কিন্তু সবাই উত্তরমুখে হাঁটা ধরলেও দাঁড়িয়ে গেলেন সেনটেইন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকাভাবে ব্লেইনের কাঁধে ভর দিয়ে জানালেন, “ব্লেইন, আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। এই বৈরী প্রকৃতি আমার অনেক কিছুই কেড়ে নিল।”
“বুঝতে পেরেছি। হিরের লোকসান আসলেই খুব বড় ক্ষতি করে দিল। তবে এখনো হীরে উদ্ধারের আশা শেষ হয়ে যায়নি কিন্তু।”
না ব্লেইন। আমরা দুজনেই জানি এ কথা সত্যি নয়। হিরেগুলো আর ফিরে পাব না।”
“চুপ করে রইলেন রেইন। সত্যিই মিথ্যে আশা দেয়ার কোনো মানে হয় না।
“আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি ব্লেইন। আস্তে আস্তে ধসে পড়বে এত দিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা স্বপ্ন। হ্যাঁ, হয়ত ভিক্ষা চেয়ে ধার করে কিছুটা সময়ের জন্যে নিষ্কৃতি পাব; কিন্তু ভিত্তিটাই তো নড়বড়ে হয়ে গেছে। এক মিলিয়ন পাউন্ড অর্থ মোটেই ছোট কোনো পরিমাণ নয় ব্লেইন।”
সেনটেইন, আমি কিন্তু দরিদ্র নই, “আমিও তোমাকে সাহায্য করতে হাত বাড়িয়ে ব্লেইনের ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখলেন সেনটেইন।
“তোমার কাছে আমার একটাই চাওয়া আছে কেবল সামনের দিনগুলোতে আমি শান্তির কোনো একটা আশ্রয় চাই।”
“যখনই প্রয়োজন হবে আমাকে পাবে সেনটেইন। শুধু একবার ডেকে দেখো, প্রমিজ করছি আমি ছুটে আসব।”
“ওহ, ব্লেইন, যদি সত্যিই তাই হত!” মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন ব্লেইন।
“ইয়েস সেনটেইন” এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন ব্লিইন।
***
কনুইয়ের দুইঞ্চি নিচ থেকে লোথার ডি লা রে’র হাত কেটে ফেলে দিলেন পর্তুগিজ মিশনের যাজক ডাক্তার। অপারেশনের পুরো সময়টাতে সার্জিক্যাল মাস্ক মুখে দিয়ে ডাক্তারকে সাহায্য করেছেন সেনটেইন। তবে শেষ হতেই ছুটে গিয়ে বমি করাও কিছুতেই আটকাতে পারেননি। মিশনের কুঁড়েঘরে তাকে একাকী একটা রুম দেয়া হলেও বিতৃষ্ণা কাটাতে পারলেন না সেনটেইন। মনে হচ্ছে সারা শরীরে, চুলে, তুকে ছড়িয়ে পড়েছে গ্যাংগ্রিনের গন্ধ। একদা যে মানুষটাকে ভালোবেসেছিলেন তার পঙ্গু মুখচ্ছবি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।
কিন্তু তারপরেও কাজ হল না। পরের দিন দুপুরবেলা যাজক এসে বিড়বিড় করে জানালেন নিজের মনস্তাপের কথা, “আমি আসলে দুঃখিত। সংক্রমণ এত তীব্র যে আরেকটু কাটতে হবে।”
দ্বিতীয়বার ব্যাপারটা আরো অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেল। আরেকটু হলে বোধ হয় তিনি নিজেই অজ্ঞান হয়ে যেতেন। সেনটেইনের চোখের সামনে লোথারের আহত হাত কাঁধের নিচ থেকে কেটে ফেলে দিলেন ডাক্তার।
পরবর্তী তিনদিন কোমায় পড়ে রইলেন লোথার। মনে হল বুঝি জীবন মৃত্যুর সীমানাও পার হয়ে গেছেন।
এমনকি ডাক্তারও আশা করতে ভয় পেলেন।
যাই হোক, তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় লোথারের রুমে ঢুকতেই সেনটেইনের চোখে পড়ল হলুদ চোখ দুখানা মেলে তাকে দেখলেন লোথার।
তারপর আরো দুদিন পর ব্লেইনকে যাবার অনুমতি দিলেন ডাক্তার, মওকা পেয়ে আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেন কর্নেল।
“আমার সার্জেন্ট তোমার সার্বক্ষণিক চার্জে থাকবে। তারপর উইন্ডহকে নিয়ে যাবার পর বিচার হবে।”
বিবর্ণ, হাড়সর্বস্বদেহ নিয়ে ভাবলেশহীন চোখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন লোথার।
“তো, লোথার ডি লা রে ফাঁসির দড়ি এড়াবার মত ভাগ্যবান হয়ত তুমি নও। তবে যদি হিরেগুলো কোথায় আছে বলল, তাহলে হয়ত লড়াই করার খড়কুটো পেয়ে যাবে।”
মিনিটখানেক অপেক্ষায় পরেও লোখারের দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন দেখতে পেলেন না কর্নেল। বরঞ্চ মাখা হেলিয়ে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন লোথার।
“তুমি তো জানেনা যে আমিই এ অঞ্চলের প্রশাসক। সুতরাং আমার সুপারিশে অবশ্যই কাজ হবে। হিরেগুলো দিয়ে দও। বিনিময়ে তোমার জীবনের নিশ্চয়তা আমি দিব।”
চোখ বন্ধ করে ফেললেন লোথার।
“তো ঠিক আছে লোথার। দুজনেই বুঝতে পারলাম কী ঘটতে যাচ্ছে।” সার্জেন্টকে ডেকে চব্বিশ ঘণ্টাই লোথারকে গৃহবন্দি রাখার আদেশ দিলেন কর্নেল।
অতঃপর লম্বা লম্বা পা ফেলে নদীর তীরে কুঁড়েঘরে অপেক্ষারত সেনটেইনের কাছে চলে এলেন ব্লেইন। ধপ করে ক্যাম্প চেয়ারে বসেই একটা চুরুট ধরালেন। লোথারের ওপর রাগকে কিছুতেই কেন যেন দমাতে পারছেন না।
“লোকটার সাথে কিছুতেই আপোষ করা গেল না। আমি নিজে তাকে হিরের বিনিময়ে জীবন ফিরিয়ে দেবার নিশ্চয়তা দিলাম। অথচ কত বড় সাহস! উত্তর পর্যন্ত দিল না।”
চুরুটে লম্বা একটা টান দিয়ে জানালার ওপাশের নদীর দিকে তাকালেন ব্লেইন, “তুমি ভেবো না। যা করেছে তার জন্যে অবশ্যই মূল্য দিতে হবে।”
“ব্লেইন” কর্নেলের পেশিবহুল বাদামিরঙা বাহুতে আলতো করে হাত রাখলেন সেনটেইন, “তোমার মত মানুষের ক্ষেত্রে এতটা বাতুলতা শোভা পায় না।”
“সেনটেইন, তুমি জানো এই অভিযানে আমার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমি আমার কাজ ফেলে এখানে এসেছি। প্রিটোরিয়াতে আমার ঊর্ধ্বতনদেরকে নাখোশ করেছি। তাই হ্যানসমেয়ার আর তার সৈন্যরা এখানেই ডি লা রের কাছে থাকবে। সুস্থ হয়ে উঠলে উইন্ডহকে নিয়ে আসবে। তবে আমরা নদীপথে রুন্টু গিয়ে পুলিশ ট্রাক ঠিক করে নেব।”
সেনটেইনও মাথা নাড়লেন, “হুম, আমাকেও ফিরে গিয়ে অনেক কিছুর দেখভাল করতে হবে।”
“কাল সকালের প্রথম আলো ফুটলেই আমরা রওনা দেব।”
“ব্লেইন, যাবার আগে আমি লোথার ডি লা রের সাথে একবার কথা বলতে চাই।” খানিকটা দ্বিধার স্বরে জানালেন সেনটেইন, একাকী। প্লিজ ব্লেইন মানা করো না।”
