***
কুঁড়েঘরের ভেতরকার অন্ধকারের সাথে চোখ সইয়ে নেয়ার জন্য দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন।
পায়ের ওপর সস্তাদরের কম্বল বিছিয়ে পাড়ুর মুখে বসে আছেন লোথার।
“সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার কয়েক মিনিটের জন্য কি আমি একা থাকতে পারি এখানে?”
পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হ্যানসমেয়ার ফিসফিস করে সেনটেইনকে অভয় দিয়ে গেলেন, “আমাকে এক ডাক দিলেই চলে আসব মিসেস কোর্টনি।”
একা হয়ে কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর সেনটেইনই প্রথম কথা বললেন,
“তুমি যদি আমাকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে থাকো তাহলে বলতে হবে যে সফল হয়েছে।” মুখে কিছু না বলে হাতবিহীন কাঁধে হাত বোলালেন লোথার। দৃশ্যটা সত্যিই বেদনাদায়ক। তারপর জানতে চাইলেন, “কে কাকে শেষ করেছে সেনটেইন?” চোখ নামিয়ে নিলেও খানিক বাদে সেনটেইন আবার জানতে চাইলেন,
“আমার কাছ থেকে যা চুরি করেছে তার একটা অংশও কি ফেরত দিতে পারবে না? অন্তত বহু আগে আমাদের মাঝে যে সম্পর্ক ছিল তার খাতিরে?”
এবারও উত্তর না দিয়ে অক্ষত হাত তুলে বুকের পুরাতন একটা চিহ্নের উপর হাত বোলালেন লোথার। কেঁপে উঠল সেনটেইন।
লুসার পিস্তল দিয়ে গুলি করে একদা এ দাগ তিনিই তৈরি করেছেন লোখারের বুকে।
“ছেলেটার কাছে আছে হিরেগুলো, তাই না?” তোমার বেজন্মা ছেলে বলতে গিয়েও নিজেকে কোনোমতে শুধরে নিয়ে বললেন, “তোমার ছেলে?”
লোথার চুপ করে আছেন শুনে জেদের স্বরে সেনটেইনের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “আমাদের ছেলে ম্যানফ্রেড?”।
“তোমার মুখ থেকে কথাটা শুনব কখনো ভাবিনি।” কণ্ঠস্বরের আনন্দ আর খুশি লুকাতে পারলেন না শোখার, “যখন তুমি ওকেও ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে তখন কি মনে হয়নি যে ও আমাদেরই ভালোবাসার নিদর্শন?”
“না” তীব্রভাবে মাথা ঝাঁকালেন সেনটেইন, “তুমি আমাকে এখনো চেনোনি।”
“ও তোমার পথে এলে তুমি অবশ্যই ওকে শেষ করে দিতে।” সোজা সাপটাভাবেই জানিয়ে দিলেন লোথার।
“তোমার সত্যিই তাই মনে হয়?” একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন, “তোমার ধারণা আমি এতটাই নিষ্ঠুর যে নিজের ছেলের ওপর প্রতিশোধ নেব?”
“তুমি তো কখনো ওকে স্বীকৃতিই দাওনি।”
“এখন দিচ্ছি। গত কয়েক মিনিটে তো বেশ কয়েকবারই বলেছি এ কথা।”
“তুমি আমাকে কথা দিচ্ছ যে ওর কোনো ক্ষতি করবে না?”
“আমাকে প্রমিজ করতে হবে না, লোথার ডি লা রে! তুমিও তা জানো। আমি ম্যানফ্রেডের কখনো কোনো ক্ষতি করব না।”
“আর এর পরিবর্তে আমার কাছ থেকে নিশ্চয় কিছু চাও” সামনে ঝুঁকে এলেন লোথার। শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় বেশ ঘামছেন। পুরো রুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সেই কটু গন্ধ।
“তুমি কি পরিবর্তে কিছু দিতে চাও?” আস্তে করে জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“না। নাথিং, কিছুই না।” ক্লান্ত হয়ে আবার পাশ বালিশে হেলান দিলেন লোথার, “এখন তাহলে তোমার প্রতিজ্ঞা ফিরিয়ে নিবে নিশ্চয়?”
“আমি তো কোনো প্রতিজ্ঞাই করিনি। তবে হ্যাঁ আবারো বলছি, আমাদের ছেলে ম্যানফ্রেড আমার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ইচ্ছাকৃতভাবে কখনোই ওর কোনো ক্ষতি করব না। তবে তোমার ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।”
মুখ ঘুরিয়েই সার্জেন্টকে ডাক দিলেন সেনটেইন।
পেছন থেকে দুর্বল স্বরে ডাক দিলেন লোথার। বলতে চাইলেন, “পাহাড়ের চূড়ার ফাটলের ভেতরেই পড়ে আছে তোমার হীরে কিন্তু সেনটেইন যখন তাকালেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বললেন, “বিদায় সেনটেইন।” অবশেষে সবকিছু সাঙ্গ হল।
***
আফ্রিকার সবচেয়ে সুন্দর নদীগুলোর একটা হল ওকাভাঙ্গো। তবে স্বচ্ছ হ্রদ আর প্যাপিরাসের ঝাড় থাকলেও কালাহারির মরুভূমির কাছে এসে শীর্ণ হয়ে নিষ্ঠুর বালির নিচে হাওয়া হয়ে গেছে পুরো নদী।
এ নদীর সবচেয়ে চওড়া অংশ দিয়েই এবার বাড়ি ফিরবেন সেনটেইন আর ব্লেইন। বাহন হিসেবে আছে বিশ ফুট লম্বা ক্যাম্প। জলহস্তীর আচানক আক্রমণ ঠেকাবার জন্য কোলের ওপর লি এনফিল্ড নিয়ে বসে আছেন ব্লেইন।
আফ্রিকার এ অংশে আগে আর কখনো আসেননি সেনটেইন। তাই নদী আর এর তীরবর্তী জীবনযাত্রা তার জন্যে সম্পূর্ণভাবেই নতুন। অন্যদিকে এ অঞ্চল সম্পর্কে ব্লেইন অত্যন্ত দক্ষ। ১৯১৫ সালে জেনারেল স্মুটের বাহিনির সাথে এসেছিলেন বিধায় এখানকার প্রতিটি গাছ, পাখি আর প্রাণী সম্পর্কে জানেন।
খানিক বাদে হঠাৎ করেই বদলে গেল নদীর প্রকৃতি। কোনো কোনো জায়গা এতটাই সরু যে তীক্ষ্ণ পাথরে ঘষা খেয়ে ক্যানুই ফুটো হয়ে যাওয়ার দশা হল। আতঙ্ক আর উত্তেজনায় প্রায় দম বন্ধ করে বসে আছেন সেনটেইন। যেন সেই ছোট্টবেলার মত শিশু হয়ে রোলার কোস্টারে চড়ছেন। একটু পরেই অবশ্য চওড়া হয়ে এল দু’পাশ। নদী তীরের সমভূমির ওপর চড়ছে বুনো সঁড়ের দল। বিশালাকার প্রাণীগুলোর গায়ে শুকিয়ে যাওয়া মাটি, ট্রাম্পেটের মত কান। ষাড়ের পাল কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখল সেনটেইনদের ক্যানু।
নদীর ধারের লম্বা গাছগুলোর প্রায় প্রতিটির উপর দেখা গেল উজ্জ্বল সাদা মাথাঅলা ঈগল। এছাড়া বালুতীরে আয়েশ করে পড়ে আছে বিদঘুটে চেহারার লম্বা সব কুমির।
হঠাৎ করেই ক্যাম্প দেখে তেড়ে এল মসৃণ গোলাকার পাথরের ন্যায় ধূসররঙা জলহস্তী। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠেই দ্রুত কয়েকবার গুলি ছুড়লেন ব্লেইন। কুঁকড়ে উঠলেন সেনটেইন। ভাবলেন এই বুঝি মদ্দা জলহস্তীটার স্বচ্ছ গোলাপি চোখ দুখানা থেকে ফিনকি দিয়ে ছুটবে রক্ত। কিন্তু না, জন্তুটার কপালেরও কয়েক ইঞ্চি উপরে নিশানা করেছেন ব্লেইন। দক্ষ হাতে ক্যানু নিয়ে সরে এল মাঝি। আর মনে হল যেন নিজের ব্যর্থতার লজ্জা ঢাকতেই সবুজ পানির মধ্যে ডুব দিল বিশাল জলহস্তী।
