“থামো!” মরিয়া হয়ে হাত নেড়ে সার্জেন্টকে থামাতে চাইলেন কর্নেল। কিন্তু তাও কাজ হল না। পুরো দলের ঘোড়াগুলো যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে।
তাড়াতাড়ি নেমে নিজের ঘোড়ার সামনের পা দুটো চেক করে দেখলেন সেনটেইন। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পেছনের পা দুটো তুলতেই বিস্ময়ে অবিশ্বাসে হাঁ হয়ে গেল চেহারা। মরচেপড়া লোথার চোরকাঁটা লেগে কেটে গেছে খুড়। গাঢ় রক্তে কাদা মাটির পেস্ট হয়ে গেছে মরুভূমির বালি।
আস্তে করে ঘোড়ার পা তুলে চোরকাটা তুলে ফেলতে চাইলেন সেনটেইন। কিন্তু বেশ ভেতরে ঢুকে গেছে লোথার কাঁটা। ব্যথায় কাঁপছে ঘোড়া। বহু কষ্টে মোচড় দিয়ে দিয়ে সবশেষে সফল হলেও রক্তপাত বেড়ে গেছে বেচারা ঘোড়ার। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন ব্লেইনও দুটো চোরাকাটা বের করেছে।
“হর্স আয়রন, যুদ্ধের পর থেকে এ ভয়ংকর জিনিসগুলো আর দেখিনি।” জানালেন ব্লেইন। তিন ইঞ্চি তীক্ষ্ণ এই চার মাথা তারার আকৃতির লোথার চোরকাটা মানুষ কিংবা পশু অথবা টায়ার সবকিছুকেই অথর্ব করে দিতে ওস্তাদ।
চারপাশে তাকিয়ে এরকম অসংখ্য চোরকাটা দেখতে পেলেন সেনটেইন। উপরে ধুলার পরত থাকায় চট করে চোখে না পড়লেও কার্যক্ষমতা ঠিকই আছে।
হ্যানসমেয়ার আর তার সৈন্যদের ঘোড়াগুলো পেছনে থাকায় চোরকাটার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। এবারে নিজ নিজ ঘোড়া দূরে রেখে সাবধানে এগিয়ে এলেন কর্নেলের দিকে। ব্লেইন আর সেনটেইনের বাড়তি ঘোড়াসহ মোট ছয়টা ঘোড়া প্রচণ্ডভাবে জখম হয়েছে।
সব দেখে রাগে কাঁপতে কাঁপতে আদেশ দিলেন কর্নেল, “সার্জেন্ট, আমাদের জিনের সবকিছু তোমার দুইটা ঘোড়ায় তুলে দাও আর সৈন্য পাঠিয়ে হর্স আয়রন কতটুকু পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে খুঁজে দেখো। এক মিনিটও নষ্ট করা যাবে না।”
সাবধানে পা ফেলে আস্তে আস্তে কেসটার দিকে এগিয়ে গেলেন সেনটেইন। হাতে নিতেই দেখা গেল ভেতরে ফাঁকা কিছু নেই। শূন্য চোখে তাই পেছনে তাকালেন।
দ্রুতহাতে কাজ করছে সার্জেন্টের লোকেরা। নতুন করে কালো একটা ঘোড়া নিয়ে সেনটেইনের দিকে এগিয়ে আসছেন সার্জেন্ট। পেছনে সৈন্যরাও এক সারিতে এগোচ্ছে। একটু পর পর উপুড় হয়ে দেখে নিচ্ছে পথে কোনো কাঁটা আছে কিনা। যাই হোক, সেনটেইন ভালোভাবেই জানেন যে এখানেই শেষ নয়। লোথার নিশ্চয় আরো ব্যবস্থা করে রেখেছে।
কোমরের কাছে লি এনফিল্ড রাইফেল নিয়ে ছয়টা অথর্ব ঘোড়ার দিকে তাকালেন ব্লেইন। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে প্রার্থনা করছেন এমনভাবে মাথাটা নিচু করে ফেললেন।
তারপর ধীরে ধীরে রাইফেলের হাতল কাঁধে তুলে একের পর এক গুলি ছুঁড়তেই ঝাঁকি দিয়ে পড়ে গেল সবকটা ঘোড়া।
ফুঁপিয়ে উঠলেন সেনটেইন। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কান্নার ফোঁটা। খানিক বাদে নিজের ঘোড়া নিয়ে তার পাশে চলে এলেন ব্লেইন। সেনটেইনের চোখের জল দেখেও কিছু বললেন না। কেবল সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আদেশ দিলেন, “আমরা প্রায় এক ঘণ্টা পিছিয়ে পড়েছি। টুপ ফরোয়ার্ড।”
এরপর রাত নামার আগে আরো দু’বার এমন ভাবে থেমে যেতে হল। চোরকাটা পেরিয়ে সাবধানে এগোতে গিয়ে নষ্ট হল মূল্যবান কিছু সময়।
***
বুশম্যানল্যান্ড ছাড়িয়ে কাভাঙ্গো অঞ্চলে পা রাখতেই নাটকীয়ভাবে বদলে গেল চারপাশের দৃশ্য।
প্রাচীন বালিয়াড়ির গা ঘেঁষেই জন্মেছে লম্বা সব গাছ। উইলো সোপানি আর আলবিজিয়ার ঝাড়ও আছে। মরুভূমির ঘাসে ঢেকে আছে অগভীর উপত্যকাসমূহ। এখানকার মাটি খুঁড়লেই পানির দেখা মেলে। প্রকৃতিও তাই অকৃপণ হাতে সাজিয়েছে চারপাশ। কালক্লান্ড ছাড়ার পর এই প্রথমবারের মত চোখে পড়ল জেব্রা আর লাল সোনালি ইম্পালা হরিণ।
লোধার ডি লা রে এতটাই অসুস্থ যে তার একপাশে হেনড্রিক আর আরেক পাশে চলছে ক্লেইন বয়। জ্বরের ঘোরে হঠাৎ হঠাৎই হেসে উঠছেন লোথার। কখনো আবার এত নড়ছেন যে না ধরলে মাটিতেই পড়ে যাবেন। পেছন পেছন আসছে ম্যানফ্রেড।
ঘোড়ার পা-দানির ওপর দাঁড়িয়ে চোখ পিটপিট করে সামনে তাকালেন হেনড্রিক। যা দেখলেন তাতে তো খুশি আর ধরে না। লম্বা সব সোপান আর চারটা বিশাল ছাতার মত অ্যাকেশিয়া গাছ। ঠিক যেমনটা তাঁর স্মৃতিতে আছে। আর এগুলোর মাঝখানে জ্বলজ্বল করছে টলটল পানি।
শেষ কয়েক কদম কোনোমতে দৌড়ে গেল ঘোড়ার পাল। সোজা পুকুর বরাবর ছুটে গেলেন হেনড্রিক আর ক্লেইন বয়। তারপর শুরু হল পাগলামি। পানিতে হেসে-খেলে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করতে লাগলেন দুজনে।
বাবাকে নামতে সাহায্য করল ম্যানফ্রেড। তারপর টুপি ভরে পানি নিয়ে এল। বসা থেকে ধুপ করে পড়ে গেলেন লোথার। ছেলে পানি নিয়ে আসতেই তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে শুরু করলেন কাশি।
একটু পরেই পাশে এসে বসলেন হেনড্রিক। সারা গা ভেজা। তখনো হাসছেন। কিন্তু কী মনে হতেই যেন আচমকা থেমে গেলেন। চারপাশে তাকিয়ে আপন মনেই বলে উঠলেন,
“এখানে কেউ নেই কেন? বাফেলো আর লেগস কোথায় গেল?” তাড়াহুড়ো করে দৌড় দিলেন কাছাকাছি একটা অ্যাকেশিয়ার ছাতার দিকে।
পুরোপুরি শূন্য আর পরিত্যক্ত। ক্যাম্প ফায়ারের কয়লা চারপাশে ছড়ানো। খুব বেশি হলে একদিন আগের। ত্রস্তপায়ে জঙ্গল ঘুরে আবার লোথারের কাছে এগিয়ে এলেন হেনড্রিক।
“ওরা পালিয়েছে। লোথারও মনে মনে সে রকমটাই ভাবছিলেন, “দশটা ঘোড়া, প্রতিটা পঞ্চাশ পাউন্ড করে, এত লোভ সামলাতে পারেনি।” পানি খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে আবারো খানিকটা তরতাজা হয়ে উঠেছেন লোথার।
