“ব্যাটারা নির্ঘাৎ ঘোড়াগুলো পর্তুগিজদের কাছে বেঁচে বউদের কাছে ফিরে গেছে।” ধপ করে বসে পড়লেন হেনড্রিক।
“আমার কাছে প্রমিজ করো হেনড্রিক আবার ওদের সাথে দেখা হলে তুমি ওদেরকে ধীরে, অতি ধীরে ধীরে খুন করবে।”
“এটাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন।” ফিসফিস করে উঠলেন সোয়ার্ট, “যার যার পুরুষাঙ্গ কেটে টুকরো টুকরো করে দু’জনকেই খাইয়ে দেব।”
চুপচাপ পুলের কিনারে নিজেদের চারটা ঘোড়ার ছোট্ট দলটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল সকলে।
কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে রাখার সময়ও তো নেই। তাই নীরবতা ভাঙলেন লোথার, “আরো অন্তত সত্তর মাইল গেলে নদী পাওয়া যাবে। আস্তে আস্তে নিজের হাতের নোংরা কাপড়টা খুলতেই দেখা গেল পুরো জায়গাটা ফুলে তরমুজ হয়ে আছে। কনুই পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ঘা। চামড়া ফেটে গড়িয়ে পড়ছে বদ রক্ত আর রস। আর গন্ধের চোটে লোখারের নিজেরই বমি পেল। কনুইয়ের উপর দিকটা তেমন না ফুললেও চামড়ার নিচে পরিষ্কার টকটকে লাল রেখা দেখা যাচ্ছে।
“গ্যাংগ্রিন” নিজেকেই যেন শোনালেন, “হাতটাকে কেটে ফেলতে হবে।” আসলে কার্বলিক এসিড সলুশন দিয়ে ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করেছিলেন। তাতেই আরো বেড়ে গেছে গ্যাংগ্রিন। কিন্তু ম্যানির জন্যে আমাকে টিকে থাকতেই হবে।” তাড়াতাড়ি চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকালেন।
“আমাকে কয়েকটা ব্যান্ডেজ দাও।” গলার স্বর যথাসম্ভব শান্ত আর দৃঢ় রাখতে চাইলেও কেমন যেন ফ্যাসফ্যাসে শোনাল।
ও আমাদের চেয়ে কতটুকু পিছিয়ে আছে হেনি?” ব্যান্ডেজের গিঁট বাঁধতে গিয়ে জানতে চাইলেন লোথার। বাড়তি যেখানে যতটুকু কম্বল আর কাপড়ের টুকরা ছিল সব এখন এ কাজেই লাগছে।
“আমরা সময় বাঁচাতে পেরেছি। অনুমান করলেন হেনড্রিক, “কিন্তু ঘোড়া?”
একটা ঘোড়া পানির কিনারে শুয়ে পড়েছে। তার মানে বেশ শ্রান্ত।
“পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা হবে।” অথচ নদী এখনো সত্তর মাইল দূরে। আর যদি ওরা সীমান্তে গিয়েও পিছু নেয়া বন্ধ না করে?” আর ভাবতে চাইলেন না লোথার। তার বদলে ফিসফিস করে বললেন, “ম্যানফ্রেড হিরেগুলো নিয়ে এসো।”
বাবার কাছে ক্যানভাসের হ্যাঁঙারস্যাক নিয়ে এল ম্যানফ্রেড। সাবধানে ব্যাগ খুললেন লোথার।
আটাশটা বাদামি কাগজে মোড়ানো প্যাকেটগুলোকে মোট চার ভাগে ভাগ করলেন।
“সবার সমান। আমরা যেহেতু মূল্য জানি না তাই সবচেয়ে ছোটজনকে আগে বেছে নেবার সুযোগ দেব। ঠিক আছে?” হেনড্রিকের দিকে তাকালেন লোথার।
সোয়াট হেনড্রিক বুঝতে পারলেন সবাই মিলে আর নদীতীরে এগোনো হবে না। লোখারের মুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে ভাবলেন কিসের টানে এই লোকটার সাথে এতদিন ধরে আছেন। একসাথে তারা অনেক কিছু সয়েছেন, দেখেছেন। ভালোবাসা না বন্ধুত্ব! বুঝতে না পারলেও আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় তেতো হয়ে উঠল মন।
“ঠিক আছে।” লোথার আর ম্যানি দু’জনেই তাঁর কাছে সমান।
“বেছে নাও ম্যানি।” আদেশ দিলেন হেনড্রিক।
“আমি জানি না।” হাত দুটো পেছনে নিয়ে অপারগতা দেখাল ম্যানি। “তাড়াতাড়ি যাও।” সাপের মত ফণা তুললেন লোথার। এগিয়ে এসে সবচেয়ে কাছের ভাগটা দেখাল ম্যানি।
“তুলে নাও।” এবারে কৃষ্ণাঙ্গ ক্লেইন বয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বেছে নাও।”
আর মাত্র দুটো ভাগ বাকি। তা দেখে ফাটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসলেন লোথার,” তো তোমার বয়স কত হেনি?”
“ধরো বসন্তের প্রথম ফুলটার মত।” ওভাষোর কথা শুনে দুজনেই হেসে ফেললেন।
লোথারের হাসি দেখে হেনড্রিকের বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল; বললেন, “তুমি নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ছোট। সবসময় তো নার্সের মত তাই তোমার সেবা করলাম।”
নিজের প্যাকেটগুলোও ম্যানফ্রডকে দিয়ে লোথার জানালেন, “এগুলো হ্যাঁঙারস্যাকে ভরে রাখো। তারপর পানির বোতল ভরে নাও। আর মাত্র সত্তর মাইল গেলেই নদী।”
সবকিছু প্রস্তুত করে নিয়ে লোথারকে তুলতে গেলেন হেনড্রিক। কিন্তু বিরক্ত হয়ে তার হাত সরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর অ্যাকেশিয়ার গুঁড়ি ধরে উঠে দাঁড়ালেন।
আর সোজা হতে না পারায় একটা ঘোড়াকে পানির কিনারেই ফেলে আসতে হল। এক মাইল পেরোবার পর আরেকটা পড়ে গেল। তবে বাকি দুটো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঠিকই এগোচ্ছে। খানিক বাদে তাও না পারায় একটার ওপর পানির বোতল তুলে দিয়ে আরেকটার ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে লাগলেন লোথার।
একমনে উত্তরে এগিয়ে চলেছে চারজনের ছোট্ট দলটা। মাঝে-মাঝে বিনা কারণেই লোথার চড়া গলায় গান গেয়ে ওঠেন। দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলে ম্যানফ্রেড। কিন্তু পরক্ষণেই ভাঙা গলায় এমন গালি দেন যে ছুটে এসে বাবার কোমর জড়িয়ে ধরতে হয়।
“ইউ আর আ গুড বয় ম্যানি। এখন থেকে তোমার আর কোনো কষ্ট থাকবে না। স্কুলে যাবে, পুরোদস্তুর ভদ্রলোক হয়ে উঠবে, আমরা একসাথে বার্লিন যাবো, অপেরা”।
“ওহ পাপা, কথা বলো না তো।” ছেলের গায়ে ভর দিয়ে এগিয়ে চলেন লোথার। নয়ত কখন মুখ থুবড়ে পড়ে যেতেন এই কালাহারির উষ্ণ বালির ভেতরে।
বহুদূরে সূর্যের আলোয় রূপার মত চকচক করছে গ্রানাইট পাথর।
***
৪. ঘোড়া থামালেন সেনটেইন
চূড়ায় পৌঁছে ঘোড়া থামালেন সেনটেইন। কিন্তু পানির গন্ধ পাবার সাথে সাথে উন্মাদ হয়ে উঠেছে ঘোড়া। মরুভূমির এমন অনেক অভিযাত্রীর কথা শুনেছেন যারা নিজেদের পশুদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পানির তৃষ্ণায় মারা যায়। কারণ অবলা জীবগুলো ছুটে গিয়ে কাদা-মাটি বানিয়ে ফেলে গোটা পুকুর। তবে সার্জেন্ট আর কর্নেল এ কাজে বেশ অভিজ্ঞ। তারা পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামলে নিলেন।
