একবারও পেছনে তাকালেন না লোথার। কেবল মাথা নাড়লেন।
লোখারের শরীর চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যেতেই বালির ওপর ধপ করে বসে পড়লেন সেনটেইন। টের পেলেন যে তাঁর কাঁপুনি কিছুতেই থামছে না। কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ঠোঁট আর চিবুক থেকে মুছে গেল শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
তবে মুখে নোনা স্বাদ পেতেই অনুভব করলেন ফিরে এল মনোভাব আর দেহের শক্তি। বহু কষ্টে উঠে ডেইমলারের কাছে গেলেন। কাকতালীয়ভাবে হলেও পানি এখনো জায়গামতই আছে। তাই মুছে ফেলতে পারলেন রক্ত আর চোখের জল।
তারপর উল্টানো ডেইমলারের বুটের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে বালি সরিয়ে খুলে ফেললেন ডালা। দুটো বিশ গ্যালন পানির ক্যান আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিরের বোতল নিয়ে কিনারের দিকে বালুর মাঝে গর্ত করে লুকিয়ে ফেললেন যাতে পানি ঠাণ্ডা রাখা যায়। তারপর আবার ডেইমলারের কাছে এসে অধৈর্যভাবে খুঁজতে লাগলেন বাকি সারভাইভাল প্যাক। হঠাৎ করেই মনে হল হায় হায় টেলিগ্রাফ ট্যাপ বুঝি ফেলে এসেছেন। কিন্তু না টুল বাক্সে ঠিক পাওয়া গেল।
তারের বোঝা আর ট্যাপ ভর্তি হ্যাঁঙারসাক নিয়ে লোথারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পিছু নিলেন সেনটেইন। খানিক বাদেই লোথারের ঘোড়ার খুঁড়ের চিহ্নও পেয়ে গেলেন। দাগ দেখে এগোতেই দুইশ গজ দূরের টেলিগ্রাফ তার ছেঁড়ার জায়গাটা নজরে পড়ল। লাইন যেখানে নদী পার হয়ে গেছে সেখানে পৌঁছাতেই অনেক নিচে লোথারদের ক্যাম্পের অবশিষ্টাংশ চোখে পড়ল। তাড়াহুড়া করে বালি ছিটিয়ে আগুন নেভানো হলেও লাকড়ি এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে।
তারের বান্ডিল আর হ্যাঙারসাক রেখে কিনার বেয়ে নিচে নেমে এলেন সেনটেইন। ডাগআউটে পৌঁছেই তিনটা ম্যাট্রেস দেখে বুঝতে পারলেন তারা বেশ কয়েকদিন যাবৎ এখানে থেকেছেন।
এখনো ম্যানফ্রেডকে নিজের ছেলে বলে ভাবতে পারেন না সেনটেইন। ধারণা করলেন সে ছাড়াও সোয়ার্টও সাথে ছিল।
ডাগআউট থেকে বেরিয়েও খানিক দাঁড়িয়ে রইলেন। বুঝতে পারছেন না কী করবেন। যাই হোক পূর্বদিকে কালাহারি। লোথাররা নিশ্চয় সেদিকে যাবেন না।
“তার মানে উইন্ডহকে ফিরবে।” অনুমান করেই পরবর্তী কর্তব্য ঠিক করে ফেললেন। এক্ষেত্রে কাজে লেগে গেল তার বুশম্যান ট্রেনিং।
“ওরা তাহলে দক্ষিণে গেছে।” এবার ক্যাম্পের দক্ষিণাংশ ঘুরে এসেও গতকালকের খুড়ের দাগ ছাড়া নতুন কোনো চিহ্ন না পেয়ে অবাক হয়ে গেলেন।
“তাহলে কি উত্তরে? এদিকে তো ওকাভাঙ্গো নদী আর পর্তুগীজদের অঞ্চল।” যাই হোক কী মনে করে উত্তরে খুঁজতেই সাথে সাথে পেয়ে গেলেন তরতাজা খুড়ের দাগ।
“তিনজন ঘোড়সওয়ার সবার সাথে একটা করে বাড়তি ঘোড়া। এক ঘণ্টাও হয়নি রওনা দিয়েছে। লোথার হয় পাগল নয়ত মাথায় অন্য কোনো প্ল্যান আছে।” মাইলখানেক দাগগুলোকে অনুসরণ করে এগিয়েই বুঝতে পারলেন তার ধারণা কতটা সত্যি।
“লোকটা বদ্ধ পাগল। অ্যাংগোলা সীমানার দিকে গেছে। এখানেই তার পুরনো আস্তানাও আছে যখন আইভরি চোরাচালান করত। তাই সীমান্ত পার হবার আগেই ওকে ধরতে হবে।”
পরমুহূর্তেই মনে হল, “তার মানে কতটা সাবধানে সবকিছু পরিকল্পনা করেছে। আমরা পারব তাকে ধরতে?”
আবার নিজেই নিজেকে সাহস দিলেন, “টিকে থাকতে হলে আমাকে পারতেই হবে।”
এস্তপায়ে আবারো পরিত্যক্ত ক্যাম্পে ফিরে এলেন সেনটেইন।
মাটি থেকে ছেঁড়া টেলিগ্রাফের তার কুড়িয়ে নিজের ভালো তার পেঁচিয়ে ঠিক করে ফেললেন। তারপর নিজের ট্যাপ সার্কিটে বসিয়ে টার্মিনালের সাথে শ্রু দিয়ে ড্রাই সেল ব্যাটারি লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যে মনে হল একটাও মোর্স কোড স্মরণ নেই। পরক্ষণেই অবশ্য সব আবার মনে পড়ে গেল। পিতলের চাবির উপরে দ্রুত তালে পড়তে লাগল হাতুড়ির বাড়ি।
“জুনো বলছি। শুনছো?”
দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড বাদেই বিপ বিপ করে উঠল হেড ফোন, “বলুন”
সংক্ষিপ্ত কয়েকটা শব্দে জোনসকে ডাকাতি আর নিজের অবস্থান জানিয়ে বললেন,
“অবরোধকারীদের সাথে আলোচনা করে সমঝোতা করে নিন। কারণ হিরে উদ্ধার করা প্রথম জরুরি কাজ। তারপর ট্রাক নিয়ে উত্তরে ওচি প্যানে চলে যান আর মনগঙ্গো জঙ্গলে বুশম্যানদের বসতি খুঁজে বুশলিডার কিউয়িকে বলুন “নাম চাইল্ড কালেয়া।” কিউয়িকে আপনার সাথে নিয়ে আসবেন।” বুশম্যানদের ভাষায় কালেয়া মানে হল “সাহায্য প্রার্থনা।” যা কোনো গোত্রের সদস্যই অবহেলা করতে পারে না।
মেসেজ পাঠানো শেষ করে হলুদ সিষ্কের স্কার্ফ দিয়ে মুখমণ্ডলের ঘাম মুছে ফেললেন সেনটেইন। এরপর আঙুলগুলোকে খানিক ব্যায়াম করে নরম বানিয়ে আবারো কী বোর্ড নিয়ে উইন্ডহকে মেসেজ পাঠাতে বসলেন।
অপারেটর একটু আগে জোনসের কাছে পাঠানো বার্তা পেয়েছে নিশ্চিত হয়ে বললেন,
“আগের মেসেজসহ এখন যা বলব সবকিছু অ্যাডমিনিস্ট্রেটর কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমসকে জানাবে। ডাকাতকে ধরা আর চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে উনার সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। এছাড়াও গত তিন মাসে খুব বড়সড় কোনো ঘোড়া চুরির ঘটনায় লোথার ডি লা রের বিরুদ্ধে রিপোর্ট পেয়েছে কিনা তাও জানাও।”
অপারেটর সেনটেইনের বার্তা লিখে নিয়ে পাল্টা জানাল,
“পেটিফগার জুনোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ ভাবে চিন্তিত। উইন্ডহক থেকে ভোর পাঁচটায় সশস্ত্র পাহারাদার বাহিনি রওনা দিয়েছে। তাই সেখানে জুনো ম্যালমসের জন্য অপেক্ষা করলে ভালো হয়।”
