“আমি তোমার সাথে থাকব।” ছেলের কব্জি ধরে অতঃপর হাত দিয়ে কাঁধ চেপে ধরলেন লোথার। “তুমি কি চাও আমি তোমার এই কাঁদুনে চেহারাটাই মনে রাখি?” ..
“পা, প্লিজ আমাকে তোমার কাছে থাকতে দাও।”
ছেলের হাত ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে এসে প্রচণ্ড জোরে ম্যানিকে এক চড় কষালেন লোথার। সাথে সাথে গালে ফুটে উঠল লাল লাল দাগ; এমন কি নাক কেটে ঠোঁটের উপরও গড়িয়ে পড়ল রক্ত। এতটাই বিস্মিত হয়ে গেল যে বাবার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল ম্যানি।
“চলে যাও এখান থেকে নিজের সর্বশক্তি জড়ো করে ধমক দিলেন লোথার।
নড়ে উঠে সামনে এগোল ম্যানি। চোখে এখনো অবিশ্বাস। কিছুতেই ভাবতে পারছে না যে বাবা কেন এমন করল। কিনারের দিকে যেতেই হোঁচট খেয়ে আবার পিছু ফিরে তাকাল,
“বাবা! প্লিজ, আমাকে”
“যাও, আর কোনো কথা নয়, যাও!”
এগোতে গিয়ে ধপাস করে ওপাশে গড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেন্ড। আর ছেলে চোখের আড়াল হতেই প্রথমবারের মত ফুঁপিয়ে উঠে নিঃশব্দে পুরো শরীর কাঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন লোথার।
“জ্বর, আসলে জ্বরটাই বোধ হয় আমাকে দুর্বল করে ফেলেছে।” নিজেকে প্রবোধ দিলেও কিছুতেই ভুলতে পারছেন না ছেলের অনিন্দ্যসুন্দর সোনালি চেহারা। আপন মনেই ফিসফিস করে বলে উঠলেন, “মাফ করে দে বাবা, মাফ করে দে। নয়ত তোকে বাঁচানো যেত না।”
***
লোথার নির্ঘাত বেহুশ হয়ে পড়েছিলেন। কারণ আচমকা জেগে উঠে প্রথমে ঠাহর করতে পারলেন না যে কোথায় আছেন কিংবা কীভাবে এসেছেন এ জায়গায়। তারপরেই অবশ্য হাতের ক্ষতের গন্ধে সবকিছু মনে পড়ে গেল। হামাগুড়ি দিয়ে চুড়ার কিনারে গিয়ে নিচে তাকাতেই চোখে পড়ল ছোট্ট দুই মানবাকৃতির দেহ।
“বুশম্যান!” ওদের এত দ্রুত এগিয়ে আসার কারণটাও বুঝতে পারলেন লোথার, “ও আমার পিছনে পোষা বুশম্যানদের লাগিয়ে দিয়েছে। এ কারণেই তার সমস্ত কৌশলও বৃথা গেছে। কারণ পদচিহ্ন দেখে কারো পিছু নিতে এদের মত ওস্তাদ অন্য কোনো গোত্র নেই।
বুশম্যানদের পেছনে পেছনে আসছে মোট সাতজন। কিন্তু চোখ দুটো সরু করেও ঘোড়সওয়ারদের মধ্যে নারী শরীরটাকে আলাদা করতে পারলেন না লোথার। মোপানির ঘন ঝাড়ে আটকে যাচ্ছে দৃষ্টি। এবার নিজের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিলেন। পিছু ধাওয়াকারীদেরকে যতদূর সম্ভব দেরি করিয়ে দিতে হবে আর এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে যেন ওরা ভাবতে বাধ্য হয় যে তিনি গোটা দল নিয়েই উপরে বসে আছেন।
এক হাতে কাজ করাটা সত্যিই দুঃসাধ্য। তারপরেও বহু কষ্টে ক্লেইন বয়ের রাইফেলটাকে সমভূমির দিকে নিশানা করে ফিট করে রাখলেন।
খানিক বাদে বাদেই মিনিটখানেকের জন্য হলেও বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। পা দুটো যেন কিছুতেই আর ভার বইতে নারাজ। অন্যদিকে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসছে।
আবারো একবার নিচে তাকাতেই দেখলেন যে প্রায় সমভূমির কিনারে চলে এসেছে পিছু ধাওয়াকারী। এবারে সেনটেইনকে চিনতে পারলেন। এমনকি গলার কাছে পেঁচানো হলুদ স্কার্ফটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জ্বরতপ্ত শরীরেও অনুভব করলেন এক অম্ল-মধুর শ্রদ্ধা, “হায় ঈশ্বর, কখনোই হারতে চায় না। মনে হয় নরকের ওপাড়েও ঠিকই পিছু নেবে।”
তারপর নষ্ট পানির বোতলগুলোর কাছে গিয়ে তিন সারিতে সাজিয়ে লেদার স্ট্র্যাপ দিয়ে এমনভাবে সাজালেন যেন চাইলেই এক টানে কাজে লাগানো যায়।
“সোজা গুলি করা ছাড়া আর কিছু করার নেই আসলে।” ফিসফিস করে নিজেকেই যেন শোনালেন লোথার। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে গলা; পুরো শরীর যেন দাউদাউ করে জ্বলছে। তাড়াহুড়া করে পানির বোতলের মুখ খুলে কয়েক ঢোঁক খেয়ে নিতেই অবশ্য ভালো লাগল। অতঃপর নিজের জ্যাকেট ভাজ করে কুশন বানিয়ে উপরে মসার রাইফেল রেখে তাক করলেন সামনের দিকে। ততক্ষণে নিচে মৃত ঘোড়াটার কাছে এসে পৌঁছে গেছে সেনটেইনের দল। এতগুলো ঘোড়া দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন লোথার।
বহু নিচে লুটিয়ে পড়ল ব্লেইন ম্যালকমসের ঘোড়া। নিজের মসার ছাড়াও স্ট্যাপ টেনে ক্লেইন বয়ের রাইফেলও কাজে লাগাচ্ছেন। অদ্ভুত ব্যাপার হল ঘটনার উত্তেজনায় যেন কমে গেছে দেহের তাপমাত্রা। স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে দৃষ্টিশক্তি। একের পর এক বুলেট গিয়ে ধরাশায়ী হল সবকটা ঘোড়া কেবল বেঁচে গেল সেনটেইনেরটা। কিন্তু কিছুতেই সেদিকে ট্রিগার টিপতে পারলেন না।
মোপানির পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল সেনটেইন। সাথে ব্লেইন। শোনা যাচ্ছে ছুটন্ত সৈন্যদের আর্তচিৎকার। চাইলে তাদেরকেও পরিষ্কার নিশানা বানিয়ে ফেলতে পারেন লোথার। তবে এর পরিবর্তে ভাবলেন দেখা যাক কতক্ষণ এভাবে পার করে দেয়া যায়।
একেবারে শেষ সৈন্যটাও মোপানির আড়ালে চলে যেতেই খেয়াল হল প্রচণ্ড কাঁপছেন আর একই সাথে ঘামছেন।
“না, না, এভাবে হবে না। তৈরি হতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে।”
এবার দ্বিতীয় রাইফেলের কাছে গিয়ে রিলোড করে নিলেন। খানিক বাদেই চোখে পড়ল গিরি সংকটের মুখে হেলমেট। সেই বোয়ার যুদ্ধের সময় থেকেই সকল সৈন্য চেনে এই অনর্থক হাস্যকর কৌশল।
“ঠিক আছে দেখা যাক তাহলে। কে কাকে খোয়াড়ে পোরে।” হেসে ফেললেন লোথার।
দুটো রাইফেল থেকে একসাথে গুলি ছুড়লেন। পাশাপাশি খালি পানির বোতলের তূপ ধরেও ঝাঁকুনি দিলেন। অত নিচ থেকে আকাশের দিকে তাকালে যে কেউ বোতলগুলোকেও রাইফেলম্যান বলে ভুল করবে।
