কিন্তু পাহাড় চূড়ায় ফেলে আসা একাকী মৃত্যুপথযাত্রী বাবার কথা মনে হতেই কেঁদে উঠল পুরো অন্তর। “ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি বাবা, তুমি একদিন আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে।” বয়স্ক পুরুষের মতই ক্লান্তিহীন দেহে লম্বা লম্বা পা ফেলে হেনড্রিকের সাথে এগোল প্রায় তার সমান উচ্চতার ম্যানি।
এমনি করেই কেটে গেল পুরো রাত। অবশেষে নদী তীরে যখন পৌঁছাল তখন গাছের মাথায় উঠে এসেছে সূর্য।
কোনোরকমে খানিকটা পানি খেয়েই আবার শুরু হল যাত্রা। দিনেরবেলা নদীর পাড়ে খোলা জায়গা এড়িয়ে শুকনো মোপানির বনে লুকিয়ে রইল তিনজন। তারপর অন্ধকার নামার পর আবার পথে নামল ছোট্ট দলটা।
এরকমভাবে বারোটা রাত কঠোর পরিশ্রমের পর হেনড্রিক নিশ্চিত হলেন যে কেউ তাদের পিছু নেয়নি।
“আমরা কখন নদী পার হবো, হেনি?” জানতে চাইল ম্যানি।
“কখনোই না।” উত্তরে জানালেন হেনড্রিক।
“কিন্তু বাবার তো প্ল্যান ছিল পর্তুগিজে গিয়ে তারপর লুয়ান্ডাতে যাব।”
“সেটা তোমার বাবার কথা ছিল। কিন্তু এখন তো সে আর আমাদের সাথে নেই। উত্তরে তো বটেই এমন কি পর্তুগিজে কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন অনেক কঠিন। ওরা জার্মান বোয়া কিংবা ইংরেজদের চেয়েও কৃষ্ণাঙ্গদেরকে বেশি ঘৃণা করে। দেখা যাবে আমাদের হিরে কেড়ে নিয়ে শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দিবে। না ম্যানি তা হতে দেয়া যাবে না। আমরা এখন ওভামোল্যান্ডে নিজের গোত্রের মাঝে ফিরে যাব। সেখানে আমাদের সাথে মানুষের মত আচরণ করা হবে; জানোয়ারে মত নয়।”
“কিন্তু পুলিশ তো তাহলে আমাদেরকে খুঁজে বের করে ফেলবে।”
“কেউই আমাদেরকে দেখেনি ম্যানি।”
“তারপরেও তো সবাই জানে তুমি আমার বাবার বন্ধু।”
দাঁত বের করে হেসে ফেললেন হেনড্রিক। “ওখানে তো আর আমার নাম হেনড্রিক নয়। আর ওরা হাজারবার শপথ নিয়েও বলবে যে আমি কোনো শ্বেতাঙ্গ ডাকাতকে চিনিই না, বুঝলে? তাছাড়া আমার এক ভাইও আছে। ও এত চালাক যে হিরেগুলোর হিল্লে হয়ে যাবে। আমরা তাই ঘরেই ফিরে যাব, ম্যানি।”
“তাহলে আমার কী হবে? আমি তো তোমার সাথে ওভাষোর গোত্রে যেতে পারব না।”
“তোমার জন্যও আমি একটা প্ল্যান করে রেখেছি।” পিতাসুলভ মনোভাব নিয়ে ম্যানফ্রেডের কাঁধে হাত রাখলেন হেনড্রিক, “তোমার বাবা আমার ওপর ভরসা করতেন। তাই তোমার কোনো ভয় নেই। তোমাকে আমি অবশ্যই নিরাপদ কোনো জায়গায় পৌঁছে দিয়ে তবেই বাড়ি ফিরব।”
“তুমি চলে গেলে আমি একেবারে একা হয়ে যাবো হেনড্রিক।” হাত নামিয়ে নিলেন হেনড্রিক। মুখে কিছুই বললেন না।
সে রাতেই নদী ছেড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে যাত্রা শুরু করল হেনড্রিক, ম্যানফ্রেড আর ক্লেইন বয়। মানুষের বসতি এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত ধীরে চলতে চলতে অবশেষে বিশতম দিনে পৌঁছে গেল এক ওভাদো গ্রামে।
কিন্তু চট করে গ্রামে না ঢুকে উপত্যকার পেছনে লুকিয়ে রইল তিনজনে। যেন অচেনা কাউকে দেখলে সতর্ক হওয়া যায়। গ্রামের দিক থেকে আসা সব ধরনের শব্দও ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে দেখলেন হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। এভাবে বসে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে পড়ল ম্যানফ্রেড।
বিকেলের দিকে অবশ্য বদলে গেল পরিস্থিতি। ঢালু পেরিয়ে একপাল ছাগল নিয়ে গ্রামের দিকে ঢুকতে যাচ্ছে উদোমদেহী এক শিশু।
বাচ্চাটাকে দেখেই হালকাভাবে শিষ দিলেন হেনড্রিক।
চমকে উঠে ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটা এদিকে তাকাতেই হেনড্রিক আরেকবার শিষ দিলেন। এবার সাবধানে কাছে এগিয়ে এল ছোট্ট মানুষটা। হঠাৎ করেই হেনড়িককে দেখে বিশাল এক অট্টহাসি দিয়ে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার। বুকে।
হেনড্রিক নিজেও হেসে উঠে কোমর পর্যন্ত বাচ্চাটাকে তুলে ফেললেন আদর করার জন্য।
“ও আমার ছেলে।” হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ম্যানির জ্ঞাতার্থে অবশেষে জানালেন হেনড্রিক। কিচির-মিচির করে বাবাকে বিভিন্ন সংবাদও দিয়ে দিল বাচ্চাটা।
“গ্রামে অচেনা কেউ নেই। কয়েকদিন আগে পুলিশ এলেও এখন চলে। গেছে। ব্যাখ্যা দিলেন, হেনড্রিক।
তারপর ছেলেকে কোলে নিয়েই পাহাড় থেকে নেমে ঢুকে গেলেন গ্রামে। নগ্ন উর্ধাঙ্গ নিয়ে দল বেঁধে কাজ করছে চারজন ওভাষো নারী। এদেরই একজন হেনড়িককে দেখে চিৎকার দিয়ে ছুটে এলেন ঠিক বাচ্চাটারই মতন। শরীরে কুঁচকানো চামড়া, দন্তবিহীন বয়স্ক এই নারী আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন হেনড্রিকের পা।
“আমার মা” পরিচয় করিয়ে দিলেন হেনড্রিক।
একেবারে কোনার কুঁড়েঘরের প্রবেশ দ্বারে বসে আছে কালের একমাত্র পুরুষ। মনে হচ্ছে হেনড্রিকদের আগমনে সৃষ্ট হৈ-চৈয়ে তার কোনো রকম ভাবান্তর হল না। হেনড্রিকের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও লোকটার পেশি কঠোর পরিশ্রমের ফলে অত্যন্ত মজবুত আর তার চারপাশে বেশ একটা আত্মবিশ্বাসের আবহ। চেহারাখানাও তরুণ ফারাওয়ের মত। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল তার কোলের উপর ম্যাকলের হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড বইটা পড়ে আছে।
শান্ত ভঙ্গিতে হেনড্রিককে অভ্যর্থনা জানালেও এ দুজন যে বেশ আপন কোনো আত্মীয় তা বুঝে গেল ম্যানফ্রেড।
“এই হচ্ছে আমার বুদ্ধিমান সবজান্তা ছোটভাই। আমাদের বাবা এক হলেও মা ভিন্ন ও আমার চেয়ে অনেক ভালো ইংরেজি বলে আর বইও পড়ে। ওর ইংরেজি নাম হল মোজেস।”
“ও হানি হিরে খনিতে কাজ করে। কিন্তু মাথা নেড়ে তা এড়িয়ে গেল মোজেস।
