বুঝতে পেরে মাথা নাড়লেন ম্যালকমস, “তাহলে আমাদের দুজনকেই যেতে হবে। এরপর হঠাৎ করেই স্কুল পড়ুয়া দুষ্টু ছেলের মত হাসি দিয়ে বললেন, “আমি ছাড়া আপনার আর কোন গতি নেই।”
একমুহূর্তের জন্য লোথার, হিরে, ম্যালকমসের স্ত্রী- সবার কথা ভুলে গেলেন সেনটেইন। কেবল মনে হল এই সুযোগ। তারা দুজন একাকী সময় পাচ্ছেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে জানতে চাইলেন,
“আমরা কখন রওনা দিচ্ছি?”
তাড়াতাড়ি পিছু ফিরে হাঁক দিলেন ম্যালকমস, “সবাই যার যার ঘোড়ায় চড়ে বসো। আমরা এক্ষুণি রওনা দিচ্ছি।”
আর সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “আপনার মনোভাবটা এবার খুলে বলুন। আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
হেসে ফেললেন সেনটেইন, “আপনার কাছে কোন ম্যাপ আছে?”
“এদিকে আসুন।” সেনটেইনকে মিশন অফিসে নিয়ে দু’জন ডমিনিকান ফাদারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন ম্যালকমস। তারপর ডেস্কের ওপর বিছিয়ে বসলেন নিজের লার্জ স্কেল ম্যাপ।
“এখানে ডাকাতি হয়েছে” আঙুল দিয়ে মানচিত্রে লোথারের ক্যাম্প দেখালেন সেনটেইন “তারপর ওরা এই দিকে গেছে। পর্তুগিজের উদ্দেশে। কিন্তু তাহলে তো তিনশ’ মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে।”
“তাহলে আপনি পূর্বদিকে এগিয়ে পথিমধ্যে ওদেরকে আটকাতে চান। এটা তো খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার মত হয়ে যাবে।”
“পানি। নিশ্চয়ই বাড়তি ঘোড়াগুলোকে পানির কাছে ছেড়ে যাবে, আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।”
“কিন্তু এরকম কোনো জায়গা তো দেখছি না?”
“মানচিত্রে না থাকলেও সে ঠিকই জানে কোথায় পাওয়া যাবে। আমার বুশম্যান দু’জনও বলতে পারবে।”
মানচিত্র ভাঁজ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন ব্লেইন। “আপনার সত্যি মনে হচ্ছে এরকমটা সম্ভব?”
“আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে সে এই মরুভূমিতেই সারা জীবন চড়ে বেরিয়েছে। তাই ওকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।”
“লোকটার রেকর্ড চেক করে দেখেছি আমি।” ম্যাপটাকে লেদার কেসে ভরে মাথায় খাকি রঙের শোলার হেলমেট পরে নিলেন ব্লেইন। উচ্চতা যেন আরো বেড়ে গেল তাতে। “বিপজ্জনক লোকটার মাথার দাম একবার দশ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত উঠিয়েছিল পুলিশ।”
দরজায় দেখা দিলেন এক সার্জেন্ট, “সব প্রস্তুত কর্নেল।”
“মিসেস কোর্টনির ঘোড়ায় লাগাম পরানো হয়েছে?”
“ইয়েস স্যার।” বাদামিরঙা পেশিবহুল লোকটাকে দেখে সেনটেইনও খুশি হলেন।
“উনি সার্জেন্ট হ্যানসমেয়ার” সেনটেইনকে স্যালুট করলেন সার্জেন্ট।
তারপর দ্রুত ফাদারদের সাথে করদর্শন করে বাইরে চলে এল সবাই।
জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন, “আপনার সাথে যেতে পারলে খুশিই হতাম মিসেস কোর্টনি। কিন্তু আজ থেকে বিশ বছর আগে হলে এটা কোনো ব্যাপারই ছিল না।”
সদয় ভঙ্গিতে হাসলেন সেনটেইন, “আমাদের জন্য শুভ কামনা করবেন সেটাই যথেষ্ট।”
নিজের ঘোড়ায় চেপে ব্লেইনের পাশে চলে এলেন সেনটেইন। তারপর বুশম্যান ভাইদেরকে ডেকে বললেন, “আমাদেরকে পানির কাছে নিয়ে চলো কিউয়ি।”
জন্মসূত্রে দৌড়াতে ওস্তাদ বুশম্যান ভাইদের পিছু নেয়ার জন্য দৌড়াতে লাগল সেনটেইনদের ঘোড়ার পাল।
পরস্পরের পাশাপাশি নীরবে ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছেন সেনটেইন আর ব্লেইন। পেছনে সার্জেন্ট আর চার সেনা সদস্য। চোখের কোনা দিয়ে অবশ্য ম্যালকমসকে ঠিকই খেয়াল রেখেছেন সেনটেইন। বুঝতে পেরেছেন কেন পোলো প্লেয়ার হিসেবে এত বিখ্যাত কর্নেল সাহেব!
নরম পাথুরে স্তর পার হয়ে প্রথমবারের মত কথা বল “আপনার কথাই ঠিক। এ পথে ট্রাক নিয়ে আসা যেত না।”
সামনে বুশম্যান ভ্রাতৃদ্বয় একবারও না থেমে সোজা দৌড়ে চলেছে। নিশ্চিতভাবে চেনে তাদের গন্তব্য। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় অবশ্য যাত্রা থামিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে নিজের লোকদের খবর নিচ্ছেন ব্লেইন। পাঁচ মিনিট বিরতি দিয়ে আবার শুরু হচ্ছে যাত্রা।
পুরোপুরি অন্ধকার নামার পর সবাইকে আমার নির্দেশ দিলেন কর্নেল। পানি আর ঘোড়াগুলোর তদারক করে তারপর এলেন অগ্নিকুণ্ডের কাছে। এখানেই বসে আছেন সেনটেইন। বুশম্যানদের খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজের আর ক্লেইনের জন্য খাবার বানিয়েছেন।
“ম্যান থেকে ক্যাঙিয়ার বাদ দিতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত স্যার। বিফ স্টু দিয়েই কাজ সারতে হবে।”
পেট ভরে তাই খেলেন কর্নেল। তারপর আগুনের লাকড়ি থেকে চুরুটও ধরালেন। মুগ্ধ কণ্ঠে সেনটেইনকে জানালেন “এভাবে খেতে পারাটা আসলেই উপাদেয়।”
ঘোড়ার জিনের কাপড় এনে বসলেন ব্লেইন। সকালের জন্য প্যাকিং শেষ করে এলেন সেনটেইন। তারপর খানিক দ্বিধা করলেও অবশেষে এসে কর্নেলের পাশেই বসে পড়লেন। দুজনের মাঝে মাত্র ইঞ্চিখানেকের ফাঁক।
***
পরদিন সকালবেলা। ভোরের আলো ফোঁটারও বহু আগেই বেরিয়ে পড়েছে পুরো দল। পথ দেখাচ্ছে বুশম্যান দুই ভাই। একটু পরেই সূর্য উপরে উঠে পড়ায় গরমে টেকা দায় হয়ে পড়ল। এমনকি ঘোড়ার পিঠে ঘাম শুকিয়ে সাদা লবণের ক্রিস্টাল জমে গেল।
হঠাৎ করেই থেমে গেল কিউয়ি। বোচা নাক টেনে বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুকলো, মোটা কিউয়িও একই রকম করছে।
“ওরা কী করছে?” পেছন থেকে জানতে চাইলেন ব্লেইন। কিন্তু সেনটেইন উত্তর দেবারও ফুরসৎ পেলেন না। বাঁশির মত সুর তুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে কিউয়ি।
“পানি।” ঘোড়ার পিঠে সিধে হয়ে বসলেন সেনটেইন, “ওরা পানির গন্ধ পেয়েছে।”
