“এখন আর করি না ভাই। একমাস আগে চাকরি চলে গেছে। তাই এখন কেবল রৌদ্রে বসে বিয়ার খাই, বই পড়ি, চিন্তা করি আর পুরুষদের যা যা করণীয় তা করি।” শেষ হবার সাথে সাথে একত্রে হো হো হেসে উঠল দুই ভাই।
পশ্চিমা ইউরোপীয় পোশাক ছেড়ে নিজ গোত্রের সাদাসিধে কাপড় পুনরায় পরতে পেরে যারপরনাই খুশি হয়ে উঠলেন হেনড্রিক। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত জনের সাথে পোষা প্রাণী, মাঠের শস্য, বৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ে গল্প করতে গিয়ে এতটাই মশগুল হয়ে গেলেন যে, ভুলেই গেলেন বর্তমান সমস্যা। তাই মনে পড়তেই সবকিছু মোতজাসকে খুলে বললেন।
“ইয়েস” ভাইয়ের অবস্থা শুনে মাথা নাড়ল মোজেস।
“পুলিশ এসেছিল। বেশ কয়েকদিন থেকেও গেছে। প্রথমে হাসি-খুশি থাকলেও শেষের দিকে হুমকি আর ধমক-ধামক দিত। সোয়ার্ট হেনড্রিককে খুঁজতে এসেছিল। তোমার মা সহ কয়েকজন নারীকে মেরেছেও হেনড্রিকের চোয়াল শক্ত হতে দেখে মোজেস তাড়াতাড়ি সামলে নিল, “উনি কিন্তু বৃদ্ধ হলেও বেশ শক্ত। বাবার হাতে আগেও তো মার খেয়েছেন। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও কেউ সোয়াট হেনড়িককে চিনতে পারেনি। তাই ক্লান্ত হয়ে চলে গেছে পুলিশের কুত্তাগুলো।”
“ওরা আবার ফিরে আসবে। হেনড্রিক আনমনে জানাতেই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল মাজেস।
“হা শ্বেতাঙ্গরা কিছু ভোলল না। প্রিটোরিয়াতে পঁচিশ বছর আগে খুনের দায়ে এক লোককে ফাঁসি দিয়েছে। ওরা অবশ্যই আবার আসবে।”
সবার হাতে হাতে ঘুরছে কালো একটা বিয়ারের পাত্র।
“ওরা বলে গেল যে হানির রাস্তায় নাকি বড়সড় হিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে। আর তুমি যে শ্বেতাঙ্গের সাথে চলতে-ফিরতে যুদ্ধ করতে, মাছ ধরতে সবুজ সমুদ্রে যেতে, তার নামও বলে গেছে। হিরে নেয়ার সময় তুমিও নাকি তার সাথে ছিলে। তাই সুযোগ পেলেই তোমার গলায় দড়ি পরিয়ে দেবে।”
মিটিমিটি হেসে উঠলেন হেনড্রিক, এরকম একটা কাহিনি আমিও শুনেছি বৈকি। আমার পরিচিত এক আত্মীয়ের হাত দিয়ে নাকি চুরি হয়েছে সব হিরে।”
“তোমাকে এসব ডাহা মিথ্যে কে বলল?” বিবর্ণ মুখে হেসে ফেলল মোজেস। ক্লেইন বয়কে ইশারা দিলেন হেনড্রিক। চামড়ার একটা ব্যাগ এনে বাবার সামনে রেখে দিল ক্লেইন বয়। ব্যাগের মুখ খুলে কার্টিজ পেপারে মোড়া ছোট ছোট প্যাকেটগুলো বের করে মাটিতে সাজিয়ে রাখলেন হেনড্রিক। এক সারিতে মোট চৌদ্দটা প্যাকেট হল।
প্রথম প্যাকেটটা নিয়েই ছুরির ফলা দিয়ে কাগজ ছিঁড়ে ফেলল মোজেস। মোমের সীল দেখে বলল, “এটা তো হানি মাইনের সীল।” সাবধানে ভেতরের জিনিসগুলো দেখেও অবশ্য তার মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন হল না। একে একে চৌদ্দটা প্যাকেট দেখে অবশেষে নরম স্বরে জানাল, “মৃত্যু। সাথে করে শত শত হাজার হাজার মৃত্যু নিয়ে এসেছে।”
“তুমি বিক্রি করতে পারবে না?” হেনড্রিকের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ল মোজেস।
“একসাথে এত হিরে আমি জীবনেও দেখিনি। তার উপর যদি একত্রে বিক্রি করতে যাই তো আমাদের সবার উপরেই মৃত্যুর খড়গ নেমে আসবে। তাই ভেবে দেখি কী করা যায়। তবে ততদিন পর্যন্ত এগুলোকে আমাদের বসতির মধ্যেও রাখা যাবে না।”
অতঃপর পরদিন সকালবেলা হেনড্রিক, মোজেস আর ক্লেইন বয় মিলে গিরিসংকটের একেবারে চূড়ায় গিয়ে লিডউড গাছ খুঁজে বের করল। মাটি থেকে ত্রিশ ফুট উপরে গাছের গুঁড়ির মধ্যে ফাঁপা একটা ফোকর আছে। মাঝে মাঝে এক জোড়া ঈগল এসে বাসা বাঁধে। যাই হোক বাকি দু’জন নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দিল আর গাছে উঠে পাখির বাসার মধ্যে হীরে ভর্তি চামড়ার থলে রেখে দিল ক্লেইন বয়।
***
এরপর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। একদিন এসে মোজেস জানাল, “ভাই, তুমি আর আমি বোধ হয় আর এখানে থাকতে পারব না। তোমার মাঝে আমি অস্থিরতার আগমন টের পাচ্ছি। যে জীবন আগে অনেক মধুর ছিল তা এখন তিক্ত লাগে। বিয়ারের স্বাদও আগের মত ভালো লাগে না।”
হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “তুমি যে এতকিছু জানো আমি তো জানতামই না ভাই, মানুষের মনের কথাও টের পাও!”
“আমাদের এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। পাথরগুলোও এখানে রাখাটা বিপজ্জনক।”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন হেনড্রিক “বলল আমি শুনছি।”
“আমি আসলে এমন এক কলার কথা বলছি যেটাকে শ্বেতাঙ্গরা রাজনীতি বলে; যেখানে আমাদের কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশাধিকার নেই।”
মুখ বাঁকিয়ে হেনড্রিক বললেন, “তুমি আজকাল একটু বেশি বেশি বই পড়ছে। এসব কাজে কোনো ফায়দা নেই বুঝলে।”
“ভুল বললে ভাই। এ কলাতে এত সম্পদ আছে যার কাছে তোমার ওইসব পাথর তুচ্ছ।”
কিছু বলার জন্য মুখ খুলেও আস্তে করে বন্ধ করে ফেললেন হেনড্রিক। এ ব্যাপারে এমন করে সত্যিই আগে আর কখনো ভাবেননি। কিন্তু আজ ভাইয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আর আগ্রহ দেখে তিনিও বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
“ভাই, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আমাদের এখানকার পাট চুকিয়ে দেয়া উচিত।”
সম্মতি দিলেন হেনড্রিক। তিনি নিজে সারা জীবন যাযাবর হয়ে ঘুরেছেন। তাই এতে তার কোনো সমস্যাই নেই।
“কিন্তু আমরা যাব কোথায়?”
ভাইয়ের কথা শুনে হেনড্রিকের হাত ধরল মোজেস, “এ ব্যাপারে পরে আলোচনা করব। তবে তার আগে সাথে করে যে শ্বেতাঙ্গ ছেলেটাকে নিয়ে এসেছো তাকে সরিয়ে দিতে হবে। ও আসলে হিরের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। ওর গন্ধ শুঁকে শুঁকে পুলিশ এখানেও চলে আসবে।”
