কিন্তু সেনটেইন স্থির থাকার পাত্রী নন। ঘোড়া নিয়ে আবার পুলের কাছে। ফিরে এলেন,
“এভাবে কী করে করতে পারলে লোথার? এরকম ভয়ংকর একটা কাজ?”
কী মনে হতেই ঘোড়া থেকে নেমে উপুড় হয়ে কিনারে বসে আঙুল দিয়ে পানি স্পর্শ করলেন। ঠাণ্ডা, পুরোপুরি মৃত্যুর মতই ঠাণ্ডা সে পানি।
মনে পড়ে গেল ব্লেইনের মন্তব্য। একই সাথে স্মৃতির গহীন থেকে উঁকি দিল লোথারের প্রায়শ্চিত্তের কথা। তাকে একবার লোথার বলেছিলেন।
“আমরা আসলে বাধ্য হয়ে কাজটা করেছিলাম। ইউনিয়ন ফোর্স এত পিছু নিয়েছিল যে না করে উপায় ছিল না, কিন্তু পরিণামটা যদি জানতাম।”
তখন লোথারকে সত্যিই ভালোবাসতেন সেনটেইন। উঠে গিয়ে তাই ওর হাত ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। কিন্তু লোথার বলেছিলেন, “এ ধরনের মূর্খামি আমি আর করিনি। এক মাস পরে খুনীর মত আবার ফিরে গিয়েছিলাম সেখানে। জেব্রা, ডোমসবক, পাখি, শিয়াল এমনকি শকুন পর্যন্ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ লজ্জা আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না।
ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসলেন সেনটেইন। উত্তেজনার চোটে ভুলে গেলেন ক্রোধ। পানি আবার স্পর্শ করে ঢেউ বানিয়ে দিলেন।
“না, সে সত্যিই লজ্জিত ছিল। একই কাজ আর দুবার করবে না।”
জোরে চিৎকার করেই কাঁপতে লাগলেন সেনটেইন, “এই নোটিশটা আসলে ভুয়া।” কিন্তু মৃত ঘোড়াগুলোর কথা মনে হতেই আবার থেমে গেলেন। “হয়ত বালতিতে ভরে ওগুলোকে খাওয়ানো হয়েছে। পুরো পুকুরে নিশ্চয়ই কিছু মেশায়নি।”
এরপর মাথা থেকে টুপি খুলে উপরকার ময়লা সরিয়ে পানি ভরে নিলেন সেনটেইন। কিন্তু যেই না পানিতে ঠোঁট ছোঁয়াতে যাবেন পেছন থেকে চিৎকার করে ছুটে এসে ধাক্কা দিয়ে পানি ফেলে সেনটেইনের হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন রেইন। রাগে ধকধক করে জ্বলছে কনেলের চোখ, “পাগল হয়ে গেলেন নাকি?”
এত জোরে সেনটেইনকে ধরেছেন যে হাত কেটে বসে গেল ব্লেইনের নখ।
“ব্লেইন আমি ব্যথা পাচ্ছি।”
“ব্যথা? মন চাইছে আপনাকে চড় লাগাই”।
“আরে ব্লেইন এসব কিছুই ভুয়া। আমি নিশ্চিত, প্লিজ আমার কথা শুনুন।” কর্নেলের এরকম আচরণে সেনটেইনও ভয় পেয়ে গেছেন। তাকে ছেড়ে দিলেন ব্লেইন।
“আমি সত্যি বলছি। সে পানিতে কোনো বিষ মেশায়নি। বাজি ধরে বলছি, সত্যি।”
“কিন্তু কীভাবে বুঝলেন?” ঘোঁত ঘোঁত করলেও আগ্রহ বোধ করলেন ব্লেইন।
ওর সাথে আমার পরিচয় ছিল। তখন ওকে ভালোভাবেই চিনতাম। একবার এরকম করেছে ১৯১৫ সালে। কিন্তু তারপর আর না করার শপথ ও নিয়েছে।”
“তাহলে মৃত ঘোড়াগুলো?”
“হ্যাঁ সেগুলোকে হয়ত বিষ খাইয়েছে। তাছাড়া ওগুলো এমনিতেই ক্লান্ত ছিল। হয়ত সিংহের পেটেই যেত। তাই ও নিজেই শেষ করে দিয়ে গেছে।”
লম্বা লম্বা পা ফেলে পানি কিনারে গিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখলেন ব্লেইন।
“তার মানে আপনি এই সুযোগ– “ থেমে গিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সার্জেন্টকে ডাকলেন কর্নেল,
“সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার।”
“স্যার” এস্তপায়ে দৌড়ে এলেন সার্জেন্ট।
“ক্লান্ত একটা ঘোড়া নিয়ে এসো আমার কাছে।”
সার্জেন্ট কথামত কাজ করতেই আবার আদেশ দিলেন, “ওকে পানি খাওয়াও।”
“স্যার?” অবাক হয়ে গেলেন সার্জেন্ট। এতে বিষ আছে স্যার।”
“আছে কিনা আমরা সেটাই খুঁজে বের করব। পানি খাওয়াও।”
ছেড়ে দিতেই লম্বা গলা ডুবিয়ে পুকুরের পানি খেতে লাগল কালো ঘোটকীটা।
সবার চোখের সামনেই ফুলে ঢোল হয়ে গেল ঘোড়ার পেট।
“আমি কিন্তু ঘোড়া ব্যবহার করার কথা চিন্তাও করিনি। যদি আমার অনুমান মিথ্যা হয়!” ফিসফিসিয়ে বললেন সেনটেইন।
খানিক বাদেই কর্নেল আবার আদেশ দিলেন, “সার্জেন্ট ওকে লাইনে নিয়ে যাও।”
তারপর নিজের হাতঘড়ি চেক করে বললেন, “ঘোড়াটাকে এক ঘণ্টা সময় দিলাম।” এরপর সেনটেইনের হাত ধরে পাথরের ছাদের নিচে ছায়ায় বসিয়ে দিলেন। জানতে চাইলেন, “এত ভালোভাবে ওকে কীভাবে চিনতেন?”
“আমার কর্মচারী ছিল, সেও অনেক বছর আগে। খনির প্রথম দিককার শ্রমিক। ইঞ্জিনিয়ার, জানেন তো।”
“হুম। ফাইলে পড়েছি।” কিছুক্ষণ চুপ করে জানালেন, “তবে নিশ্চয়ই বেশ সুসম্পর্ক ছিল? একজন মানুষের অপরাধ জানা চাট্টিখানি কথা নয়।”
কিছু না বলে চুপ করে রইলেন সেনটেইন।
কিন্তু মিটিমিটি হাসলেন ব্লেইন। “আসলে হিংসা মোটেও সুখকর কিছু নয়। ঠিক আছে। বাদ দিন। আমি আমার প্রশ্নটা তুলে নিচ্ছি।”
ব্লেইনের কাঁধে হাত দিয়ে প্রশ্রয়ের হাসি দিলেন সেনটেইন।
তাকিয়ে দেখলেন মিশন ছাড়ার পর থেকে আর শেত্ করেননি ব্লেইন। নতুন দাড়িতে তাকে চমৎকার দেখাচ্ছে।
কর্নেল সেনটেইনের দিকে তাকাতেই দেখা গেল সবুজ চোখেতে জ্বলছে তাকে পাওয়ার আকুতি।
হঠাৎ করেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন কর্নেল। “ওহ, ঈশ্বর আমাদেরকে ক্ষমা করুন।” বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলেন। একাকী বসে রইলেন সেনটেইন।
অবশেষে ডাকতে এলেন হ্যানসমেয়ার। পুলের কাছে এসে জানালেন, “কর্নেল ম্যালকমস, আপনাকে ডাকছেন মিসেস কোর্টনি।”
যেন স্বপ্নের ঘোরে ফিরে এলেন সেনটেইন। পুরো দুনিয়া থেকে নিজেকে অদ্ভুত রকমের বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে।
ক্লান্ত ঘোটকিটার কাছে দাঁড়িয়ে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ব্লেইন। সেনটেইন কাছে এসে দাঁড়াতেই পরস্পরের দিকে তাকালেন দুজনে।
“আমরা একসাথেই সামনে এগোব।
“ইয়েস ব্লেইন।” আনন্দ ঝরে পড়ল সেনটেইনের কণ্ঠে।
