“আমি এখনো কেন তোমাকে এত ভালোবাসি?” ফিসফিস করে উঠলেন লোথার।
“ওর জন্য পানি দরকার।” সেনটেইনের গলা যেন স্পর্শ করে গেল লোখারের সারা শরীর। আবেগে চোখে জল এসে গেল পর্যন্ত।
“লোথার! আমি পানি নিতে আসছি।”
“আরো কাছে চলে এল সেনটেইনের গলা। তার মানে গাছের সীমানার বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
“আমি একদম একা লোথার।” একেবারে খোলা জায়গায় মাঝামাঝি চলে এলেন সেনটেইন।
“পিছিয়ে যাও!” চিৎকার করতে চাইলেন লোধার। কিন্তু পারলেন না। “আমি তোমাকে পানি নিতে দেব না, ম্যানির জন্য এটা করতেই হবে।”
গ্রেনেডের ফায়ারিং রিংয়ের হুক ধরলেন লোথার।
“আমি প্রথম ঘোড়াটার কাছে পৌঁছেছি, শুধু এক বোতল পানি নেব ব্যস।” জানিয়ে দিলেন সেনটেইন। একেবারে লোথারের হাতের মুঠোয় চলে এসেছেন সেনটেইন। চাইলে গ্রেনেডটাকে ছুঁড়তেও হবে না। শুধু গড়িয়ে দিলেই হবে। কিন্তু ঘৃণা নয় বরঞ্চ এত ভালোবাসেন এই নারীকে যে কেঁদে ফেললেন লোথার।
“আমি ফিরে যাচ্ছি লোথার, শুধু একটা বোতল নিয়েছি।”
এবারে কিন্তু সেনটেইনের গলায় এক ধরনের কৃতজ্ঞতা, তাদের সম্পর্কের এক ধরনের স্বীকৃতি টের পেলেন লোথার। এ এমন এক বন্ধন, সময় যার গায়ে এতটুকু আঁচড় ফেলতে পারেনি।
তারপরেই আবার শোনা গেল সেনটেইনের গলার স্বর প্রায় ফিসফিস করে লোথারকে বললেন, “ঈশ্বর যেন তোমাকে ক্ষমা করে দেন, লোথার ডি লা রে।”
আর তার পরেই চুপচাপ হয়ে হয়ে গেল চারপাশ।
মন খারাপ করে ফেললেন লোথার। এতটা গভীরভাবে আর কখনোই আহত হননি। সবকিছু এমনভাবে সমাপ্ত হল যে মনে হল অসহ্য হয়ে উঠল এ বেদনার ভার। গলার কাছে উঠে আসা কান্না থামাবার জন্য কাঁধের ওপর মাথা কাত করে দিলেন। আচমকাই টের পেলেন তিনি যেন কোনো অতল গহ্বরে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছেন আর পড়েই যাচ্ছেন।
***
“মারা গেছে।” পড়ে থাকা মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে আস্তে করে বল উঠলেন ব্লেইন ম্যালকম। অন্ধকারে দু’দিক দিয়ে চূড়ায় উঠেছে তার দল তারপর ভোর হতেই একত্রে ধেয়ে এসেও অবাক হয়ে গেলেন, “কিন্তু বাকিরা কোথায়?”
তাড়াতাড়ি বোল্ডারদের পিছনে খুঁজে এলেন সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার, “পাহাড়ে আর কেউ নেই স্যার। নিশ্চয় ভেগে গেছে।”
“ব্লেইন!” তাড়াতাড়ি ডাকলেন সেনটেইন, “কী হয়েছে?” ওঠার আগে জোর করেই তাকে নিচে রেখে এসেছেন ব্লেইন। কিন্তু ঠিকই চলে এলেন সেনটেইন। “ওরা কোথায়?” আর তারপরেই মৃতদেহটা দেখে সেখানেই বসে পড়লেন। লোথারের পাশে। “ওহ, ঈশ্বর।”
“ওহ, তাহলে এই লোকটাই ডি লা রে।” জানতে চাইলেন ব্লেইন।
“বাকিরা কোথায়? উদ্বিগ্ন মুখে ব্লেইনের দিকে তাকালেন সেনটেইন।
“এখানে আর কেউ নেই।” মাথা নাড়লেন কর্নেল।” ডি লা রে আমাদেরকে বোকা বানিয়ে ওদেরকে সরে পড়তে সাহায্য করেছে। এতক্ষণে বোধ হয় নদী পার হয়ে গেছে।”
ম্যানফ্রেড। এই প্রথমবারের মত ছেলের নাম মনে আনলেন সেনটেইন। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হল, হৃদয়ের গভীরে পুত্র হারানোর মত শোকও বোধ করছেন। চেয়েছিলেন ও এখানেই থাকুক। ছেলেকে শেষবারের মতন অন্তত দেখবেন। চোখ মেলে লোথারের দিকে তাকাতেই হাহাকারে ভরে উঠল সেনটেইনের অন্তঃস্থল।
কনুইয়ের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে পড়ে আছেন লোথার। আস্তে করে তার কানের নিচে করোটিভ আর্টারীতে হাত রেখেই চমকে উঠলেন সেনটেইন। দেহতৃক এখনো বেশ উত্তপ্ত হয়ে আছে।
“ও বেঁচে আছে।”
“তুমি নিশ্চিত?” ধুপ করে সেনটেইনের পাশেই বসে পড়লেন ব্লেইন। দু’জনে মিলে লোথারকে গড়িয়ে সোজা করতেই দেখা গেল পড়ে আছে আরেকটা গ্রেনেড।
“তুমি ঠিকই বলেছ।” নরম গলায় জানালেন ম্যালকমস, “সে চাইলেই কিন্তু তোমাকে গত রাতেই খুন করতে পারত।”
লোথারের মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। সুদর্শন সোনালি মুখখানা জ্বরের অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে গেছে।
“প্রচণ্ডভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে শরীর। বোতলে আর পানি আছে?” ব্লেইন লোথারের মুখে পানি ঢালতেই হাতের ব্যান্ডেজ খুলে ফেললেন সেনটেইন।
“রক্ত দূষিত হয়ে গেছে।” পচা মাংসের গন্ধও পেলেন। “হাত কেটে ফেলতে হবে। হাতের ক্ষত দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন হায়েনা কিংবা চিতা কামড়ে দিয়েছে।
“নদীর কাছে একটা পর্তুগিজ রোমান ক্যাথলিক মিশন আছে। যদি জীবিত ওখানে নিয়ে যেতে পারি তাহলে বলতে হবে যে সে সত্যিই ভাগ্যবান।” উঠে দাঁড়ালেন ব্লেইন। “সার্জেন্ট, তোমার একজন সেনা পাঠিয়ে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এসো আর বাকিদেরকে পাহাড়ের প্রতিটি ইঞ্চি খোঁজার কাজে লাগিয়ে দাও। মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যমানের হীরে খোয়া গেছে।”
কর্নেলকে স্যালুট করে ত্ৰস্তপায়ে চলে গেলেন সার্জেন্ট।
আবারো সেনটেইনের পাশে বসে পড়লেন ব্লেইন, “ফার্স্ট এইড কিট আসতে আসতে ওর দেহ তল্লাশি করে দেখা যাক। যদি কোনো হীরে থেকে থাকে।”
“সম্ভাবনা সত্যিই নেই। নিশ্চয় ছেলে আর ওই ওভাম্বো রাফিয়ানটাকে দিয়ে দিয়েছে।”
লোথারের নোংরা টিউনিক খুলে পরীক্ষা করে দেখলেন কর্নেল। আর ক্ষতস্থান মুছে পরিষ্কার সাদা ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন সেনটেইন।
খানিক বাদেই ফিরে এলেন হ্যানসমেয়ার। “কিছুই নেই স্যার।”
“ঠিক আছে সার্জেন্ট। এখন এই হতচ্ছাড়াটাকে ঘাড় গলা না ভেঙেই নিচে নামাতে হবে।”
পরবর্তী এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রার জন্য তৈরি হয়ে গেল পুরো দল। লোথার আর আহত সৈন্যকে মোপানির ডাল দিয়ে তৈরি খাঁটিয়াতে শুইয়ে অবশিষ্ট একমাত্র ঘোড়ার সাথে জুড়ে দেয়া হল।
