খানিক বাদে গ্রানাইটের কাছে পৌঁছে দেখা গেল লোথার ডি লা রে’র সর্ব শেষ ঘোড়ার দেহ।
নতুন মানুষকে দেখে বেচারা মাথা উঠাতে চাইলেও অল্প পরিশ্রমে আবার হেলে পড়ল মাটিতে। খানিক দূর গিয়ে ঘুরে এল কিউয়ি। তারপর চোখ উপরের দিকে তুলে কী যেন দেখাল।
অন্যরাও এগিয়ে গিয়ে খাড়া সুউচ্চ গোলাকার গ্রানাইটের চূড়ার দিকে তাকাল। না হলেও দুইশ থেকে তিনশ ফুট উঁচু। কিন্তু পৃষ্ঠদেশ দূর থেকে যতটা মসৃণ লেগেছিল বাস্তবে তা নয়। তাছাড়া বহুদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর উষ্ণ আবহাওয়ায় জায়গায় জায়গায় ক্ষয়েও পড়েছে। ফলে ছোট ছোট সিঁড়ি মতন তৈরি হয়েছে যেটার উপর পা রেখে উপরে হয়ত ওঠা যাবে; তবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে সে সিদ্ধান্ত।
একেবারে চূড়ার নিখুঁত গোলাকার বোল্ডারগুলো দেখে সেনটেইনের মনে পড়ে গেল ছোটবেলার ফ্রান্সে দেখা সমাধিকক্ষ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলের মাঝের মায়ান মন্দিরের কথা।
নিজের ঘোড়া নিয়ে গ্রানাইট চূড়ার পাদদেশে চলে গেলেন ব্লেইন। আর তখনি কী যেন একটা দেখে অবাক হলেন সেনটেইন। মাথার বোল্ডারগুলোর পেছনে যেন নড়ে উঠল একটা ছায়া।
“ব্লেইন, সাবধানে! ওই যে উপরে- কিন্তু সেনটেইনের সতর্কবাণী শুনে সরে আসার আগেই গমের বস্তার মত ধপ করে পাথরের মেঝেতে পড়ে গেলেন ব্লেইন আর তার ঘোড়া। উপর থেকে প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসা বুলেটে ধরাশায়ী হয়েছে তার ঘোড়া।
মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন আর সে সময়ই কানে এল মসার রাইফেলের আওয়াজ। তার মানে শব্দের আগেই বুলেটটা যথাস্থানে পৌঁছে গেছে।
চারপাশে যেন নরক ভেঙে পড়েছে। আতঙ্কিত ঘোড়াগুলোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সৈন্যদের দল। নিজের ঘোড়া নিয়ে কর্নেলের কাছে ছুটলেন সেনটেইন। মৃত ঘোড়াটার পাশেই পড়ে আছেন ক্লেইন। কিন্তু তাকে তুলে দাঁড় করাবার আগেই আরেকটা বুলেট এসে ঝাঁঝরা করে দিল হ্যাঁনসমেয়ারে ঘোড়াকে; মাথা মাটিতে ঠুকে পড়ে গেলেন সার্জেন্ট।
তাই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েই সেনটেইনের দিকে দৌড় দিলেন ব্লেইন। কোনো রকম জিন ধরেই ছুটছেন সামনে। তারপরেও সেনটেইনকে মানা করলেন যেন ঘোড়া না থামায়। এদিকে চকিতে একবার পিছনে তাকাতেই সেনটেইনের চোখে পড়ল বুলেট এসে শেষ করে দিয়ে গেছে আরেকজন সৈন্যকে।
অতএব কেবল বেঁচে আছে সেনটেইনের ঘোড়া। বাকি সবগুলো মাথায় গুলি খেয়ে মারা গেছে। দেড়শ’ কদম দূর থেকে এতটা নিখুঁত রেঞ্জে গুলি করা যার-তার কাজ নয়।
ছুটতে ছুটতেই সামনে দেখলেন কয়েকটা মরা মোপানির ডাল পড়ে প্রাকৃতিক দুর্গ মতন তৈরি হয়েছে। লাগামের দড়ি ছেড়ে গড়িয়ে সেদিকে চলে গেলেন কর্নেল। “গাধার মতন গিয়ে ওদের অ্যাম্বুবুশে পা দিলাম।” বোঝ গেল নিজের উপরেই বেজায় ক্ষেপে গেছেন। তারপর ঝট করে সেনটেইনের ঘোড়ার পা-দানি থেকে রাইফেল নিয়ে তীরের মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন। আহত হলেও অক্ষত আছেন সার্জেন্ট। তাড়াতাড়ি বাকি সৈন্যদেরকে নিয়ে চলে এলেন সেনটেইনদের কাছে।
তবে মজার ব্যাপার হল প্রথম গুলির শব্দ শোনার সাথে সাথে হাওয়া হয়ে গেছে বুশম্যান দুই ভাই। সেনটেইন ভালোভাবেই জানেন এতক্ষণে হয়ত ওচি প্যানেও পৌঁছে গেছে।
লি এনফিল্ড বের করে ছুটন্ত সৈন্যদেরকে কাভার দিলেন ব্লেইন। কিন্তু চারশ’ গজ দূরের চূড়ার লোকটাকে কিছুতেই দেখা যাচ্ছে না। বারুদের নীল ধোয়া তাকে আড়াল করে রেখেছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে তীরে এসে পৌঁছে গেলেন সার্জেন্ট আর তার দল। সবাই যে যার রাইফেল ঠিকই নিয়ে এসেছে দেখে সন্তুষ্ট হলেন কর্নেল।
“ওরা কেবল প্রতিটি ঘোড়ার মাথা টার্গেট করেছে। কোনো মানুষকে নয়।” কোনোরকমে দম নিতে নিতে জানালেন হ্যানসমেয়ার।
“আমার আশপাশেও একবারও গুলি ছোড়েনি।” বললেও সেনটেইন, বুঝতে পারলেন যে লোথার তবে বিপদে ফেলতে চান না। কিন্তু ইচ্ছে করলেই যে তার মাথায় বুলেট ঢুকিয়ে দেয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না তা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
এনফিল্ড রিলোড করে হাসলেন ব্লেইন। যেন বেশ মজা পেয়েছেন, এমনভাবে বললেন, “শয়তানটা আসলে নিজের নামের পাশে খুনি তকমাটা লাগাতে চায় না। তারপর হ্যাঁনসমেয়ারের কাছে জানতে চাইলেন, “কতজন আছে উপরে?”
“জানি না। তবে একের বেশি। একজন এতটা ফায়ার করতে পারবে না।”
“অল রাইট। চলো তাহলে খুঁজে দেখি আসলেই কতজন আছে।” সেনটেইন আর সাজেন্টের দিকে ঝুঁকে নিজের পরিকল্পনা বুঝিয়ে দিলেন কর্নেল।
বাইনোকুলার নিয়ে গিরিখাতের মুখে চলে এলেন সেনটেইন। তারপর ঘাসের গুচ্ছের পেছনে লুকিয়ে দূরবিন একেবারে গ্রানাইটের চূড়ার দিকে ফোকাস করলেন।
“রেডি!”
সেনটেইনের ঘোষণা শুনে হ্যানসমেয়ার উপরের লোকটার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পরপর দুবার গুলি ছুড়লেন। ব্লেইনের নিজের রাইফেলের ওপর হেলমেট পরিয়ে রেখেছিলেন। তাই সার্জেন্টের গুলির সাথে সাথে প্রতিউত্তর হিসেবে ঝাঁঝরা হয়ে গেল কর্নেলের হেলমেট।
“তিনজন।” দূরবীন চোখে সবকিছু পরিষ্কার দেখে জানালেন সেনটেইন।” আমি তিনটা মাথা দেখেছি।”
“গুড।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন।
ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো থলে থেকে পানির বোতল এনে কর্নেলকে দেখালেন সেনটেইন, “মাত্র এটুকুই আছে।” চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম পানি দেখে অবচেতনেই ঠোঁট চাটলেন কর্নেল,
