তবে এবারও লোকটাকে অবাক করে দিয়ে তার হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলেন ডেইমলারের দিকে। ..
এবারে সোজা ড্রাইভারের সিটের পেছনের পকেটে হাত ঢুকাতেই রিভলবারের হাতল পেলেন। কিন্তু ঘামে হাত তেলতেলে হয়ে কাঁপতে থাকায় আর কিছুতেই শক্ত করে ধরতে পারলেন না। এই ফাঁকে পেছনে চলে এল লোকটা। চুলের মুঠি ধরে পেছন দিকে টেনে রাখলেন। হাত থেকে স্বশব্দে ক্যাবের ভেতরে পড়ে গেল ভারি পিস্তল।
আবার লোকটার দিকে ঘুরেই রক্ত লাল দাঁত দিয়ে মুখোশটা কামড়ে ধরলেন সেনটেইন। ছেঁড়া মুখোশটা স্থানচ্যুত হয়ে খানিকক্ষণের জন্যে লোকটাকে অন্ধ করে দিল। আবারো দুজনে একসাথে জড়াজড়ি করে পড়ে গেলেন নিচে। আঁচড়ে কামড়ে যুদ্ধরত সেনটেইন। হঠাৎ করেই একেবারে শান্ত হয়ে হাঁ হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকালেন।
মুখোশের একটা অংশ পুরোপুরি খসে পড়ায় লোকটার চোখ দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
“লোথার।”
নিজের নাম শুনে লোকটাও চমকে উঠল। তবে খানিক বাদেই ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পুরো মুখোশ খুলে ফেললেন লোথার। তাড়াতাড়ি সেটা দিয়েই নিজের কব্জি পেঁচিয়ে নিলেন। আঘাতটা সত্যিই গুরুতর।
উঠে বসে লোথারের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। ফিসফিস করে জানতে চাইলেন,
“কেন এরকম করছো?”
“তুমি জানো কেন।” দাঁত দিয়ে কব্জির বাঁধনে গিট দিলেন লোথার আর একই ফাঁকে পড়িমড়ি করে ক্যাবের দিকে ছুট লাগালেন সেনটেইন। কিন্তু পিস্তল ধরার আগেই পেছন থেকে থেকে তাকে বালির উপর ফেলে দিলেন লোথার।
তারপর তিনি নিজে পিস্তলটাকে তুলে খুলে ফেললেন ছুরি। উপরের বাহুতে খোঁচা দিয়ে রক্ত পড়া সাময়িকভাবে বন্ধ করলেন।
“ওগুলো কোথায়? নিচে পড়ে থাকা সেনটেইনের উদ্দেশে বলে উঠলেন লোথার।
“কি নিয়ে কথা বলছো?”
উপুড় হয়ে ডেইমলারের ক্যাবের ভিতর থেকে কালো বাক্সটা বের করে আনলেন লোথার। জানতে চাইলেন “চাবি?”
ঘাড় তেড়া করে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। এবার আর কিছু জিজ্ঞেস না করে বাক্সটাকে বালির উপর রেখে খানিকটা পিছিয়ে এলেন লোথার। পিস্তলের সিঙ্গেল একটা গুলিতে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল বাক্সের তালা। ঢাকনার কালো রঙ উঠে বেরিয়ে পড়ল চকচকে ধাতু।
পিস্তলটাকে পকেটে পুরে ঢাকনা তুলে ফেললেন লোথার। ভেতরে বাদামি কাগজে মোড়া বেশ কয়েকটা ছোট ছোট প্যাকেট থরেথরে সুন্দর করে সাজানো আছে। মুখ আবার লাল মোম দিয়ে আটকানো একটা প্যাকেট হাতে তুলে নিতেই চোখে পড়ল জোনসের হাতের লেখা :
১৫৬ পিস, সর্বমোট ৩৮২ ক্যারট।
“আমি জানতাম যে তুমি একজন খুনী, কিন্তু এরকম ছিঁচকে চুরিও করো তা তো বুঝতে পারিনি।” বলে উঠলেন সেনটেইন।
“তুমি আমার নৌকা আর কোম্পানি চুরি করেছে। তাই চৌর্যবৃত্তি নিয়ে কথা না বলাই ভালো।” বাক্সটাকে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন লোথার। ঘুরে গিয়ে তারপর ডেইমলারের বুট চেক করে দেখলেন।
“গুড, বুদ্ধি করে সাথে বাড়তি পানি এনেছে। এই বিশ গ্যালন দিয়ে এক সপ্তাহ কাটতে পারবে। তার আগেই অবশ্য আব্রাহামের লোক চলে আসবে।”
“শুয়োর কোথাকার।” রাগে কাঁপছেন সেনটেইন।
“তবে যাবার আগে টেলিগ্রাফের তার কেটে দিয়ে যাবো।”
“ওহ গড, লোথার।”
“গাড়িটার আশপাশেই থাকো। মরুভূমির প্রথম আইনই হল এটা। তাই। যত্রতত্র ঘুরে মরো না। দুই দিনের ভেতরে ওরা তোমাকে পেয়ে যাবে। বছরের পর বছর ধরে তোমার ছেলেকে আমি বড় করছি। অথচ তুমি ফিরে এসে আমার সমস্ত কিছু তছনছ করে দিলে।” বালি থেকে শটগানটাকে তুলে নিয়ে বড় একটা পাথরের উপর আছড়ে ভেঙে ফেললেন লোথার। তারপর নিজের মসার কাঁধে ঝুলিয়ে অন্য হাতে সুটকেসটাকে নিয়ে নিলেন। ব্যথায় টিনটন করছে আহত হাত।
“আমি কিন্তু তোমাকে আঘাত করতে চাইনি আর কখনো তোমার সামনে আসব না সেনটেইন, গুড বাই।”
“আমাদের আবার দেখা হবে।” লোথারের কথায় বাধা দিলেন সেনটেইন। “তুমি আমাকে ভালোভাবেই চেন। তাই নিশ্চয় বুঝতে পারছে যে তোমার আজকের কাজের হিসাব পুরো না করা পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।
মাথা নাড়লেন লোথার, “আমি জানি।” তারপর ঘুরে অন্যদিকে হাঁটা শুরু করলেন।
“লোথার!” খানিকটা নরম হল সেনটেইনের গলা, “চলো একটা সমঝোতায় আসা যাক। আমার হিরের বিনিময়ে তোমার কোম্পানি আর নৌকাগুলোর দেনা মাফ করে দিচ্ছি।”
“উঁহু, হু।” বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হাসলেন লোথার, “এখন আর সেগুলোর কোন কার্যক্ষমতা নেই, কিন্তু তোমার হিরে–
“সাথে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড আর আমি প্রমিজ করছি যে এ ব্যাপারে পুলিশকে কিছু জানাব না।” নিজের কণ্ঠস্বরে মরিয়া ভাব লুকাতে চাইলেন সেনটেইন।
“শেষবার আমি এমনভাবে অনুনয় করেছিলাম, মনে আছে? আর কোনো দর কষাকষি নয় সেনটেইন। আমি চললাম।”
“অর্ধেক লোথার, অর্ধেক হীরে অনন্ত রেখে যাও।”
“কেন?”
“একদা আমাদের মাঝে যে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল তার খাতিরে?”
তিক্ত কণ্ঠে হাসলেন লোথার “এর থেকে ভালো আর কিছু মাথায় এল?”
“অল রাইট। তাহলে শোনো, আমার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। আর যদি তুমি এখন এগুলো নিয়ে যাও তাহলে আমি সর্বনাশ হয়ে যাবো।”
“তুমি আমার নৌকাগুলো কেড়ে নেবার পর যেমন আমি হয়েছিলাম।”
বালির উপর দিয়ে থপথপ করে হাঁটা শুরু করলেন লোথার। উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন,
“লোথার ডি লা রে! তুমি আমার প্রস্তাব পায়ে ঠেলেছে। তাহলে আমার শপথও মনে রেখো, তোমাকে ফাঁসির দড়িতে না ঝোলানো পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেব না।”
