কয়েক সেকেন্ড বাদেই চড়া গলায় সার্জেন্টকে আদেশ দিলেন কর্নেল, “বোতলগুলো ভরে নাও। আর ঘোড়াগুলোকেও পেট ভরে পানি খাওয়াও, নয় ঘন্টা মেকআপ করার জন্যে ছুটতে হবে সামনে।
.
সারারাত ধরে পথ চলল পুরো দল। আকাশের তারা আর চাঁদের রুপালি আলোয় ঘোড়ার খুড়ের চিহ্ন দেখে পথ দেখাল দুই বুশম্যান।
ভোরের ঘণ্টাখানেক বাদে গত রাতে ডাকাতদের ক্যাম্পের ভাঙা অংশের কাছে পৌঁছাল কর্নেলের দল। নিজের অসম্ভব ক্লান্ত দুটো ঘোড়াকে ফেলে গেছেন লোথার। পরিত্যক্ত ক্যাম্প ফায়ারের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে অবলা জীব দুটো। সাথে সাথে অবশ্য বালি সরিয়ে দিয়েই আগুনে ফুঁ দিল কিউয়ি আর ছাই থেকে দপ করে জ্বলে উঠল শিখা। দেখে তো খুশি আর ধরে না।
“ওরা যতক্ষণ ঘুমিয়েছে ততক্ষণে আমরা পাঁচ ছয় ঘণ্টা এগিয়ে এসেছি।” আপন মনে বিড়বিড় করে সেনটেইনের দিকে তাকালেন ব্লেইন।
চেস্টনাট রঙা ঘোটকী দুটো একেবারে শেষ অবস্থায় পৌঁছে গেছে। মাথা ঝুলছে। কালো জিভও বেশ ফুলে উঠেছে। তাই দেখে কর্নেল জানালেন, “ওদেরকে পানি খাইয়ে অপচয় করেনি শয়তানটা।”
“হুম, তুমি ওদেরকে খতম করে দাও।”
“এ কারণেই তো লোথার ওদেরকে ফেলে গেছে।”
“মানে?”
“গুলি।” ব্যাখ্যা করে শোনালেন ব্লেইন, “নিজে গুলি করলে তো শব্দ হত”
“ওহ ব্লেইন! তাহলে আমরা কী করব?”
“কফি আর নাশতা বানান। আবার রওনা হবার আগে আমাদের সবারই কয়েক ঘন্টা বিশ্রাম দরকার।” জিন থেকে নেমে নিজের কম্বলের রোল খুললেন কর্নেল, “ততক্ষণে আমি দেখি কী করা যায়।”
প্রথম ঘোটকীটার কাছে গিয়ে ডান হাতে পিস্তল ধরে ভেড়ার লোমের ব্লাঙ্কেটে জড়িয়ে নিলেন ব্লেইন।
সাথে সাথে পড়ে গেল ঘোড়াটা। খানিক তাকিয়েই নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সেনটেইন। দ্বিতীয় ঘোটকীর দিকে এগিয়ে গেলেন ব্লেইন।
***
পাখি ডানা ঝাঁপটানোর মত করে দুলে উঠল বাতাস। পুরোপুরি কোনো শব্দ না হলেও সোয়াত হেনড্রিক আর লোথার ডি লা রে দু’জনেই নিজ নিজ ঘোড়ার ওপর সচকিত হয়ে বললেন। দম বন্ধ করে কী যেন ঘটার অপেক্ষায় রইলেন দুজনেই।
আবারো শোনা গেল দূরাগত এক বন্দুকের আওয়াজ। পরস্পরের দিকে তাকালেন হেনড্রিক আর লোথার।
“আর্সেনিকের কৌশলটা আসলে কাজে লাগেনি।” যা বোঝার বুঝে গেল বড়সড় কৃষ্ণাঙ্গ ওভাষো।
“তোমার উচিত ছিল পানিতে সত্যিকারের বিষ মিশিয়ে দেয়া।”
দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন লোথার।
“ডাইনির মত ঘোড়া ছোটাচ্ছে। আমাদের মাত্র চার ঘণ্টা দূরত্বে আছে। এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে তাই বা কে জানত।”
“এতটা নিশ্চিত হয়ো না।”
একটু দ্বিধা না করে লোথার জানালেন, “ও আমার কাছে প্রমিজ করেছে যে আসবেই।”
লোথারের হাতে কনুই পর্যন্ত ব্যান্ডেজে হলুদ পুঁজের দাগ। কার্টিজের বেল্ট জড়িয়ে গলার সাথে ঝুলিয়ে রেখেছেন আহত হাত। মুখে বহুরঙা না কামানো দাড়ি।
মাথা ঘুরিয়ে পেছনের সমভূমির দিকে তাকাতে গিয়ে আরেকটু হলে পড়েই যেতেন। তাড়াতাড়ি জিনের সাথে আটকানো কালো কেস ধরে নিজেকে সামলালেন।
“পা!” বাবার সুস্থ হাত ধরে টান দিল ম্যানফ্রেড; চোখে উদ্বেগ, “তুমি ঠিক আছে তো?”
উত্তর দেবার আগে চোখ বন্ধ করে ফেললেন লোথার; ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন যে হাতের মাংস পর্যন্ত ফুলে ছড়িয়ে পড়েছে ইনফেকশন। রক্তে মিশে গেছে বিষ। চামড়া এতটাই ফুলে গেছে যে পাকা তালের মত টসটস করছে। চোখ আর মাথার তালু পর্যন্ত জ্বলছে ব্যথায়।
“চলো” ফিসফিস করে ছেলেকে জানালেন, “দেরি করলে চলবে না।”
লোথারের ঘোড়ার লাগাম টেনে নিলেন হেনড্রিক।
“দাঁড়াও!” হঠাৎ করেই জানতে চাইলেন লোথার “পরবর্তী পানির পুকুরটা কত দূরে?”
“আগামীকাল দুপুরের আগেই পৌঁছে যাব।”
জ্বরের তাপে মাথাও যেন ঠিকমত কাজ করছে না, তবুও হেনড্রিককে বললেন ঘোড়ার আয়রনের কথা।
মাথা নাড়লেন হেনড্রিক। সামনের ঘোড়াগুলো সত্তর পাউন্ড বোঝা বহন করছে। এখন সময় হয়েছে এগুলো ফেলে দেবার।
“দেখা যাক সে টোপ গিলে কিনা।” ভাঙা ভাঙা গলায় বলে উঠলেন লোথার।
***
ক্রমেই সেনটেইন নিজেও বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু সেটা কাউকে টের পেতে দিতে চান না।
চোখের কোনা দিয়ে ব্লেইনের দিকে তাকালেন। এমনভাবে সোজা, ঋজু দেহে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে যে মনে হচ্ছে একটুও অবসন্ন হননি। কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই সেনটেইনের অবস্থা বুঝে ফেললেন কর্নেল। নরম স্বরে জানালেন, “দশ মিনিটের পানি বিরতি নেয়া যাক।”
“আমি ঠিক আছি তো।” তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন সেনটেইন।
“আমরা সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এটা স্বীকার করতে কোনো লজ্জা নেই আসলে।” তারপর চোখের ওপর হাত দিয়ে সামনে কী যেন দেখলেন।
“কী হয়েছে?”
“বুঝতে পারছি না।” বুকের কাছের দূরবিন তুলে ফোকাস করলেন ব্লেইন। তারপর সেনটেইনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন গ্লাস। “ব্লেইন?” আচমকা চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন। “হিরে! এটাই তো হিরের কেস! ওরা হিরে ফেলে গেছে।”
মুহূর্তেই সব ক্লান্তি অবসাদ উঠে গেল। ব্লেইন বাধা দেবার আগে ঘোড়ার পিঠে গুঁতো দিয়ে টগবগিয়ে সামনে এগোলেন সেনটেইন।
চিৎকার করতে করতে পিছু নিলেন ব্লেইন। তাড়াতাড়ি সার্জেন্টও এগোল বাধ্য হয়ে।
হঠাৎ করেই তীব্র হ্রেষাধ্বনি দিয়ে আতঙ্কে লাফাতে লাগল সেনটেইনের ঘোড়া। বাড়তি ঘোড়াগুলোও এরকমই রকম পাগলের মত করছে। ব্লেইন তাই দেখে ঘুরতে গিয়েও দেরি করে ফেললেন।
