সেনটেইনের পাশে বসে মাথা নাড়লেন অ্যাবি। “বলেছিলাম না, ফাঁসিই হবে। আর কোনো সন্দেহ নেই।”
হট্টগোল শুনে প্রচণ্ড জোরে নিজের হাতুড়ি ঠুকে চিৎকার করে উঠলেন হর্থন, “চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে ডিফেন্সের পক্ষ থেকে আর কোনো ক্ষমা প্রার্থনা আছে কিনা শুনতে চাই।” সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন ডিফেন্সের তরুণ ব্যারিস্টার।
লোথার ডি লা রে নিজের ডিফেন্সের ব্যয় বহনে অক্ষম হওয়ায় আদালত থেকেই তার জন্য মিঃ রেজিনান্ড ওসমশুকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
“মাই লর্ড, মিটিগেশন কিংবা অপরাধ উপশমের জন্যে আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে হাজির করতে চাই।”
“মি, ওজমন্ড এই পর্যায়ে এসে আপনি নতুন করে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থিত করতে চাইছেন?” রেজিনাল্ডের কথা শুনে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন হর্থন, “ঠিক আছে, আপনাকে অনুমতি দেয়া হল।”
ধন্যবাদ মাই লর্ড” নিজের আসন্ন সফলতার আনন্দে এতই খুশি হলেন যে প্রায় চিৎকার করে ডাকলেন ওসমন্ড, “প্লিজ স্ট্যান্ডে আসুন মিসেস সেনটেইন ডি থাইরী কোর্টনি।”
সাথে সাথে যেন বিস্ময়ে জমে গেল পুরো কোর্টর রুম। এমনকি হর্থন পর্যন্ত চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। কিন্তু সেনটেইন নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই সবাই এত হৈ-চৈ শুরু করে দিল যে, পুনরায় গর্জে উঠলেন হর্থন “এ ধরনের চিৎকার-চেঁচামেচি আমি কখনোই বরদাশত করব না। সবার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হবে। সাথে সাথে আবার শান্ত হয়ে গেল সবাই। এমনকি সাংবাদিকেরা পর্যন্ত নিজ নিজ আসনে বসে পড়ল।
সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সত্য বলার শপথ নিলেন সেনটেইন। উঠে এলেন মি. ওসমন্ড, “মিসেস কোর্টনি আপনি কি আদালতকে জানাবেন যে কতদিন ধরে অভিযুক্তকে চেনেন-” তাড়াতাড়ি নিজেকে শুধরে নিয়ে বললেন, “অভিযুক্ত নয় বন্দি লোথার ডি লা রেকে কতদিন ধরে চেনেন?”
“প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে।” আড়চোখে লোখারের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন সেনটেইন।
“আপনাদের প্রথম সাক্ষাতের সময়টা কি দয়া করে ব্যাখ্যা করবেন?”
“১৯১৯ সালে প্রোটিয়া ক্যাসল ডুবে যাবার পর পানিতে ভেসে আমি স্কেলিটন উপকূলে চলে আসি। তারপর প্রায় দেড় বছর ধরে একদল স্যান বুশম্যানের সাথে পুরো কালাহারি মরুভূমিতে ঘুরে বেড়িয়েছি।”
এই গল্প সকলেরই জানা। কিন্তু এখন সেনটেইনের নিজের জবানীতে রোমাঞ্চকর এই গল্প যেন চোখের সামনে মূর্ত হয়ে নবজীবন লাভ করল।
একে একে জানালেন তার হতাশা, একাকিতু আর ভয়ংকর পরিশ্রমের কথা। শুনে পিনপতন নীরবতা নেমে এল পুরো কক্ষে। সবাই যেন তার সাথে ঘুরে বেড়াল সেই মরুর বুকে। কোমরে বাঁধা শিশু পুত্রকে নিয়ে ঘোড়ার চিহ্ন ধরে ক্যাম্প ফায়ারের কাছে ছুটে গিয়ে সিংহের কবলে পড়ার কথা শুনে শিহরিত হল আদালতকক্ষে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ। রোমহর্ষক সেই স্মৃতি স্মরণ করতেই আচমকা থেমে গেলেন সেনটেইন।
তাড়াতাড়ি করে তাগাদা দিলেন ওসমন্ড “সেই সময়ই কি লোথার ডি লা রে’র সাথে পরিচয় হয়?”
নিজেকে সামলে নিয়ে সেনটেইন জানালেন, “আমি দুঃখিত। আসলে সবকিছু এমনভাবে মনে পড়ে যাচ্ছে যে নিজেকে ধরে রাখা
“প্লিজ মিসেস কোর্টনি, আপনি চাইলে আদালত আপনাকে সময়
“না, না, মাই লর্ড, এর কোনো প্রয়োজন নেই।” কাধ নেড়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন সেনটেইন, “হ্যাঁ, সে সময়েই লোথার আসে। তার ক্যাম্পও ধারে-কাছে থাকায় সিংহের গর্জন শুনেই সতর্ক হয়ে উঠেছিল, ঠিক যখন সিংহটা আমার পায়ে নখর ঢুকিয়ে দিতে এসেছে তখনি গুলি চালায় প্রাণীটার ওপর।”
“তার মানে তিনি আপনার জীবন রক্ষা করেছিলেন।”
“হ্যাঁ, আমাকে আর আমার শিশুপুত্রকে নিষ্ঠুর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন।”
ঘটনার নাটকীয়তায় যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল পুরো আদালতকক্ষ। মাথা নামিয়ে নিয়ে উত্তেজনাটা সবাইকে উপভোগ করার সুযোগ দিলেন মি. ওসমস্ত। তারপর খানিক বাদে জানতে চাইলেন,
“এরপরে কী ঘটেছিল ম্যাডাম?”
“সিংহটা ছুটে এসে আমাকে গাছের উপর ছুঁড়ে দিয়েছিল। তাই বিশাল মোপানির উপর থেকে পড়ে গিয়ে আমার অবস্থাও ছিল মৃতপ্রায়। এরপরেও বহুদিন ধরে আমি অচেতন ছিলাম। নিজের কিংবা আমার ছেলের কোনো রকম দেখভালও করতে পারতাম না।”
“এক্ষেত্রে বন্দির প্রতিক্রিয়া কী ছিল?”
“উনিই আমার সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। আমার ক্ষত পরিষ্কার করতেন। আমার বাচ্চারও দেখাশোনা করেছেন।”
“তার মানে দ্বিতীয়বারের মত আপনার জীবন বাঁচিয়েছেন।”
“ইয়েস” মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন সেনটেইন।
“তো, এখন মিসেস কোর্টনি, এতগুলো বছর কেটে যাবার পরে বর্তমানে আপনি অত্যন্ত ধনী এক নারী?”
সেনটেইন চুপ করে রইলেন; ওসমন্ড বলেই চললেন, “হঠাৎ করেই তিন বছর আগে আমাদের বন্দি আপনার সম্মুখে উদয় হয়ে তার ফিশিং ও ক্যানিং এন্টারপ্রাইজের জন্য আর্থিক সহযোগিতার আবেদন করেন?”
“উনি আমার কাছে নয়, আমার কোম্পানি কোর্টনি মাইনিং ও ফিনান্সের কাছে আবেদন করেন ঋণের জন্যে।”
এরপর একে একে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনার পর লোথারের ক্যানিং ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়া পর্যন্ত এসে থামেন ওসমন্ড। “তো মিসেস কোর্টনি তার মানে লোথার ডি লা রে’র বিশ্বাস যে ইচ্ছেকৃতভাবে না হলেও আপনার কর্মকান্ডের মাধ্যমে উনার সাথে অন্যায় করা হয়েছে সেটা একেবারে অমূলক নয়?”
