“কোনো সমস্যা নেই। অন্ধকার নামলেই বাকি বোতলগুলোও উদ্ধার করে নিয়ে আসব।” তারপর কর্কশ কণ্ঠে সার্জেন্টকে আদেশ দিলেন, “দুজনে সৈন্য নিয়ে ঘুরে আরেক পাশে চলে যান। কেউ যেন ওদিক দিয়ে পালাতে না পারে।”
***
গ্রানাইটের চুড়ার গোলাকার বিশাল এক বোল্ডারের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছেন লোথার ডি লা রে। কোলের মাঝে মসার রাইফেল। কপালের ওপর লুটিয়ে পড়েছে নরম সোনালি রঙা চুল।
দক্ষিণের মোপানি জঙ্গলটার দিকেই একমনে তাকিয়ে আছেন। খাড়া গ্রানাইটের দেয়াল বেয়ে ওঠার ধকল এখনো সামলাতে পারেননি।
“আমাকে এক বোতল পানি এনে দাও, ব্যস।” হেনড্রিককে জানাতেই কথামত কাজ করলেন ওভাষো।
মাথা নেড়ে গ্রানাইটের স্ল্যাবের ওপর পড়ে থাকা বাকি জিনিসগুলোও চেক করে দেখলেন লোথার। চারটা হ্যান্ড গ্রেনেড, যেগুলোতে কাঠের হ্যাঁন্ডেল লাগানো আছে। এছাড়া ক্লেইন বয় তার রাইফেল রেখে যাচ্ছে, সাথে বুলেট। তার মানে লোখারের কাছে দুইটা মসার রাইফেল আর দেড়শ’ রাউন্ড গুলি, আছে।
“অল রাইট” সব দেখেশুনে জানালেন লোথার। আমার যা যা দরকার সব আছে। তোমরা এবার রওনা দাও।”
নিজের কামানের গোলার মত মাথাটা ঘুরিয়ে দক্ষিণে তাকালেন হেনড্রিক। পিছু ধাওয়াকারীদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না এখনো। কিন্তু মাথা সরাতে যেতেই আবার থেমে গেলেন। “ধুলা!” প্রায় পাঁচ মাইল দূরে হলেও অস্পষ্ট কুয়াশার মত ঠিকই দেখা যাচ্ছে।
“হ্যাঁ।” মিনিটখানেক আগে লোথারও খেয়াল করেছেন।
“হয়ত জেব্রার দল হবে। এখন যাও। দেরি হয়ে যাবে।”
কিছু না বলে লোখারের হলুদ রঙা চোখের দিকে তাকালেন হেনড্রিক। সাধারণত কখনো লোথারের আদেশের বিপক্ষে যান না। জানেন সেটাই সঠিক কিন্তু এবারে কেন যেন কিছু বলতে মন চাইল; অথচ ভাষাও খুঁজে পাচ্ছেন না। টের পেলেন যেন নিজের শরীরের একটা অংশকেই রেখে যাচ্ছেন এই রৌদ্রে ক্ষয়ে যাওয়া পাথরগুলোর ওপরে। কেবল সহজ, সাধারণভাবে জানালেন, “আমি ওর খেয়াল রাখব।” মাথা নাড়লেন লোথার।
“আমি একটু ম্যানির সাথে কথা বলতে চাই।” রক্তে বিষ মিশে যাওয়ায় কেঁপে উঠলেন, বললেন, “তোমরা নিচে গিয়ে অপেক্ষা করো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পাঠিয়ে দেব।”
“চল,” উঠে দাঁড়িয়ে ক্লেইন বয়কে ইশারা করে শিকারি চিতার মতই ক্ষিপ্রগতিতে কিনারের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলেন হেনড্রিক। কেবল যাবার আগে একবার পিছু তাকিয়ে ডান হাত তুলে লোথারকে বললেন,
“ভালো থেকো।
“তুমিও ভালো থেকো, বন্ধু।” এর আগে কখনো বন্ধু শব্দটা উচ্চারণ করেননি লোথার। শুনে তাই খানিকটা কেঁপে উঠলেও আর কিছু বললেন না হেনড্রিক।
“ম্যানফ্রেড” বাবার কাছে এসে বসল ম্যানফ্রেড। একাগ্র মনে তাকিয়ে দেখল বাবার চেহারা, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি। ফিসফিস করে বলে উঠল, “পা, আমি যাব না। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”
নিজেকে নরম হতে দিলেন না লোথার, “আমি যা বলেছি তুমি ঠিক তাই করবে।”
“পা—”
“তুমি সবসময় আমার বাধ্য ছেলে হয়ে থেকেছে ম্যানি। তাই তোমাকে নিয়ে আমি অনেক গর্ব করি। এখন আর অবাধ্য হয়ো না। আমি যেন না ভাবতে পারি যে আমার ছেলে একটা কাপুরুষ।”
“আমি কাপুরুষ নই!”
“তাহলে যা করতে হবে তাই করো।” ম্যানি আর কিছু বলার আগে কর্কশ কণ্ঠে লোথার আদেশ দিলেন, “যাও, হ্যাঁঙারস্যাকটা নিয়ে এসো।”
কথামত কাজ করল ম্যানি। পায়ের কাছে ব্যাগ রেখে সুস্থ হাত দিয়ে খুলে ফেললেন লোথার। একটা প্যাকেট নিয়ে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেললেন কাগজ। তারপর গ্রানাইটের উপর ছড়িয়ে দিলেন সবগুলো হীরে। খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে বড় আর সাদা দশটা পাথর বেছে নিলেন।
অতঃপর ছেলেকে আদেশ দিলেন, “তোমার জ্যাকেট খোলো।”
ম্যানফ্রেড জ্যাকেট খুলে বাবার হাতে দিলে পর লাইনিংয়ের মাঝে ছোট্ট একটা গর্ত করে ফেললেন,লোথার।
“এই হীরেগুলোর মূল্য হবে হাজার হাজার পাউন্ড। যা দিয়ে তোমার বড় হওয়া আর পড়াশোনার সব খরচ মেটানো যাবে। আঙুল দিয়ে ঠেলে ঠেলে সবকটা পাথরই লাইনিংয়ের মাঝে ঢুকিয়ে দিলেন।
“কিন্তু বাকিগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি আর ভারি হওয়ায় লুকানোও কষ্টকর হবে। তাই তুমি সাথে নিয়ে না যাওয়াই ভালো।” বহু কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালেন লোথার, “এসো।”
তারপর বড় বড় বোল্ডারগুলো ধরে চলে এলেন এমন এক জায়গায় যেখানে গ্রানাইটের মাঝে চিকন একটা ফাঁক আছে। দেখে মনে হবে বাটালি দিয়ে কাটা হয়েছে। ফাটলটা মাত্র হাত ঢোকানোর মত চওড়া হলেও ভেতরে বেশ গভীর। উঁকি দিয়েও তল দেখা যায় না। ত্রিশ ফুট মতন হতে পারে।
হ্যাঙারস্যাকের দড়ি উপুড় করে ফাটলের মধ্যে ঢেলে দিলেন লোথার। তারপর ফিসফিস করে ছেলেকে জানালেন, “এই জায়গাটা মনে রেখো। প্রয়োজনের মুহূর্তে তোমার জন্যে অপেক্ষা করবে এসব পাথর।”
পিতা-পুত্র দুজনে একসাথে উঁকি দিতেই প্রায় ত্রিশ ফুট নিচে হালকা রঙের আভা চোখে পড়ল। তবে না জানলে পথচারীদের কেউ বুঝতেই পারবে না যে এখানে কোনো সম্পদ লুকানো আছে।
“অল রাইট। হেনড্রিক তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এখন যাও ম্যানি।” হামাগুড়ি দিয়ে জায়গাটা থেকে সরে এলেন লোথার।
ইচ্ছে করল শেষবারের মতন ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন; বুক ভরে ছেলের গন্ধ নেন, নাকে-মুখে চুমু দেন। কিন্তু নড়লেন না লোথার। জানেন তাহলে দু’জনেই দুর্বল হয়ে পড়বেন। তাই কর্কশ কন্ঠে আদেশ দিলেন, “যাও!” ফুঁপিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রইল ম্যানি।
