এবার নিশ্চয়ই পাহাড়টাকে চক্কর কাটার জন্য সৈন্য পাঠাবে।” অনুমান করলেন লোথার। কোনো সমস্যা নেই; মসার প্রস্তুত আছে।
“অন্ধকার নামতে এখনো পাঁচ ঘণ্টা বাকি। হেনড্রিক আর ম্যানি নদী তীরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে কাল ভোর হয়ে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত এদেরকে আটকে রাখতেই হবে।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই ডান দিকে নড়াচড় দেখা গেল। লোকগুলোর মাথার উপরের মোপানির গুঁড়ি টার্গেট করে গুলি ছুড়লেন লোথার। ভেজা সাদা গাছের ছাল ছিটিয়ে পড়ল বাতাসে।
“ভাগ, বেজন্মার দল ভাগ।” আবার হেসে ফেললেন। হিস্টিরিয়ার মত কিছুতেই যেন থামতে পারছেন না। তবে এরই ফাঁকে চোখের সামনে ভেসে উঠল ম্যানির মুখ।
“বাছা আমার। ঈশ্বর, আমি কেমন করে ওকে ছাড়া থাকব।”
আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে অন্ধকারে ছেয়ে গেল চোখের সীমানা। মাথাটাও আপনাতেই বুকের উপর ঝুলে পড়ল। চেতনা হারালেন লোথার।
একটু পরেই আবার জ্ঞান ফিরতে খেয়াল হল যে সূর্যের অসহ্য গরমটা কমে গেছে। বুক ভরে ঠাণ্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস নিলেন। সাথে সাথে তৃষ্ণাও পেল। কিন্তু বোতলের ঢাকনা খোলাটাও যেন এক কঠিন পরিশ্রম। এক চুমুক খেতেই গড়িয়ে পড়ে ভিজে গেল শার্ট। উত্তপ্ত পাথরে পড়তেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল মূল্যবান পানিটুকু। বোতলটা তুলে মুখ আটকে ফুঁপিয়ে উঠলেন লোথার।
কিন্তু কান পাততেই শুনতে পেলেন পাহাড়ে মানুষের আওয়াজ। গ্রানাইটের সিঁড়িতে স্টিলের লরির ঠকঠাক শুনেই কাঁধে রাইফেল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কিনারের কাছে এসে পাথরে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
উপরে যেহেতু আসেনি, তার মানে এখনো সিঁড়িতে। সমস্ত মন-প্রাণ ঢেলে কান পাতলেন লোথার। হ্যাঁ, ওই তো কাছেই চলে এসেছে। এমনকি কাপড়ের খসখসানির শব্দও কান এড়ালো না।
ওরা পেছন থেকে উঠছে।” এমনভাবে বললেন যেন ছোট্ট কোনো শিশুকে বোঝাচ্ছেন কী ঘটছে। কাঠের হ্যাঁন্ডেলের দিকে তাকাতেই মনে হল, “ওরা বড় বেশি কাছে চলে এসেছে।”
গ্রেনেডটাকে তুলে ফায়ারিং পিন টান দিলেও প্রথমটাতে জ্যাম হয়ে থাকায় কাজ হল না। তারপর এটার উপর ভর দিয়ে বসে টানতেই খুলে এল পিন।
সময় হিসাব করে কিনার দিয়ে গড়িয়ে ফেলে দিলেন গ্রেনেড। সাথে সাথেই কে যেন চিৎকার করে উঠল,
“হায় হায়! এটা একটা গ্রেনেড়!” প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন লোথার।
“যা ব্যাটা ইংরেজ শেয়াল।” হাঁচোড়-পাঁচোড় করে পালানোর জন্যে ফিরতি পথেই নামতে শুরু করল নিচের দল। কিন্তু কোনো বিস্ফোরণ ঘটল না।
হাসি থামিয় দিলেন লোথার। “ধুত্তোরি।”
আর তার পরেই দেরিতে হলেও হঠাৎই কানে এল প্রচণ্ড গর্জন। চূড়া থেকে অনেক নিচে বিস্ফোরিত গ্রেনেডের আওয়াজ ছাপিয়েও শোনা গেল একজন মানুষের আর্তনাদ।
তাড়াতাড়ি আবার নিচে উঁকি দিলেন লোথার। তিনজন খাকি ইউনিফর্মড সৈন্য দেখা দিতেই কোমরের কাছে মসার তুলে পরপর গুলি ছুড়লেন। আর যায় কোথায় পড়িমড়ি করে বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল সবকটা মাথা। একজন আবার শার্পনেলের গুতো খেয়ে আহত হয়েছে। সঙ্গীরা ধরে তাকে নিরাপদে অন্যদিকে সরিয়ে নিল।
এতসব পরিশ্রমের ধকলে একেবারে নিঃশেষ হয়ে পড়লেন লাথার। প্রায় একঘন্টা সেখানেই পড়ে থেকে বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার গেলেন দক্ষিণ দিকে। নিচে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল মৃত ঘোড়ার ঢোলা পেট। পানির বোতলগুলো এখনো সেখানেই আছে। তার মানে এগুলোর কাছে চুম্বকের টানে ওদেরকে আসতেই হবে।” আপন মনেই ভাবলেন লোথার।
খানিক বাদে মনে হল আবার বুঝি তার দৃষ্টিশক্তি আঁধার হয়ে এসেছে। কিন্তু না পশ্চিমে তাকাতেই দেখা গেল মিলিয়ে যাচ্ছে সূর্যের শেষ কমলারশ্মি। তারপর ঝুপ করে নেমে এল আফ্রিকার রাত। চুপচাপ শুয়ে থেকে নিচের লোকদের নড়াচড়ার জন্যে অপেক্ষা করছেন লোথার। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব রহস্যময় যেসব আওয়াজ যেমন শিকারি বাদুরের ডানা ঝাঁপটানো শেয়াল আর কীট-পতঙ্গের শব্দ ছাপিয়ে মানুষের তৈরি শব্দ শোনা বেশ কঠিন কাজ।
তবে লোহার পা-দানির উপর ক্লিক শব্দ হতেই সচকিত হয়ে উঠলেন লোথার। হাত ঘুরিয়েই ছুঁড়ে মারলেন গ্রেনেড। বিস্ফোরণের আলোয় দেখা গেল মৃত ঘোড়াগুলোর কাছে বেশ কয়েকজন হাঁটছে। দু’জনে ধারণা করলেও নিশ্চিত না হয়েই ছুঁড়ে মারলেন দ্বিতীয় গ্রেনেড।
আরো একবার কমলা আলোয় চোখে পড়ল মানুষের ছুটন্ত দেহ। নাহ, পানির বোতল নিতে পারেনি।
কিন্তু তাঁর নিজের গ্রেনেডও শেষ। আর মাত্র একটা আছে। বুকের কাছে পরম ধনের মত সেটাকেই আঁকড়ে ধরে উঁচু গলায় বলে উঠলেন, “ওদেরকে কিছুতেই পানি নিতে দেব না। আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত আটকে রাখতেই হবে।” অথচ ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন শরীরের কাহিল দশা। মাথা ক্রমাগত ঘুরছে। তারপরেও দূরত্ব আর সময়ের হিসাব করে বের করলেন, “আর আট ঘণ্টা গেলেই নিরাপদে নদী পার হয়ে যাবে হেনড্রিক আর ম্যানি।”
লোথার!” আচমকা নিজের নাম শুনে ভাবলেন জ্বরতপ্ত মনের কল্পনা; কিন্তু না। আবার শোনা গেল, লোথার।”
উত্তর দেবার জন্যে মুখ খুলেও আবার বন্ধ করে ফেললেন। দেখা যাক কী বলতে চায় সেনটেইন কোর্টনি।
“লোথার, আমাদের একজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।” লোথার হিসাবে করে দেখলেন সেনটেইন বনের কিনারে বসে কথা বলছেন। কল্পনার চোখে স্পষ্ট দেখলেন সাহসী আর গাঢ়রঙা দু চোখ জোড়া।
