তারপর সারাদিন কেটে গেল একের পর এক কাজ, প্রার্থনা আর স্কুলের ওয়ার্ক করে। তবে হাঁটু গেড়ে থাকাটাই হল সবচেয়ে কষ্টের। সারাক্ষণেই আংকেল অথবা আন্টি কিছু না কিছুর জন্য ঈশ্বরকে আবদার জানিয়েই চললেন।
যাই হোক, প্রথম সপ্তাহের শেষে অবশ্য সবকিছু গা সওয়া হয়ে গেল। এমনকি ওর হলুদ চোখ জোড়ার কঠিন দৃষ্টি দেখলে ট্রাম্পের মেয়ে দুটিও ভয়ে পালাত।
কিন্তু বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। তাই আপন মনেই ওদেরকে এক হাত দেখে নেয়ার প্রতিজ্ঞায় মন দিয়ে পড়াশোনা শুরু করল ম্যানি। আস্তে আস্তে টের পেল ওরা কীভাবে সারাহকে জ্বালাতন করছে। এমন গোপনে আর নির্দয়ভাবে করত যে কেউ টের পেত না। হয়ত গালি দিল, কিংবা মুখ ভেংচাল। নিজেদের খেলা থেকে সারাহকে বাদ দিয়ে তামাশা করল। অথবা সারাহর ইস্ত্রি করা কাপড়ে কালি ঢেলে দিল, বোয়া প্লেটে তেল লাগিয়ে দিত ইত্যাদি ইত্যাদি।
একদিন বিয়ারম্যানের মেয়েদেরকে হাতেনাতে ধরে ফেলল ম্যানফ্রেড। তারপর চুলের বেণী ধরে কয়েক ইঞ্চি দূর থেকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে সাবধানও করে দিল, “দৌড়ে গিয়ে মাকে কাহিনি বলার কোনো দরকার নেই বুঝলে?” হঠাৎ করেই সুবোধ বালিকায় পরিণত হল দুই বোন। তখন থেকে ওদের অত্যাচারের হাত থেকে অবশেষে নিষ্কৃতি পেল সারাহ।
সপ্তাহ শেষে, রবিবারের গির্জায় টানা পাঁচবার সাহায্যকারীর কাজ শেষ করে যেই না নিজের বিছানায় এসে বসল ম্যানফ্রেড, দরজায় দেখা দিল দুই বোনের একজন,
“পা তোমাকে স্টাডিতে ডাকছে।” এর আগে আর কখনো যাজকের বাড়ির সামনের অংশে আসেনি ম্যানফ্রেড। তাছাড়া দুই বোনের কাছে অনেকবারই শুনেছে যে স্টাডিতে ডাক পড়ার মানে হল কোনো না কোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিংবা শাস্তি ভোগ করতে হবে। ভয়ে কাঁপছে ম্যানফ্রেড। বুঝতে পেরেছে নিশ্চয় সারাহর রাতে ওর কাছে আসাটা সবাই টের পেয়ে গেছে। যাই হোক, আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে পা দিল ম্যানফ্রেড।
ডেস্কের পেছনে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন আংকেল, “ভেতরে এসো বাছা। আর দরজাটা বন্ধ করে দাও।” তারপর ধপ করে বসে পড়লেন নিজের চেয়ারে।
কী বলবে মনে মনে তাই গুছিয়ে নিল ম্যানফ্রেড। কিন্তু তার আগেই আংকেল বলে উঠলেন, “ওয়েল আমি তোমার আন্টির কাছ থেকে রিপোর্ট পেয়েছি যে এতদিন তোমার পড়াশোনার প্রতি কেউ খেয়াল না করলেও এ ব্যাপারে নাকি তুমি বেশ আগ্রহী।” ম্যানফ্রেড এতটাই স্বস্তি পেল যে এর পরের কথাগুলো প্রায়ই শুনতেই পারল না। “আমরা দমন-নিপীড়নের শিকার ম্যানফ্রেড। তাই শত্রুকে ঠেকাবার একটাই উপায় আছে। আর তা হল শক্তি, বুদ্ধি আর নির্দয়তার ক্ষেত্রে তাদেরকে ছাড়িয়ে যাওয়া।”
নিজের ভাবনা ছেলেটার সামনে তুলে ধরতে তিনি ব্যস্ত রইলেন যে ওর দিকে আর না তাকিয়ে স্বপ্নাতুর চোখে বলে চললেন বিভিন্ন কথা।
ম্যানফ্রেডও ফুসরত পেয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল পুরো কামরার সাজসজ্জা। হঠাৎ করেই দেয়ালের ছবিগুলোর মধ্যে আবিষ্কার করল এক ভিন্ন ট্রম্প বিয়ারম্যানকে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সিঁথি করে আঁচড়ানো চুলের ক্লিন, শেভ চেহারার বছর পঁচিশের ট্রম্প। পেশিবহুল শক্তিশালী দেহ। সামনেই ছোট একটা টেবিলে একগাদা কাপ আর ট্রফি। ছবিতে হাস্যরত সুদর্শন চেহারার ওই তরুণকে বেশ রোমান্টিকও লাগছে।
“আপনি বক্সার ছিলেন” আচমকা বলে উঠল ম্যানফ্রেড। এত অবাক হয়ে গেছে যে চুপ করে থাকার কথাও ভুলে গেল। কথার মাঝখানে বাধা পেয়ে বিশাল বড় মাথাটা ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন ট্রম্প। ম্যানফ্রেডের দৃষ্টি অনুসরণ করে ছবিটা দেখে জানালেন,
“শুধু বক্সারই না। আমি ছিলাম চ্যাম্পিয়ন। লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ান।”
চোখ ফিরিয়ে ম্যানফ্রেডের সপ্রশংস দৃষ্টি দেখে তিনি নিজেও বেশ আপুত হলেন।
“এই বেল্ট আর কাপগুলো কি আপনি পেয়েছিলেন?”
“অবশ্যই। ফিলিস্তিনিদের কোমর আর উরু ভেঙে দিয়েছিলাম না।”
“শুধু ফিলিস্তিনিদের সাথেই লড়েছিলেন আংকেল ট্রম্প?”
“ওরা সবাই আসলে আমার কাছে ফিলিস্তিনিই ছিল।” হাত মুঠো পাকিয়ে ম্যানফ্রেডের নাকের কয়েক ইঞ্চি সামনে বেশ কয়েকটা পাঞ্চ মেরে দেখালেন ট্রম্প বিয়ারম্যান।
“আমি মাইক উইলিয়ামকেও হারিয়ে দিয়েছি, বুঝেছ? ১৯১৬ সালে জ্যাক লালোরের কাছ থেকে পদবী নিয়েছি।” হঠাৎ করেই কোলের উপর হাত রেখে আবার চুপচাপ হয়ে গেলেন আংকেল, “আর তারপর তো তোমার ট্রুডি আন্টি আর ঈশ্বরের প্রভু আমাকে রিং থেকে ডেকে এনে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ দিলেন।” আংকেলের চোখ থেকে বিদায় নিল ময়দানের স্মৃতি।
“বক্সিং আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া এ দুটোই আমার জীবনের সবচেয়ে জরুরি কাজ।” একনিঃশ্বাসে বলে ফেলল ম্যানফ্রেড। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ছেলেটাকে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন বিয়ারম্যান।
“তুমি ফাইট করতে চাও?” চকিতে একবার দরজার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে যেন ষড়যন্ত্র করছেন এমন ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন আংকেল।
এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠল যে ম্যানফ্রেডের গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হল না। কেবল তীব্র বেগে মাথা নাড়ল।
কিন্তু তোমার আন্টি তো এসব পছন্দ করে না। একদিক দিয়ে ঠিকই আছে। মারামারি আসলে গুণ্ডাদের কাজ। এসব মাথা থেকে তাড়াও বাছা। অন্য কোনো উচ্চ চিন্তা করো।” মুখে বললেও আংকেল কিন্তু নিজে তা বিশ্বাস করেন না। তবুও ম্যানফ্রেডের সামনে মাথা নেড়ে হাত দিয়ে নিজের দাড়ি ঠিক। করতে লাগলেন।
