পাথুরে কিনারে পৌঁছেই ব্লেইনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেনটেইন। ভয়ে দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। কোনোমতে জানালেন, “ওহ ব্লেনি, কী ভয়ংকর এক দানব।”
“ঠিক আছে। এখন আর কোনো ভয় নেই ডার্লিং।” পাথরের সাথে রাইফেলটাকে ঠেস দিয়ে রেখে সেনটেইনকে জড়িয়ে ধরলেন ব্লেইন।
বিড়ালের মত গুটিগুটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন। বুঝতে পারলেন এসে গেছে সেই মুহূর্ত। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ব্লেইন। ছোট ছেলে-মেয়ের মত পরস্পরের হাত ধরে প্যাপিরাসের বনে ছুটলেন দুজনে।
প্রকৃতির আদিমতার মাঝে হারিয়ে গেলেন ব্লেইন আর সেনটেইন। মনে হচ্ছে তারাই বুঝি পৃথিবীর একমাত্র মানব আর মানবী। গলা চিড়ে চিৎকার করে নিজের সমস্ত একাকিত্ব আর বেদনা বাতাসে মিলিয়ে দিলেন সেনটেইন।
***
পরের দিন সকালবেলা। রুন্টুর সীমান্ত পোস্টের কাছে এগোতেই এসে গেল বিচ্ছেদের ক্ষণ। এ অঞ্চলের দায়িত্বে নিযুক্ত পুলিশ সার্জেন্ট আর তার গার্ডদের কবলে পড়ে দুজন দুজনের দিকে তাকানোর সুযোগ পর্যন্ত হারিয়ে ফেললেন। অবশেষে উইন্ডহকে পৌঁছাতেই শেষ হল-এ অত্যাচার।
কিন্তু তখন তাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে পুরো পৃথিবী- ইসাবেলা, বাবার কাছে কে আগে আসবে সে প্রতিযোগিতায় রত তারা আর ম্যাটিল্ডা, পুলিশ, রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার, টুয়েন্টিম্যান জোনস, আব্রাহাম, স্যার গ্যারি, উদ্বেগ আর অভ্যর্থনা জানিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মেসেজ।
তারপরেও যেন এত হৈ-হট্টগোলের কিছুই সেনটেইনকে স্পর্শ করতে পারল না। বিচ্ছিন্ন হয়ে ভাবতে লাগলেন সেই সবুজ নদী, দু’জনের হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটা, একত্রে কাটানো রাত্রি।
রেলওয়ে কোচ থেকে শাসাকে ফোন করেও নিরস আগ্রহে শুনলেন ছেলের গণিতের নম্বর।
তারপরেও দু’বার ব্লেইনের সাথে কথা বলার জন্যে ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবার অন্য কেউ ফোন ধরেছে। তাই কথা না বলেই রেখে দিতে বাধ্য হয়েছেন সেনটেইন।
পরের দিন প্রশাসকের অফিসে দু’জনের আবার দেখা হল। ব্লেইনের প্রেস কনফারেন্সে থাকায় রুমভর্তি ছিল কেবল সাংবাদিক আর হুইল চেয়ার নিয়ে ইসাবেলা। বহুকষ্টে তাই কর্নেলের সাথে বন্ধুত্বসুলভভাবে হাত মেলানোর নিপুণ অভিনয় করলেন সেনটেইন। ব্লেইনের সাথে একাকী কথা বলার কোন সুযোগই পেলেন না।
নিজের অফিসে ফিরতেই দেখা গেল অপেক্ষারত আব্রাহামের সঙ্গে।
“সেনটেইন আপনি কিন্তু দেরি করে ফেলেছেন। বোর্ডরুমের সবাই গত একঘণ্টা ধরে বসে আছে।”
“তাহলে বসে থাকুক। সমস্যা কী?” এতটা কড়া ভাষা বের হল যে সেনটেইন নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। অথচ এই ব্যাংকই তার একমাত্র ভরসা।
“হিরেগুলো হারিয়ে ভয়ে তাদের একেকজনের চেহারায় দশ রকমের হলুদ রঙ ফুটে উঠেছে, সেনটেইন।”
ব্যাংক ডিরেক্টরের দল সেনটেইন শহরে এসেছেন শোনার পর থেকেই এই মিটিঙের জন্য অপেক্ষা করছেন।
“ড, টুয়েন্টিম্যান জোনস কোথায়?”
“উনিও বোর্ডরুমে আছেন।” মোটা মোটা একটা ফোল্ডার এগিয়ে দিলেন অ্যাবি, “এখানে সুদ পরিশোধের শিডিউল দেয়া আছে।”
খানিক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলেন সেনটেইন। প্রতিটা আর পরিমাণ সবকিছুই তার মুখস্থ। একই সাথে এসব ঠেকানোর পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন। যদিও শুনলে হয়ত যে কারো হাস্যকর বলে মনে হবে।
“সিংহের গুহায় ঢোকার আগে আমাকে জানতে হবে এরকম নতুন আর কিছু কি আছে?”
“লন্ডনের লয়েডস থেকে দীর্ঘ একটা টেলিগ্রাম এসেছে। তারাও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।”
মাথা নাড়লেন সেনটেইন।
“সেটাই তো ধারণা করেছিলাম। আপনার কী মনে হয়? ব্যাপারটা কোর্ট পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাব?”
“আমার মনে হয় তাতে কেবল সময় আর অর্থেরই অপচয় হবে।”
“আর কিছু?”
“ডি রিয়ারস্। স্যার আর্নেস ওপেনহেইমার নিজে মেসেজ পাঠিয়েছেন।”
“ইতিমধ্যেই গন্ধ শুঁকে চলে এসেছেন, না?” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সেনটেইন। মাথা থেকে ব্লেইনের ছবি কিছুতেই তাড়াতে পারছেন না।
“কিম্বলি থেকে বৃহস্পতিবারে উইন্ডহকে পৌঁছাবেন স্যার আর্নেস্ট।”
“সত্যিই কাকতালীয় ব্যাপার।” কাষ্ঠ স্বরে হাসলেন সেনটেইন।
“আপনার সাথে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিং করতে চান।”
“ভদ্রলোকের নাকটা ঠিক হায়েনার মত আর চোখ দুটোও শকুনের চোখ। শত শত মাইল দূরে থেকেও মৃতপ্রায় পশুর গন্ধ ঠিকই পেয়ে যান।”
“উনি হানি মাইনের পিছনে লেগেছেন সেনটেইন। গত তের বছর ধরেই ঘুরছেন মওকামত পাওয়ার আশায়।”
“সবাই তো হানির পেছনেই লেগেছে অ্যাবি। কিন্তু ঈশ্বরের দিব্যি এজন্য আগে ওদেরকে আমার সাথে লড়তে হবে।”
দু’জনেই একসাথে উঠে দাঁড়ালেন বোর্ডরুমে যাওয়ার জন্য।
হাঁটতে গিয়ে দেয়ালের সাথে লাগানো আয়নায় চোখ পড়তেই চুলগুলোকে হালকা ঠিক করে জিভের ডগা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন। ব্যস তিনি তৈরি। কেটে গেছে মাথার ধোঁয়াশা ভাব। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী আর আত্মবিশ্বাসী সেনটেইন কোর্টনি। মনের মাঝে কেবল একটাই মন্ত্রঃ- হানি আমার, কেউ এটা আমার কাছ থেকে নিতে পারবে না।
***
অন্ধকারের মধ্যে দিয়েও দ্রুত পায়ে উত্তর মুখে এগিয়ে চলেছে ম্যানফ্রেড ডি লা রে। সাথে হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। একটু আগে বাবার কাছ থেকে পাওয়া অপ্রত্যাশিত অবহেলাই তার মনোবলকে দৃঢ় করে তুলেছে।
