যদিও আংকেল এমনটাই চাইছিলেন, তারপরেও ম্যানফ্রেডের গতি আর আক্রমণের তীব্রতায় ভারসাম্য হারিয়ে টলে উঠলেন আংকেল। কেবল ফাইটারের জাত দক্ষতার গুণেই এ যাত্রা বেঁচে গেছেন। তারপরেও টের পেলেন ভয়ংকর এক প্রাণীকে বুঝি তিনি নিজেই গুহা থেকে টেনে বের করে এনেছেন।
আর তারপরেই মনে পড়ে গেল রিংয়ের অভিজ্ঞতা আর পুরনো সব কৌশল। নিচু হয়ে এঁকেবেঁকে এড়িয়ে গেলেন ম্যানফ্রেডের সবকটা আঘাত। তবে বিস্মিত হলেন ছেলেটার সক্ষমতা দেখে, “কেমন সুন্দর করে দু’হাতে ঘুষি মারছে। যেন জন্ম থেকেই খেলে।”
ম্যানফ্রেডের চোখের দিকে তাকাতেই শিরশির করে উঠল আংকেলের দেহ। “না জানি দুনিয়ার ওপর কোনো প্রলয়ঙ্করী ঝড় উড়ে আসছে।”
“ও একটা খুনি। ঠিক একটা চিতার মতই রক্ত দেখার আনন্দে খুন করবে। আমাকে যেন দেখছে না। দেখছে নিজের শিকার।”,
ভাবতে গিয়ে যেই না আংকেল একটু আনমনা হলেন অমনি চোয়ালের মধ্যে দাঁত ঢুকে গেল, গোড়ালির হাড় ভেঙে গেল ম্যানফ্রেডের ঘুষি খেয়ে, মনে হচ্ছে পা দুটো বুঝি আর তার দেহের ভার বইতে পারছে না। তিনি নিজে সেই বাইশ বছর আগে খেলা ছেড়েছেন অথচ ছেলেটা যেন মেশিন। দুটো হাতই সমানে ঘুরছে। হলুদ চোখ দুটোর আগুনে দৃষ্টি তো কিছুতেই তাকে আড়াল হতে দিচ্ছে না।
নিজেকে সামলে নিয়ে বাম হাত দিয়ে পাল্টা পাঞ্চ মারলেন বিয়ারম্যান, যা দিয়ে ব্ল্যাক জেপটাকে কুপোকাৎ করেছিলেন।
হঠাৎ করে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ম্যানফ্রেড।
“এই তো হয়েছে। কোনোমতে শ্বাস নিতে নিতে জানালেন আংকেল। “এভাবেই হাঁটু গেড়ে বসে তোমার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাও।” তারপর নিজেও ম্যানফ্রেডের পাশে বসে ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সর্বশক্তিমান ঈশ্বও, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই তরুণের মাঝে এতটা শক্তি দান করার জন্যে। ডান হাতটা যেন সরাসরি তোমার আশীর্বাদে ধন্য হয়ে এসেছে। যার জন্য সর্বদা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব প্রভু!”।
এখনো ম্যানফ্রেডের মাথা ঘুরছে। চোয়াল ঘষে কোনোমতে তাও প্রার্থনা শেষে বলল, “আমেন।”
“কিছুদিনের মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করব প্রভু। শেডের কাছে রিং বানিয়ে আমাদের এই সৎকর্মের প্রয়াসে তোমার সদা সহযোগিতা কামনা করছি যেন তোমার ভৃত্য ঢুডি বিয়ারম্যানের নজর থেকে এটাকে বাঁচাতে পারি।”
***
এরপর দেখা গেল বেশিরভাগ দিন বিকেলবেলাতেই স্ত্রীকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে কোনো এক খ্রিস্টভক্তের সাথে দেখা করার অজুহাতে বাড়ির বাইরে চলে আসেন আংকেল ট্রম্প। অন্যদিকে উইন্ডহক রাস্তার ধারের গাছের ঝাড়ের পিছনে খাকি শর্টস পরে প্রস্তুত হয়ে থাকে ম্যানি।
ট্রুডির অগোচরে ট্রাঙ্ক থেকে বহু পুরাতন একজোড়া গ্লাভস্ বের করে এনেছেন আংকেল। কিন্তু ম্যানফ্রেডের হাতে দিতেই নাকের কাছে তুলে মুখে বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে তুলল ছেলেটা।
“ঘাম রক্ত আর চামড়ার গন্ধ বাছা, বুক ভরে ঘ্রাণ নাও। এখন থেকে এটাই তোমার জীবন।”
খানিকক্ষণের জন্যে চোখে সেই হলুদ আলো জ্বলে উঠলেও হেসে ফেলল ম্যানফ্রেড,
“ভালোই। তেমন দুর্গন্ধ না।”
“এর চেয়ে ভালো আর কিছু নেই। বুঝলে।” একমত হয়ে শেডের নিচে বালুভর্তি কিটব্যাগের কাছে ওকে নিয়ে গেলেন আংকেল।
“শুরু করার জন্যে আমি তোমার বাম হাতের কাজও দেখতে চাই। এটাকেও শেখাতে হবে। যেন শক্তি আর সামর্থের অপচয় না ঘটে।”
দুজনে মিলে বানিয়ে ফেলেছেন রিং। কোনার পোলগুলোকে মাটিতে গেঁথে সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে দিয়েছেন। তারপর মেঝের ওপর পেতে দিয়েছেন ক্যানভাস।
ম্যানফ্রেড আর আংকেল ট্ৰম্পের মধ্যকার এই বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারবে না এই শর্তে শপথ নেয়ার পর প্রবেশাধিকার পেয়েছে সারাহ। যদিও ও কেবল লজ্জার মাথা খেয়ে ম্যানফ্রেডের পক্ষই নেয়।
এভাবে দুটো সেশন শেষ হবার পর দেখা গেল আংকেল ট্রম্প আঘাত না পেলেও স্টিম ইঞ্জিনের মত হাঁপাচ্ছেন। বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে তাই ম্যানিকে জানালেন, “এভাবে চলবে না। হয় তোমার জন্য নতুন পার্টনার খুজতে হবে; নয়ত আমাকেই নতুন করে প্র্যাকটিস শুরু করতে হবে।”
এরপর আবার সেই গাছের নিচে থেকে ঘোড়া নিয়ে ঘামতে ঘামতে বাড়ি ফিরে আসেন আংকেল আর ম্যানফ্রেড।
যাই হোক, একেবারে যে কাজ হয়নি তা নয়। কাকতালীয়ভাবেই কয়েকদিন পর দেখা গেল যে আংকেলের কাধ আর বুকের নিচের চর্বির ভাজ উধাও হয়ে ফুটে উঠল শক্ত পেশি। ধীরে ধীরে রাউন্ডের সময় দুই থেকে বাড়িয়ে চার মিনিটে প্যাছালো। আর এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হল সারাহকে। সাথে আংকেল ট্ৰম্পের সস্তাদরের রুপালি পকেটঘড়ি।
এভাবে প্রায় একমাস কেটে যাবার পর আংকেল যেটা বলবেন বলে স্বপ্নেও ভাবেননি সেটাই মনে মনে স্বীকার করলেন “ওকে এখন অনেকটাই বক্সারদের মত দেখায়।” যদিও মুখে ম্যানফ্রেডকে বললেন, “এবারে গতি চাই। তোমাকে ঠিক মাম্বার মতই হতে হবে, র্যাটল স্নেকের মতই সাহসী।” দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী এই মাম্বা সাপ। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষকে কামড় দেবার চার মিনিটের মাঝে মেরে ফেলতে সক্ষম এই সাপের বিষ। অন্যদিকে র্যাটেলের সম্পর্কে লোকগাঁথা আছে যে, পুরুষাঙ্গের প্রতি এ প্রাণীর অন্যরকম দুর্বলতা আছে। তাই মুহূর্তের মধ্যে ছুটে এসে যে কোনো পুরুষ প্রাণী মানুষ কিংবা সিংহ, হাতি যাই হোক না কেন সবগুলোর পুরুষাঙ্গে আঘাত করে।
