হাতঘড়ি চেক করে দেখলেন সেনটেইন, “চল্লিশ মিনিট পরেই আবার আদালতের কার্যক্রম শুরু হবে। আমাদের ওঠা উচিত।”
তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন অ্যাবি, “পুরো ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখার জন্য আমি আসলে মুখিয়ে আছি।”
“এখন না, অ্যাবি। তাকের ওপরে রাখা আয়নায় নিজের টুপি ঠিক করে নিলেন সেনটেইন। কালো কাপড়ের ভেইলটাকে এক চোখের উপর দিয়ে ছোট্ট কোনাটাকে কাত করে দিলেন। তারপর কুমিরের চামড়ার হ্যান্ডব্যাগকে বগলের নিচে নিয়ে বললেন, “আপনার কাছ থেকে আরও বিশদ কিছু শোনার আগে আসলেই কী হচ্ছে চলুন তা দেখি।”
অ্যাবির ফোর্ডে চেপে পাহাড়ে উঠে এল দুজনে। আদালত প্রাঙ্গণের সামনে জড়ো হওয়া সাংবাদিকের দল সাথে সাথে ক্যামেরা নিয়ে চলে এল ফোর্ডের জানালাতে। হাতব্যাগ মুখের সামনে ধরে নেমে এলেন সেনটেইন। তবু সাংবাদিকরা ঘিরে ধরে ছুঁড়ে দিল নানান প্রশ্ন,
“হিরেগুলোর বিষয়ে কি কোনো ডিল হবে?”
“এ ব্যাপারে আপনার মনোভাব কী?”
দ্রুত এগিয়ে এসে সেনটেইনের কব্জি ধরে ভিড় থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন অ্যাবি।
“আমার জন্য এখানেই অপেক্ষা করুন” বলেই অ্যাবির হাত ছাড়িয়ে বারান্দা পার হয়ে লেডিস টয়লেটে চলে গেলেন সেনটেইন। এর ঠিক বিপরীত পাশেই ডিফেন্স রুম। কেউ পিছু নেয়নি নিশ্চিত হয়ে সোজা রুমে ঢুকে তীক্ষ্ণ গলায় জানালেন, “এক্সকিউজ মি জেন্টেলম্যান, আমি আপনাদের সাথে কয়েকটা কথা বলতে চাই।”
অ্যাবিকে যেখানে রেখে গিয়েছিলেন কয়েক মিনিট পরে ফিরে এসেও তাকে সেখানেই পেলেন সেনটেইন।
“কর্নেল ম্যালকমস এসেছেন” অ্যাবির মুখে কথাটা শোনার সাথে সাথে বাকি জগৎ বিস্মৃত হয়ে গেলেন লেডি কোর্টনি।
তাড়াতাড়ি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, “কোথায়?”
“আবার চলেও গেছেন।” অ্যাবির উত্তরের সাথে সাথে আদালতের জোড়া দরজা খুলে যাওয়ায় পিলপিল করে মানুষ ঢুকতে শুরু করল ভেতরে।
“চার্লি আমাদের জন্য সিট রেখে দিয়েছে। ভিড়ের মধ্যে যাবার প্রয়োজন নেই।” অ্যাবি সেনটেইনের হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেলেন সামনে।
সন্তর্পণে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ব্লেইনের লম্বা-চওড়া অবয়ব খুঁজলেন সেনটেইন। প্রেসের লোকজন সরে যেতেই দেখা গেল তার বিপরীত পাশের সারিতেই বসে আছেন কর্নেল। তিনি নিজেও সেনটেইনকে খুঁজছিলেন। তাই পরস্পরের চোখে চোখ পড়া মাত্রই কোনো রকম হাসি বিনিময় ছাড়াই হয়ে গেল বিস্তর কথা।
“ওই তো এসে গেছে।” আচমকা অ্যাবির কথা শুনে মনে হল বুঝি ব্লেইনের কথা বলছেন; কিন্তু সেনটেইন চোখ তুলে দেখলেন যে ওয়ার্ডার লোথারকে নিয়ে এসেছে আদালতের ভেতরে।
রঙচটা নীল শার্ট আর গাঢ় স্ন্যাকস পরিহিত লোথারকে বেশ দুর্বল আর বুড়ো মানুষের মতন দেখাচ্ছে। চুলগুলোও সব একেবারে সাদা হয়ে গেছে। দেহত্বক দেখে মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।
বেঞ্চে বসেও মাথা তুলে কোর্টরুমের ভেতরে কাকে যেন খুঁজলেন লোথার। চোখের মাঝে উদ্বেগ। কিন্তু এর পরপরই সেনটেইন স্পষ্ট দেখলেন লোথারের চোখে খুশির আনন্দ ফুটে উঠল। তার মানে কাক্ষিত মানুষটাকে পেয়ে গেছেন। গত পাঁচ দিন ধরেই একই দৃশ্য দেখছেন সেনটেইন। এবারে তাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন পেছনের মানুষগুলোর দিকে। কিন্তু লোথারকে যে কে আকর্ষণ করেছে তা বুঝতেই পারলেন না।
“সাইলেন্স” নিজের আসন গ্রহণ করলেন বিচারক হর্থন। তিনি আর তার দুই সহকারীর কেউই অবশ্য ইংরেজ আদালতের মতন রঙিন উইগ লাগাননি। কেবল কালো গাউন আর সাদা নেকটাই পরেছেন। যাই হোক, থেমে গেল সব ফিসফিসানি, হাঁচি, কাশি।
সবাই দম বন্ধ উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে পরবর্তী রায়ের জন্য। নিজ নিজ নোটবুকের ওপর কলম নিয়ে প্রস্তুত সাংবাদিকদের দল। লোথার নিজেও ভাবলেশহীন হয়ে বসে আছেন। কিন্তু বিচারকের চেহারা দেখেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার চেহারা।
তবে এসব নিয়ে কোনো ভ্রূক্ষেপ করছেন না হন। তিনি তাঁর বিশাল নথি পড়েই চলেছেন। প্রথমে লোথারের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ সবিস্ত েির বর্ণনা করলেন। তিনটি হত্যাচেষ্টা, সশস্ত্র ডাকাতি আর দু’বার পরিকল্পিত আক্রমণের মত জঘন্য কাণ্ড। সব মিলিয়ে ছাব্বিশটি অভিযোগ পড়ে শোনানোর জন্য উনি বিশ মিনিট সময় ব্যয় করলেন।
এরপর ব্লেইন ম্যালকমসের দিকে তাকিয়ে কর্নেলকে ধন্যবাদ দিলেন তার উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য।
নিজের জায়গা থেকে বসে কর্নেলের স্পষ্ট অস্বস্তি ঠিকই টের পেলেন সেনটেইন। কেননা হর্থন তাকাবার সাথে সাথে গোলাপি হয়ে উঠল ব্লেইনের কানের ডগা।
এরপরই হর্থন তাকালেন তাঁর দিকে। সেনটেইনের বীরত্ব আর সাহসের প্রশংসা করে তার অবদানের জন্যও ধন্যবাদ জানালেন হন।
তিনি যখন কথা বলছেন সে সময় সেনটেইনের দিকে শক্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন লোথার। তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে চোখ নামিয়ে নিজের হ্যান্ড ব্যাগের দিকে তাকালেন সেনটেইন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই। তাই তার আনীত প্রমাণও গ্রহণযোগ্য নয়। তাই কর্নেল ম্যালকমস, সেনটেইন কোর্টনি ও পুলিশ বহিনীর সাক্ষ্য-প্রমাণকেই সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেয়া
মাথা ঘুরিয়ে হর্থনের দিকে তাকালেন লোথার। ছাব্বিশটি অপরাধের দায়ে লোথার ডি লা রেকে দন্ডিত ঘোষণা করলেন প্রধান বিচারক। সাথে সাথে আদালতকক্ষ জুড়ে শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন।
