শারীরিক আর মানসিক উভয় দিক দিয়েই মোয়ার্ট হেনড্রিক অত্যন্ত শক্তিশালী একজন পুরুষ। কোনো কিছুতেই ভয় নেই। যা চান তার জন্য প্রচণ্ড কষ্ট করতেও রাজি। তবে একটা সমস্যা হল সারা জীবনই অন্য কাউকে অনুসরণ করে এসেছেন। এবারও তাই হল।
“তুমি যেভাবে বলবে সেভাবেই হবে ভাই।” মনে হল এতদিনে পাহাড়ের উপর ফেলে আসা মানুষটার স্থলাভিষিক্ত হবার জন্য উপযুক্ত কাউকে পেয়েছেন।
***
“আমি এখানে আগামীকাল সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। যদি এর ভেতরে তুমি আর ফিরে না আসো তাহলে ধরে নেব যে নিরাপদ আছে। ঠিক আছে?”
“তোমার সাথে আর দেখা হবে না হেনি?” মন খারাপ করে ফেলল ম্যানফ্রেড হেনড্রিকও মিথ্যে প্রতিজ্ঞা করতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলেন।
*এখন থেকে আমাদের ভাগ্য ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে আমাদেরকে, ম্যানি। তবে তোমার কথা আমার সবসময় মনে থাকবে আর কে জানে আবার হয়ত কোনোদিন আমাদের ভিন্ন রাস্তা একসাথে মিলে যেতেও পারে।” ম্যানির কাঁধে হাত রেখে সান্তনা দিলেন। টের পেলেন ছেলেটা আসলেই বয়স্ক পুরুষ হয়ে উঠেছে। পেশিগুলো এরই মাঝে বেশ মজবুত হয়ে গেছে। “ভালো থেকো ম্যানি আর ঠিক বাবার মত মানুষ হয়ে উঠো।”
হালকাভাবে ধাক্কা খেয়েও দাঁড়িয়ে রইল ম্যানফ্রেড।
“হেনড্রিক তোমাকে আমার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে; কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না।”
“যাও ম্যানি। জানি তুমি কী বলতে চাও।”
কম্বল আর ব্যাগখানা তুলে নোংরা ধূলিমাখা রাস্তায় নেমে এল ম্যানফ্রেড। আস্তে আস্তে হেঁটে সামনের গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে আর ওই গির্জার মাথা দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে সামনে হাতছানি দিয়ে ডাকছে নতুন এক জীবন।
তবে আনমনেই প্রধান রাস্তা ছেড়ে পাশের স্যানিটারি লেইনে চলে এল। শেষ মাথায় যাজকের বাড়ির পেছনের দরজায় পৌঁছে হুড়কো খুলে ঢুকে পড়ল ভেতরে।
কিন্তু খানিক এগিয়েও ভয়ংকর এক হাক শুনে থেমে গেল ম্যানফ্রেড। উচ্চ কণ্ঠে আরেকটা চিৎকার শোনা গেল। এদিক-ওদিক তাকাতেই বোঝা গেল শব্দগুলো উঠানের শেষ মাথার কাঠের বাড়িটা থেকেই আসছে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দরজার ফুটো দিয়ে উঁকি দিল ম্যানফ্রেড। অন্ধকারে চোখ সইয়ে আসার পর চোখে পড়ল মাটির মেঝের একেবারে মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন ট্রম্প বিয়ারম্যান।
চোখ দুটো বন্ধ করে দু’হাত উপরে তুলে প্রার্থনা করছেন বিয়ারম্যান।
“ওহ ইস্রায়েলের প্রভু ঈশ্বর, তোমার ভূতত্যর প্রয়োজনের সময় মুখ ফিরিয়ে থেক না। তোমার ইচ্ছে যদি আমি না জানি তো এই দায়িতু কীভাবে পালন করব? আমি নগণ্য মানুষ, একাকী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ। আমার দিকে তাকাও প্রভু”
আচমকা চোখ মেলে তাকালেন ট্রম্প। মাথা ঘুরিয়ে সোজা তাকালেন ম্যানফ্রেডের দিকে। ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে উঠে আসা কোনো নবীর চোখের মত দেখে নিলেন ছেলেটার অন্তর।
ভয়ে ভয়ে আকৃতিবিহীন ঘামে ভেজা টুপিটা মাথা থেকে নামিয়ে বুকের কাছে ধরল ম্যানি।
“আমি ফিরে এসেছি ওম, আপনি যেমনটা বলেছিলেন।”
ভয়ংকর ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন ট্রম্প। পেশিবহুল দু’খানা পা, চওড়া কাধ আর ধূলিমাখা সোনালি চুলের ম্যানফ্রেডের চোখ দুটোতে দেখতে পেলেন দৃঢ় মনোবল আর বুদ্ধিমত্তার ছাপ।
তাই আদেশ দিলেন, “এদিকে এসো।” ব্যাগ রেখে ম্যানের কাছে এগিয়ে যেতেই হাত ধরে বসিয়ে দিলেন ট্রম্প।
“তোমার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাও বস। ঈশ্বরের গুণকীর্তন করা যে তোমার বাবা আমার কথা শুনেছে।”
সুবোধ বালকের মত চোখ দুটো বন্ধ করে হাত জড়ো করল ম্যানফ্রেড।
কিন্তু একের পর এক প্রার্থনা করে “আমেন” বলতে বলতে ছেলেটার মাথা ঘুরে উঠল ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে। একই সাথে হাঁটুও ব্যথায় মোচড় দিচ্ছে এমন সময় ঝট করে ম্যানফ্রেডের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন টুম্প। “মেভু। তুমি কোথায়?”
রুদ্ধশ্বাসে রান্নাঘরে দৌড়ে এলেন ট্রুডি বিয়ারম্যান। কিন্তু নোংরা আর ছেঁড়া কাপড় পরিহিত ম্যানফ্রেডকে দেখেই আবার দাঁড়িয়ে গেলেন।
“আমার এত সুন্দর রান্নাঘর। মাত্রই আমি পরিষ্কার করে গেছি।”
“প্রভু ঈশ্বর ওকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন।” সুর করে বলে উঠলেন ট্র। “ওকে আমাদের ঘরেই রেখে দিব। আমাদের সাথে এক টেবিলে বসে খাবে, আমাদের একজন হয়েই থাকবে।”
“কিন্তু ও এত নোংরা।”
“তাহলে ওকে পরিষ্কার হতে সাহায্য করো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রুডি বিয়ারম্যানের বড়সড় শরীরটার পেছন থেকে ভেতরে তাকাল ভীতসন্ত্রস্ত চেহারার ছোট্ট একটা মেয়ে। ম্যানেফ্রডকে দেখার সাথে সাথেই ফুঁপিয়ে উঠল বেচারি।
কিন্তু সারাহকে দেখে অবাক হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। মেয়েটার একদা বিবর্ণ গাল দুটো এখন আপেলের মত গোলাপি হয়ে গেছে। হাড়জিরজিরে হাতেও মাংস লেগেছে। সোনালি চুলগুলো সুন্দর বেণি বাধা আর পরনের স্কার্টটাতেও একটা দাগ নেই।
দু’হাত বাড়িয়ে ম্যানফ্রেডের কাছে ছুটে আসতে চাইল সারাহ। কিন্তু পেছন থেকে আটকে ধরলেন ট্রুডি।
“অলস মেয়ে কোথাকার। তোমাকে না আমি অংক করতে দিয়ে এসেছি। এক্ষুণি যাও, শেষ করো।” ধাক্কা দিয়ে সারাহাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে ম্যানফ্রেডের দিকে তাকালেন। “আর তুমি, চুলগুলো তো মেয়েদের মত লম্বা। পরনের কাপড় তো আর কী বলব। এখানে আমরা সবাই খ্রিস্টান বুঝলে, তোমার বাবার মত বন্য নই।”
