“আপনি সিরিয়াস?” হা করে তাকিয়ে আছেন ব্লেইন।
“প্রথম দেখলে আমারো বিশ্বাস হত না। ওয়া তত পাঁচ মাইল দূর থেকেই গন্ধ পেত।” চলুন আপনাকে প্রমাণ দেখাই। হেসে ঘোড়া হোটালেন সেনটেইন।
ধুলার কুয়াশার মাঝে স্পষ্ট হয়ে উঠল বেগুনিরঙা ছোট শিলা পাহাড়। নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসল সেনটেইনকে। জায়গাটা তিনিও চিনতে পেরেছেন। শেষবার যখন এখানে এসেছেন তখন পেটে শাসা ছিল।
কিন্তু তার আগেই পাশাপাশি থেমে গিয়ে পায়ের নিচের মাটি পরীক্ষা করতে লাগল দুই বুশম্যান। কিচির-মিচির করে সেনটেইনকে কিছু বলতেই তিনি নিজেও বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।
“ঘোড়ার খুঁরের চিহ্ন পাওয়া গেছে। নির্ঘাত লোথার ডি লা রে। আমার আর কোনো সন্দেহই নেই। দক্ষিণ দিক থেকে তিন ঘোড়সওয়ার এসে ঝরনার দিকে গেছে।”
নিজের স্বস্তি লুকাতে হিমশিম খাচ্ছেন সনটেইন। তার মানে তাঁর অনুমান সঠিক। লোথার আর হিরে আর খুব বেশি দূরে নেই।
কতক্ষণ আগে কিউয়ি?” উদ্বিগ্ন মুখে জানতে চাইলেন কিউয়ির কাছে।
“আজ সকালে নাম চাইল্ড।” আকাশের দিকে তাকিয়ে রি অবস্থান ইশারা করে লোথারদের সময় জানাল কিউয়ি।
“সূর্যোদয়ের ঠিক পরে। অতএব আমরা মাত্র আট ঘণ্টা পিছিয়ে আছি।”
“তার মানে আরো বহুদূর বাকি। প্রতিটা মিনিটকে কাজে লাগাতে হবে। চলুন রওনা দেই।” ব্লেইনও সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন।
ছোট্ট পাহাড়টা থেকে আধমাইল দূরে থাকতেই সেনটেইন আবার জানালেন, “কয়েক সপ্তাহ ধরে এখানে আরো একপাল ঘোড়া থেকে গেছে। সবদিকেই চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ লোথার এখানে নিজের লোকদেরকে প্রস্তুত রেখেছিল।” পাহাড়ের নিচে তিনটি কালো টিবি মতন দেখে চুপ করে গেলেন আবার।
“এগুলো কী?” ব্লেইন নিজেও অবাক হয়ে গেছেন।
“মৃত ঘোড়া। কাছে যেতেই চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন, “ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে মেরে রেখে গেছে লোথার।”
“না। কোনো বুলেটের গর্ত তো দেখছি না।” ঘোড়া থেকে নেমে পরীক্ষা করে দেখলেন ব্লেইন।
চারপাশে তাকিয়ে কিউয়িকে কাছে ডাকলেন সেনটেইন “এবার ঘোড়ার দাগ কোথায় গেছে দেখো।” তারপর নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা সামনের ঝরনার দিকে এগোলেন।
ছোট্ট পাহাড়টার নিচেই পাওয়া গেল ঝরনা। পনের ফুট তলায় চকচক করছে পানি। পাহাড়ের পাশেই এক স্তর নরম শিলা এমনভাবে বারান্দার মত ঝুলে আছে যে পানির ওপর সরাসরি সূর্যের তাপ পড়তে পারে না। বাথটাবের মত ছোট্ট এই পুলটাতে সেনটেইনের জানামতে লবণ আর বিভিন্ন খনিজ পদার্থ আর একই সঙ্গে পশু-পাখির মল মূত্রও মিশে আছে।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুলটাতে মনোযোগ দিলেও কিনার ঘেঁষে মানুষের হাতে তৈরি ছোট্ট কাঠামোটা দেখে আঁতকে উঠে মুখে হাতচাপা দিলেন সেনটেইন।
মোটা একটা কাঁটাগাছ তুলে সাইনপোস্ট হিসেবে মাটিতে পুঁতে পাথরের পিরামিড বানিয়ে সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। একেবারে উপরে খালি একটা হাফ গ্যালনকে হেলমেটের মত পরিয়ে রাখা হয়েছে। এর উপরে কালো কালিতে লেখা এই কুয়া বিষাক্ত আর্সেনিক।
সেনটেইনের পাশে চলে এলেন ব্লেইন। নিঃশব্দে সাইনটা পড়ে জানালেন, ঘোড়াগুলো তাহলে এ কারণেই মারা গেছে।” রাগে কেঁপে উঠল কর্নেলের গলা। ঘোড়ার নাক ঘুরিয়ে নিজের সৈন্যদের কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, “সার্জেন্ট, বাকি পানির অবস্থা কী? এই কুয়াটা বিষাক্ত। এটার পানি খাওয়া যাবে না।” নরম সুরে শিস দিয়ে উঠলেন হ্যানসমেয়ার,
“তাহলে তো ভালোই হল। আবার কালক্রান্ডে ফিরে যেতে হবে।”
রাগ আর হতাশায় সেনটেইন নিজেও কাঁপছেন। “এত সহজে পার পেয়ে, গেল শয়তানটা।”
পানির গন্ধ পেয়ে ছাড়া পাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে তার ঘোড়া। তাই বহু কষ্টে থামাতে হচ্ছে অবোধ জীবটাকে।
আবারো এগিয়ে এলেন ব্লেইন, “আয়্যাম সরি সেনটেইন। আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। পানি ছাড়া এগোনো আত্মহত্যারই শামিল।” আস্তে করে জানালেন কর্নেল।
“আমি জানি।”
“নোংরা একটা চাল চেলেছে ব্যাটা। মরুভূমির মাঝে এরকম বিষাক্ত পানির পরিণাম ভয়াবহ হয়। আগেও একবার এর নজির দেখেছি। ১৯১৫ সালে যখন ওয়ালবিসে ছিলাম-ছোট কিউয়ি কিচির-মিচির করে এগোতেই থেমে গেলেন কর্নেল। জানতে চাইলেন, “ও কী বলছে?”
“ওদের মধ্যে একজন নাকি অসুস্থ। কিউয়ি এই ব্যান্ডেজগুলো পেয়েছে।” তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়েই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে কিউয়িকে আদেশ দিলেন সেনটেইন, “জলদি হাত থেকে ফেলো কিউয়ি।” পুঁজের বদগন্ধ পাচ্ছেন। নিজের বেয়নেটের হাতল দিয়ে বালির উপর ফেলে কাপড়গুলোকে পরীক্ষা করে দেখলেন ব্লেইন।
“মুখোশ!” লোথারের ময়দার বস্তার ফালি আর খাকি শার্টের ভেঁড়া অংশ চিনতে পারলেন সেনটেইন।
“অন্যরা যখন ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত তখন অসুস্থ লোকটা মাটিতে শুয়ে ছিল। তারপর সবাই মিলে তাকে ঘোড়ায় উঠিয়েছে।” ঘোড়ার খুড়ের চিহ্ন দেখে গড়গড় করে বলে দিল কিউয়ি।
“ধস্তাধস্তির সময় আমি ওর হাতে কামড় দিয়েছিলাম, হাড় পর্যন্ত আমার দাঁত লাগায় আঘাতটা বেশ গম্ভীর হয়েছে।” নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন।
“মানুষের কামড় সাপের কামড়ের মতই মারাত্মক।” মাথা নাড়লেন ব্লেইন, “আর সাথে সাথে চিকিৎসা না হলে ব্লাড পয়জনিং হয়ে যাবে। লোথার ডি লা রে গুরুতরভাবে অসুস্থ। সাথে যদি পানি থাকত তাহলে ওকাভাঙ্গোর নদীর কাছে পৌঁছাবার আগেই তাকে ধরতে পারতাম।” সেনটেইনের গোমড়া মুখ দেখার ভয়ে তাড়াতাড়ি ঘোড়া ঘুরিয়ে সার্জেন্টের দিকে চলে গেলেন কর্নেল, “রাতের বেলা আবার আমরা রওনা দেব। ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই হাফ অংশ করে পানি পাবে।”
