“আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে ট্রুডি আন্টি।”
“সবাই যখন খাবে তুমিও তখন খাওয়া পাবে আর পরিষ্কার হওয়ার আগে তো নয়ই।”
তারপর স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “গরম পানির গিজার কীভাবে চালাতে হয় ছেলেটাকে দেখিয়ে দাও।”
এখানেই শেষ না, ম্যানফ্রেডের শত আপত্তি সত্ত্বেও বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে নিজে তদারক করে, ওর গায়ে সাবান ঘষে গোসল করিয়ে দিলেন ট্রুডি।
তারপর ম্যানফ্রেডের কোমরে মাত্র একটা ভোয়ালে জড়িয়ে টেনে নিয়ে এলেন নিচের বাগানে। ফলের বাক্সের উপর বসিয়ে কেটে দিলেন ছেলেটার চুল। একটু পরে মাথায় হাত বুলিয়ে ম্যানফেড় নিজেই হা হয়ে গেল। গলা ঘাড় আর কানের পিছনটা বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।
অতঃপর ম্যানফ্রেডের নোংরা কাপড়-জামা সব জড়ো করে ফার্নেসে ঢুকানোর জন্যে তৈরি হলেন ট্রুডি। একেবারে শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে জ্যাকেটটা তুলে নিল ম্যানি। আলতো করে ছুঁয়ে দেখল লাইনিং।
ছেলেটার মুখভার দেখে ট্রুডির দয়া হল, “ঠিক আছে, ধুয়ে কয়েকটা সেলাই করে দিলেই হবে।”
তারপর ম্যানফ্রেডের ক্ষুধা নিবারণকে যেন ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে নিলেন ট্রুডি। শেষ করার আগেই ভরে দিলেন ম্যানির প্লেট।
অন্যদিকে পাখির মত টুকটুক করে খায় বলে সারাহও বিস্তর বকা হজম করল। যাই হোক, খেতে গিয়েও ম্যানফ্রেডের ওপর থেকে চোখ সরাল না মেয়েটা।
সারাহ আর বিয়ারম্যান পরিবারে এমনিতেই পূর্ণ হয়ে গেছে পুরো বাড়ি। তাই উঠানের শেষ মাথার যন্ত্রপাতি রাখার ছাউনির এক কোনায় ম্যানফ্রেডকে শোয়ার জায়গা দেয়া হল। প্যাকিং কেসকে উল্টে কার্ড বানিয়ে দিলেন ট্রুডি। আর লোথার খাঁটিয়ায় মাট্রেস ও পুরাতন পর্দা ঝুলিয়ে করা হল ঘুমানোর বন্দোবস্তু।
যাই হোক, যাওয়ার আগে ট্রুডি বারবার সাবধান করে দিলেন, “মোমবাতির অপচয় করো না। প্রতি মাসের শুরুতে কেবল একটাই পাবে। কারণ আমাদেরকে অনেক হিসাব করে চলতে হয়। বুঝলে?”
জীবনে প্রথমবারের মত নিজের একটা রুম আর বিছানা পেয়েছে ম্যানি। গ্রিজ আর প্যারাফিনের গন্ধ সত্ত্বেও কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল নিজেও জানে না।
আচমকা গালে হালকা স্পর্শ পেয়েই ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল ম্যানফ্রেড। মনে হল যেন বাবার গ্যাংগ্রিন আহত হাতটাই বুঝি কবর থেকে উঠে এসেছে। কম্বল সরিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়।
“ম্যানি, ম্যানি আমি!”
সারাহও ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলল। চাঁদের আলোয় দেখা গেল সাদা নাইট ড্রেস গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে মেয়েটা। রুপালি মেঘের মত কাঁধ ছাপিয়ে পড়েছে লম্বা চুল।
“তুমি এখানে কী করছো?” আলতো স্বরে জানতে চাইল ম্যানেফ্রড, “তোমার এখানে আসাটা উচিত হয়নি। ওরা যদি দেখে তো-” চুপ করে গেল ম্যানি। কী ঘটবে না জানলেও এই নিরাপত্তা বোধের আনন্দ যে উবে যাবে তা বেশ টের পেল।
“আমার একটুও ভালো লাগত না এখানে।” সারাহর কণ্ঠ শুনে বোঝা গেল যে সে কাঁদছে। “তুমি যাবার পর থেকেই আমার কিছু ভালো লাগত না।
মেয়ে দুটো তো আমাকে আবর্জনা বলে ডাকে। আমি ওদের মত পড়তে পারি না, অংক জানি না, মজা করে কথা বলতে পারি না যে তাই। তোমরা আমাকে এখানে রেখে যাবার পর প্রতি রাতে আমি কেঁদেছি।”
সব শুনে ম্যানফ্রেডের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল! প্রথমে নার্ভাস লাগলেও আস্তে করে সারাহকে ধরে বিছানায় ওর পাশে বসালো। “আমি চলে এসেছি। এখন থেকে আর কোনো সমস্যা হবে না।”
ম্যানফ্রেডের ঘাড়ে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ। দৃঢ় কণ্ঠে ম্যানফ্রেড জানাল, “ব্যস সারি, কান্না থামাও। তুমি আর ছোট্ট খুকি নও। সাহসী হতে হবে এখন।”
“কাঁদছি কারণ এখন অনেক আনন্দ হচ্ছে।”
“এমনকি আনন্দের সময়েও কাদা যাবে না।” আদেশ দিল ম্যানফ্রেড, “বুঝেছ?” কোনোমতে নিজের চোখ মুছে নিল সারাহ।
“আমি প্রতিদিন তোমার কথা ভেবেছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি যেন তোমাকে ফিরিয়ে আনেন। আচ্ছা তোমার সাথে একটু বিছানাতে শুয়ে থাকি? ঠাণ্ডা লাগছে।”
“না।” শক্ত হয়ে উঠল ম্যানফ্রেডের গলা।
“একটু ক্ষণের জন্য শুধু।” ম্যানফ্রেড আর কিছু বলার আগেই বিছানায় উঠে কম্বলের নিচে ওর পাশে শুয়ে পড়ল সারাহ। পাতলা নাইট গাউনের নিচে ওর শরীর এত ঠাণ্ডা হয়ে পড়েছে যে বাধা দিতে পারল না ম্যানফ্রেড।
“শুধু পাঁচ মিনিট। তারপরেই কিন্তু চলে যেতে হবে।”
সারাহর চুলগুলো এত সুন্দর আর নরম যে নিজেকে হঠাৎ বেশ বড় বড় বলে মনে করল ম্যানি। আস্তে আস্তে মেয়েটার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
“তোমার কি মনে হয় ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন? অনেক দিন লাগলেও তুমি কিন্তু ঠিকই এসেছো, তাই না।” নরম স্বরে জানাল সারাহ।
“কে জানে। আমি প্রার্থনার বিষয়ে বেশি কিছু জানি না। আমার পা কখনোই তেমন প্রার্থনা করত না। আমাকেও শেখায়নি।”
“ওয়েল, এখন থেকে কিন্তু করতে হবে। এই ঘরে সবাই সারাক্ষণ প্রার্থনা করে।
***
বাইরে তখনো অন্ধকার। কানের কাছে প্রচণ্ড গর্জন শুনে ম্যানফ্রেডের ঘুম ভেঙে গেল। “দশ সেকেন্ড আর তার পরেই তোমার গায়ে কিন্তু ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিব।” কাঁপতে কাঁপতে আংকেল ট্ৰম্পের সাথে আস্তাবলের পাশে ঘোড়ার খাবারের জায়গায় চলে এল ম্যানফ্রেড।
“তরুণদের পাপ লাঘব করার জন্য ঠাণ্ডা পানির চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছু নেই, বুঝলে? এখন যাও। নাশতার আগেই আস্তাবল পরিষ্কার করে ঘোড়াগুলোকে খাইয়ে দেয়া চাই।”
