ঘোড়াগুলো পানি খেয়ে উঠে যাবার পর বুট জুতা খুলে সম্পূর্ণ কাপড় পরেই পানিতে নেমে গেলেন সেনটেইন।
তীরে ওঠার সময় আড়চোখে তাকাতেই দেখেন যে শার্ট খুলে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মাথায় ছিটে দিচ্ছেন ব্লেইন। এই প্রথম কর্নেলকে উদোম গায়ে দেখলেন সেনটেইন। বুকের ঘন কোকড়া লোম থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়া পানির বিন্দু দেখে শিহরিত হয়ে উঠল তার সারা শরীর। পালিশ করা মার্বেলের মত দেহখানা দেখে মনে পড়ে গেল মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডের কথা।
সেনটেইনকে এগোতে দেখে তাড়াতাড়ি শার্ট পরে নিলেন ব্লেইন। সাথে সাথে ভিজে গেল কাপড়। কর্নেলের ভদ্রতা দেখে হেসে ফেললেন সেনটেইন, জানালেন, “ডি লা রে এখানে কোনো বাড়তি ঘোড়া পায়নি।”
অবাক হয়ে গেলেন কর্নেল, “কীভাবে বুঝলেন?”
“কিউয়ি বলেছে দু’জন মানুষ অনেকগুলো ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষা করলেও বহুদিন আগেই আবার চলেও গেছে। ইয়েস আমিও নিশ্চিত।”
হাত দিয়ে ভেজা চুল ঠিক করে নিলেন ব্লেইন, “তার মানে লোথারের পরিকল্পনাতে কোনো একটা গড়বড় হয়েছে।”
“কিউয়ি বলছে ওরা নাকি পায়ে হেঁটে সামনে এগিয়েছে।” হঠাৎ করেই বনের কিনার থেকে শোনা গেল কিউয়ির গগনবিদারী চিৎকার। তাড়াতাড়ি সেদিকে ছুটলেন দুজনে।
অ্যাকেশিয়া গাছের নিচে পড়ে আছে খাবারের পাত্র, টিনজাত মাংস, কম্বল। পা দিয়ে জিনিসগুলো উল্টে দিলেন ব্লেইন,
“দেখো ওরা কতটা মরীয়া হয়ে সব ফেলে গেছে। হর্স আয়রনও পড়ে আছে। শেষবারের মতন নদীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।”
“এখানে দেখো ব্লেইন,” সেনটেইনের কাছে যেতেই দেখা গেল বালির উপর পড়ে আছে ব্যান্ডেজ।
“ওর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। ও মারা যাচ্ছে ব্লেইন।” অদ্ভুত হলেও সত্যি সেনটেইন কেন যেন বিজয়ের উল্লাসও বোধ করছেন না।
চড়া গলায় সার্জেন্টকে ডাকলেন ব্লেইন, “আমরা ঘণ্টাখানেকের মাঝেই আবার রওনা দেব। সবার খাওয়া হয়েছে কিনা দেখো।” তারপর সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে দেখেন যে নিজেকে ভালোই সামলেছেন।
ছায়ার নিচে পাশাপাশি এসে বসলেন দুজনে। গরম আর ক্লান্তিতে ক্ষুধাও মরে গেছে। চুরুট ধরাতে গিয়েও কী মনে করে রেখে দিলেন কর্নেল। সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“প্রথম দেখায় আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি তোমার হিরের মতই সুন্দর, জেদী আর বুদ্ধিমান।”
“আর এখন?”
“তোমাকে আমি পঙ্গু ঘোড়ার জন্যে কাঁদতে দেখেছি। এতটা ক্ষতি করেছে যে তোক তার জন্যেও তোমার চোখে গভীর সমবেদনা দেখেছি। কালক্লান্ড ছাড়ার পরেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আর এখন তো শ্রদ্ধাও করি। বুঝলে?
“এটা কি ভালোবাসার চেয়ে ভিন্ন কিছু?”
“অবশ্যই।”
আর কিছু না বলে দুজনেই কিছুণ চুপ করে রইলেন। তারপর সেনটেইন জানালেন, “ব্লেইন, অনেকদিন ধরেই আমি একা। কেবল আমার ছেলেকে নিয়ে ভেবেছি। ওর জন্য নানান পরিকল্পনা করেছি। যখন মরুভূমিতে এসেছিলাম তখন থেকেই জানি যে আমিই আমার ভরসা। আপন শক্তি আর মনোবল ছাড়া বাকি সবকিছু মিথ্যা। এখনো এ ধারণার পরিবর্তন হয়নি। আমার জন্য কেউই নেই। তাই না ব্লেইন?”
চোখ না সরিয়েই কর্নেল উত্তরে বললেন, “যদি
উনার হয়ে লাইনটা শেষ করলেন সেনটেইন, “ইসাবেলা আর মেয়েরা তো আছে।”
মাথা নাড়লেন ব্লেইন। “কিন্তু আমি নিজেকে সামলাতে পারি তাই না ব্লেইন?”
“আমার সাথে এতটা কঠোর হয়ো না। আমি কখনোই কোনো প্রতিজ্ঞা করিনি তোমার কাছে।”
“আয়্যাম সরি।” নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপ করে গেলেন সেনটেইন। একটু পরে জানালেন, “সত্যিই তাই। তুমি তো আমার কাছে কোনো প্রমিজ, করোনি।” তাড়াতাড়ি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “চলল। আমাদের সময় শেষ।”
***
এবার বাধ্য হয়ে নিজেদের পাঁচটা ঘোড়াও রেখে যেতে হল। আর বাকিগুলোকে ক্লান্ত হতে না দেয়ার জন্য ব্লেইন খানিক হাঁটছেন, খানিক আবার ঘোড়ায় চড়ে এগোচ্ছেন।
কেবল বুশম্যান ভ্রাতৃদ্বয়কে গরম, তৃষ্ণা কিংবা ক্লান্তি কিছুই কাবু করতে পারেনি।
এদিকে প্রচণ্ড কাহিল হয়ে পড়েছেন সেনটেইন। শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা পর্যন্ত ব্যথায় টনটন করছে। জিহ্বা যেন ভারি হয়ে চামড়ার মত শক্ত হয়ে গেছে। মাথায় কেবল একটাই চিন্তা যে আবার কখন পানির কাছে। পৌঁছাতে পারবেন।
দলের কেউ কোনো কথা বলছে না। পাছে সেটুকু শক্তিও নষ্ট হয়ে তাদেরকে আরো ক্লান্ত করে তোলে।
মনে মনে ভয় পেয়ে গেলেন সেনটেইন। কিছুতেই সারেন্ডার করা চলবে না। বহুকষ্টে মাখাটা উপরে তুলে রাখলেন যেন পায়ের কাছে ঝুলে না পড়ে। কয়েক কদম এগিয়ে গেছেন ব্লেইন। প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আর মনোবল খাটিয়ে পা চালিয়ে নিজেও চলে এলেন তার পাশে। তৎক্ষণাৎ মনে হল এই তো নিজ শরীরের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে জিতে গেছেন।
এদিকে ফিরে হাসলেন ব্লেইন। যদিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, কত কষ্ট করে তা করছেন, “ওই টিবিগুলো কিন্তু মানচিত্রে নেই।”
এতক্ষণ সেনটেইনের চোখে পড়েনি। এবার চোখ তুলে তাকাতেই তিনিও দেখতে পেলেন। মাইলখানেক সামনেই জঙ্গলের মাথা কুঁড়ে বেরিয়েছে মসৃণ গ্রানাইট।
“একেবারে কাছের পাহাড়টার কাছে গিয়েই আমরা পানি পান করব।” সেনটেইনের অবসাদ পরিষ্কারভাবে অনুভব করছেন কর্নেল।
“গাধাকে গাজর দেখাচ্ছে।” আপন মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন।
