আমি তাকে খুন করতাম আর তিনিও জানেন যে সুযোগ পেলেই আমি তাকে মেরে ফেলব।”
উত্তেজনায় ফেটে পড়ল পুরো আদালতকক্ষ। আর এতসব হট্টগোলের মধ্যে চোখ তুলে গ্যালারির দিকে তাকালেন সেনটেইন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। ম্যানফ্রেড চলে গেছে। কারণটা কিছুতেই অনুমান করতে পারলেন সেনটেইন। এদিকে ওসমন্ড আবার প্রশ্ন শুরু করায় সেদিকে মনোযোগ দিতেও বাধ্য হলেন। তবে প্রশ্নটা খেয়াল না করায় বললেন, “আমি বুঝতে পারছি না।” “বন্দি কি আপনার ওপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছেন যেন তাকে গুলি ছুঁড়তে না পারেন?”
“না। কেবল শটগানটাকে সরিয়ে নিয়েছে।”
“আর তারপরেই আপনি তার কব্জি কামড়ে দিয়েছেন। প্রথমে যেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে ও পরবর্তীতে হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু পালাবার সময়ে উনি কি আপনার কোনো ক্ষতি করে গিয়েছিলেন।”
“না।“
“ব্যথা তো নিশ্চয় অত্যন্ত তীব্র ছিল। তারপরেও তিনি আপনার কোনো রকম ক্ষতি করে নি?”
“না, মাথা নাড়লেন সেনটেইন,
“বরঞ্চ সে–” উপযুক্ত শব্দ খুঁজলেন, যেন সঠিক কী বলবেন পাচ্ছেন না, তারপর জানালেন,
“অদ্ভুত রকমের ভদ্র আচরণ করেছে।”
“ঠিক আছে। এবার বলুন, বন্দি সে স্থান ত্যাগের পূর্বে আপনার টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পানি কি রেখে গিয়েছিলেন?”
“হুম। চেক করে দেখেছেন যেন আমি পর্যাপ্ত পানি পাই আর এও বলেছেন যেন উদ্ধারকারী দল আসা পর্যন্ত ভাঙা গাড়িটার কাছ থেকে দূরে না যাই।”
“এবারে মিসেস কোর্টনি খানিকটা আমতা আমতা করে উঠলেন। ওসমন্ড। “সংবাদপত্রে এসেছে যে, বন্দি নাকি আপনার সম্মানে আঘাত করে এমন আচরণ-”।
তেড়ে উঠলেন সেনটেইন, “এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা আর বানোয়াট।”
“ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমার আর একটা মাত্র প্রশ্ন আছে। আপনি তো বন্দিকে ভালোভাবেই চেনেন। তাকে কখনো গুলি করতে দেখেছিলেন?”
“দেখেছি।”
“আপনার বরাত দিয়েই বলছি, যদি বন্দি চাইতেন তাহলে অনায়াসেই আপনি কিংবা কর্নেল ম্যালকম অথবা পুলিশ বাহিনির যে কাউকে গুলি করতে পারতেন?”
“লোথার ডি লা রে’র মত এতটা দক্ষ বন্দুকবাজ আমি খুব বেশি দেখিনি। কয়েকবারই এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যাতে উনি চাইলে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে পারতেন।”
“আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই, মাই লর্ড।”
নিজের নোটপ্যাডে খানিকক্ষণ খসখস করে লিখে পেনসিল সরিয়ে রাখলেন হর্থন। তারপর বাদীপক্ষের উকিলের কাছে জানতে চাইলেন, “আপনি কি সাক্ষীকে ক্রস একজামিন করতে চান?”
