“তুমি ওকে মারোনি দেখে আমি খুশি হয়েছি ব্লেইন।”
সংকটের মুখেও কর্নেলের ঠাণ্ডা মাথা আর মানবতাবোধ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন সেনটেইন।
কিন্তু আপন মনেই ভাবলেন, “আমি কি স্কুল গার্ল হয়ে গেলাম নাকি। কেবল ওরাই এমন হিরোগিরি পছন্দ করে।” খিকখিক করে হেসে ফেললেন সেনটেইন।
অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে ব্লেইন জানতে চাইলেন, “কী দেখে এত মজা পেলে?”
“একটা মেয়ে সব সময় অপেক্ষা করে কখন তার প্রিন্স চার্মিং এসে তাকে আগুন খেকো ড্রাগনের হাতে থেকে বাঁচাবে।”
“ধুর।“
“মানে? সান্তাক্লজ আর পরীদের তুমি বিশ্বাস করো না?”
“তোমার মাথায় একটু ছিট আছে বুঝলে?”
“হুম, জানি।” মাথা নাড়লেন সেনটেইন, “আর তোমাকে সাবধান করে দেবো ভেবেছি; কারণ এটা কিন্তু ছোঁয়াচে বুঝলে?”
“বড় দেরিতে বলে ফেললে।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন কর্নেল।
“গুড। সামনে ঝুঁকে এলেন সেনটেইন। প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে কিস করলেন ব্লেইনের কানের পিছনে।
কেঁপে উঠলেন ব্লেইন। “দেখো তুমি কী করেছো?” হাত মেলে ধরতেই দেখা গেল সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেছে। “এরকম আর করবে না।”
“আমিও তোমার মত কোনো প্রমিজ করি না।” সেনটেইনের কথা শুনে অনুশোচনার মেঘ ঘনাল ব্লেইনের চোখে। তাই দেখে মুড বদলাবার জন্যে সেনটেইন তাড়াতাড়ি বললেন,
“ওহ, ব্লেইন পাখিগুলোকে দেখো।” নদীর উপর যেন কমলা রঙের মেঘ জমেছে। একসাথে উড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার উজ্জ্বল লালরঙা পাখি।
এরপর দুজনে আর তেমন কথাবার্তা না বলে চুপচাপ বসে রইলেন। তবে এই নীরবতাই যেন পরস্পরকে আরো বেশি কাছে নিয়ে এসেছে।
মাঝিদের সাথে কথা বলে রাত কাটাবার জন্য বড় একটা দ্বীপ বেছে নিলেন ব্লেইন। লম্বা লম্বা প্যাপিরাসে ঘেরা হৃদের পানি একেবারে স্বচ্ছ আর সবুজ। তীরে নেমে রাইফেল তুলে নিলেন ব্লেইন।
“তুমি কোথায় যাচ্ছো?”
জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“দেখি, ডিনারের জন্য কিছু পাই কিনা।”
“ওহ, ব্লেইন আজকে অন্তত কোনো জীব হত্যা করো না। আজ সত্যিই একটা বিশেষ দিন।”
“বীফ খেতে খেতে তোমার ক্লান্ত লাগছে না?”
“প্লিজ…”
হেসে রাইফেলটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে দিলেন ব্লেইন। তারপর তদারক করে দেখে এলেন কুঁড়েঘর আর মশারীর অবস্থা। সন্তুষ্ট হয়ে মাঝিদেরকে পাঠিয়ে দিলেন ক্যানুতে।
“ওরা কোথায় যাচ্ছে?” ক্যানু স্রোতে ভাসতেই জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“আমি ওদেরকে ওপাশের গ্রামে ক্যাম্প করতে বলেছি।” উত্তর দিয়েই চট করে চোখ সরিয়ে নিলেন ব্লেইন। সেনটেইন নিজেও অন্যদিকে তাকালেন। জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই একাকী হওয়ার অনুভূতি আচমকা দু’জনকেই লাজুক করে তুলেছে।
তাড়াতাড়ি ক্যাম্পের কাছে গিয়ে নিজের থলে খুলে বসলেন সেনটেইন। ব্লেইনের দিকে না তাকিয়েই বললেন, “আমি হ্রদে যাচ্ছি। গত রাতের পর থেকে তো গোসল হয়নি।”
“তাহলে তোমার কোনো শেষ ইচ্ছে থাকলে জানিয়ে দিয়ে যাও।”
“মানে?”
“এটা ওকাভাঙ্গো নদী সেনটেইন। ছোট্ট মেয়েদের জন্য ওঁৎ পেতে থাকে কুমীর।”
“তাহলে তুমি রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো”
“আনন্দচিত্তে ম্যাডাম?”
“চোখ কিন্তু বন্ধ থাকবে।”
“তাহলে কুমির দেখব কেমন করে?”
হ্রদের নিচের সাদা বালি এত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, চোখ এড়িয়ে কুমির আসার কোনো উপায় নেই। তীরে সবচেয়ে উঁচু পাথরটার উপর সেফটি ক্যাচ অফ করে এনফিল্ড রাইফেল নিয়ে এসে বসলেন ব্লেইন।
“আপাতত উঁকি-ঝুঁকিও বন্ধ।” সেটেইনের সাবধান বাণী শুনে বহুদূরের একপাল হাঁসের দিকে উদাস চোখে চেয়ে রইলেন কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমস। তবে সেনটেইনের কাপড় খোলার খসখস শব্দ কিন্তু কান এড়ালো না।
“ঠিক আছে এবার কুমিরের খোঁজ করতে পারো।”
হ্রদের তলদেশে শরীর ডুবিয়ে বসে পড়লেন সেনটেইন। কেবল মাথাটা উপরে ভেসে আছে। চুলগুলো সব চুড়ো করে বাঁধা।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ঘোড়র উপর থেকে পড়ে গিয়ে অথর্ব হয়ে গেছেন ইসাবেলা ম্যালকম। তখন থেকেই ব্লেইন আর তার মাঝে পুরুষসুলভ কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও একবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই ব্যর্থতার কথা মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠেন ব্লেইন। তাই প্রচণ্ড মনোবল খাটিয়ে নিজের দৈহিক চাহিদাকে ভুলে আছেন কর্নেল। কিন্তু আজ আচমকা টের পেলেন এক আগ্রাসী ঝড়ের পূর্বসংকেত। যা লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যাবে তার সবকিছু।
হঠাৎ করেই বন্য আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠলেন সেনটেইন।
“ব্লেইন!”
তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন কর্নেল। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে নিরাভরণ দেহে ঠকঠক করে কাঁপছেন সেনটেইন। গভীর পানি থেকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে একটা কুমির।
“দৌড় দাও সেনটেইন, রান।” ব্লেইনের চিৎকার শুনে সেনটেইনের সম্বিত ফিরলেও সরীসৃপটা যেন ঘোড়র বেগে ধেয়ে আসছে।
ছুটে এসে হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে গেলেন ব্লেইন। কোমরের কাছে উদ্যত রাইফেল। কিন্তু সেনটেইনের জন্য নিশানা তা করতে পারছেন না।
“ডাউন! মাথা নামিয়ে বসে পড়ো।” সাথে সাথে সামনের দিকে ঝাঁপ দিলেন সেনটেইন আর একই সময়ে গুলি ছুঁড়লেন ব্লেইন।
বুলেট গিয়ে সোজা ঢুকে গেল কুমিরের খুলিতে। পিঠ বেঁকিয়ে জটা পানিতে এত প্রচণ্ড আলোড়ন তুলল যে ফেনার মাঝে ডুবে গেলেন ব্লেইন আর সেনটেইন। কোনোমতে তাকে তুলে দাঁড় করিয়েই এক হাতে রাইফেল আরেক হাতে সেনটেইনের পিঠ ধরে তীরের দিকে দৌড় দিলেন ব্লেইন।
