“স্টপ!” গর্জে উঠল লোকটা। কিন্তু লো গিয়ারে ডেইমলার চালু করে দিয়েছেন সেনটেইন। লাফিয়ে আগে বাড়ল গাড়ি।
লোকটার চিষ্কারের পাশাপাশি ক্যাবের উপর গুলির সতর্ক বার্তা পেলেও থামলেন না। প্রচণ্ড গতিতে ছুটতে ছুটতেই একপাশে কাত হয়ে গেল ডেইমলার। সেনটেইন নিজেও থরথর করে কাঁপছেন। কোনোমতে হুইল চেপে ধরে সিটে বসে আছেন।
ডাইভার সিটের পাশের হুইল এসে মাটি পাথরের উপর ধাক্কা খেতেই উইন্ডশিন্ডের গায়ে আছাড় খেলেন সেনটেইন। বুনো পশুর মত ধাড়াম করে ধাক্কা খেল ডেইমলার। তবুও তিনি হুইল ছাড়লেন না।
চামড়ার মোড়ানো সিটের উপর ছিটকে পড়লেন সেনটেইন। টের পেলেন ডেইমলারের পেটের ভেতর যেন বক্সারের ঘুষি খেয়ে সেদিয়ে গেল একগাদা পাথর। কিচকিচ করে উঠল রাবারের টায়ার। এত যুদ্ধ করেও অবশেষে গুলির মত ছিটকে ওপাশে পড়ল ডেইমলার। প্রচণ্ড শব্দে কিছু ভেঙে পড়ার আওয়াজ পেলেন সেনটেইন। বাধা ভেঙে পেরিয়ে আসতে পারলেও আহত হয়েছে গাড়িটা। সাথে নিয়ন্ত্রণও চলে গেছে। স্টিয়ারিং নেই। থ্রটলও জ্যাম হয়ে গেছে।
তরতর করে নদীবক্ষে নেমে যাচ্ছে ডেইমলার। পাগলের মত চিৎকার করছেন সেনটেইন। ইগলিশন সুইচের জন্য হাত বাড়ালেও কাত হয়ে পড়ে গেলেন পাশের হিরের স্ক্যাটকেসের ওপর। সমানে দুলতে দুলতে এগোচ্ছে গাড়ি। পাজরে গুঁতো খেয়ে আবার দড়াম করে বিপরীত দিকে ছিটকে পড়লেন।
রাস্তার কিনার দিয়ে শুকনো নদীবক্ষে আছড়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে গড়িয়ে পড়লেন সেনটেইন। বলের মত ডাবল হয়ে নরম সাদা মাটিতে অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু বুনো জানোয়ারের মত গর্জন করতে করতে গিয়ে দূরের নদীবক্ষে পড়ে গেল ডেইমলার। মাটিতে ডুবে গেল নাক। আকাশের উপর চাকা তুলে উপুড় হয়ে গেল বিশাল গাড়ি। বনেট ভেঙে বেরিয়ে আসা তেলে ভিজে গেল বালি।
দাঁড়িয়েই দৌড়াতে লাগলেন সেনটেইন। গোড়ালি পর্যন্ত ডুবে গেল বালিতে। আতঙ্কে যেন সময়ের গতিও থেমে গেছে। মনে হচ্ছে কোনো এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে এগোচ্ছেন।
পেছনে তাকাবার সাহসও হচ্ছে না। ভয়ংকর মুখোশ পরিহিত লোকটা নিশ্চয়ই কাছে কোথাও আছে। যেকোনো মুহূর্তেই হয়ত এসে তার ঘাড় চেপে ধরবে কিংবা গুলি করবে। তারপরেও দৌড়ে ঠিক ডেইমলারের কাছে পৌঁছে গেছেন। হাঁটু গেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেলেন ড্রাইভারের সিটের পাশে। শটগান তুলে নিয়েই গ্লাভ কম্পার্টমেন্ট খুলে শেলগুলো বের কর নিলেন। কিন্তু হাত দুটো এত কাঁপছে যে হাঁটুর কাছে বালির ওপর ছড়িয়ে পড়ল সবগুলো বুলেট।
কোনোমতে বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে ফাঁকা ব্যবহৃত কার্টিজগুলো ফেলে দিলেও হঠাৎ করেই অস্ত্রটা কে যেন ছিনিয়ে নিয়ে নিল।
এসে গেছে তার আতঙ্ক। লোকটা বোধ হয় চিতা বাঘের মতই দৌড়াতে পারে। নয়ত এত দ্রুত কেমন করে চূড়া থেকে নেমে এল। খালি শটগান ছুঁড়ে ফেলে দিল লোকটা। পঞ্চাশ ফুট দূরে পড়লেও সে নিজেও খানিকটা ভারসাম্য হারিয়ে টলে উঠল। এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন সেনটেইন। হাঁটু দুটো ভাঁজ করে সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার বুকের উপর আঘাত করলেন।
অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণে দুজনেই একসাথে বালির ওপর আছাড় খেলেন, কিন্তু সেনটেইনই আগে নড়ে উঠলেন।
পিস্তল! মনে হতেই হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠে ডেইমলারের মাঝখানের দরজার হ্যাঁন্ডেল ধরলেন সেনটেইন। কিন্তু দরজা আটকে গেছে। তাড়াতাড়ি ড্রাইভার সিটের পেছন দিয়ে হাত ঢুকাতে চাইলেন। কিন্তু টের পেলেন কাঁধের মাংসের ভেতরে ঢুকে গেলো হাড়সর্বস্ব কতগুলো আঙুল। সাড়াশির মত ধার টেনে-হিঁচড়ে গাড়ির কাছ থেকে তাকে সরিয়ে আনল লোকটা। চট করে মাথা ঘোরাতেই ময়দার বস্তার মুখোশের মধ্যের ফুটোয় দেখা গেল একজোড়া মানুষের চোখ। সাথে সাথে সেদিক লক্ষ্য করে নখ ঢুকিয়ে দিলেন সেনটেইন।
লোকটা ঝাঁকি দিয়ে মাথা সরিয়ে নিলেও তার বুড়ো আঙুল আটকে যাওয়ায় চিবুক পর্যন্ত ছিঁড়ে গেল মুখোশ। লোকটা সেনটেইনের কব্জি ধরে ফেলল আর তৎক্ষণাৎ সরে যাওয়ার পরিবর্তে ডান হাঁটু দিয়ে অন্তকোষ লক্ষ্য কর প্রচণ্ড এক লাথি কষালেন সেনটেইন। ব্যথায় মোচড় খেলেও উরু দিয়ে তার হাঁটুতে শুতে দিল লোকটা।
কুঁকড়ে উঠলেও মাথা নিচু করে লোকটার কব্জি কামড়ে ধরলেন সেনটেইন। একই সাথে শরীরের নিম্নাঙ্গে সমানে কিল, ঘুষি চালাচ্ছেন। যদিও লাথির বেশিরভাগই লাগল লোকটার ইস্পাত কঠিন মাংসে কিংবা হাড়ে।
সেনটেইনকে নিয়ন্ত্রণ করার সব রকম চেষ্টা চালাচ্ছে লোকটা। বোঝ গেল যে এরকম বুনো আক্রমণের কল্পনাও করেননি। একই সাথে কব্জিতেও নিশ্চয় ব্যথা পাচ্ছে। সেনটেইনের মুখ ভরে গেল উষ্ণ আর নোনা রক্তে।
এবারের খালি হাত দিয়ে সেনটেইনের ঘন কোঁকড়া চুলের গোছা মুঠো করে ধরে পিছন দিকে হ্যাঁচকা টান দিল লোকটা। যে কোনো মুহূর্তে হয়ত মাথায় গুলি চালাতেও পারে। চোখ বন্ধ করে ফেললেন সেনটেইন। কিন্তু মনে হচ্ছে লোকটার সে ধরনের কোনো আঘাত করার প্ল্যানই নেই।
হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন যে মুখের ভেতরে কামড়ে রাখা কব্জির শিরা ছিঁড়ে ফেলছেন। কামড় একটুও আলগা না করে মুখের কোনা বেয়ে ফেলতে লাগলেন ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত। এতক্ষণে ব্যথায় মুষড়ে উঠল লোকটা। সেনটেইনের চোয়াল খামছে ধরায় জ্বলে উঠল চোখ।
