পরের দিন রাত এগারোটা বাজে তাদের পাশ দিয়ে পেরিয়ে গেল হলুদ ডেইমলার। দিয়াশলাই জ্বালিয়ে নিজের ঘড়ি চেক করে দেখলেন লোথার। “তার মানে গত রাতে টেলিগ্রাফ পাবার আধা ঘণ্টা পরেই রওনা দিয়ে দিয়েছে। তার মানে পাক্কা বাইশ ঘণ্টা ধরে ড্রাইভ করে একা একা পার হয়ে এসেছে এতটা পথ।” হাল্কাভাবে শিষ দিয়ে উঠলেন লোথার। “এভাবে গেলে আগামীকাল দুপুরের আগেই হানি খনিতে পৌঁছে যাবে। সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।”
***
সামনেই দেখা যাচ্ছে নীল পাহাড়ের সারি। কিন্তু এখন এ দৃশ্য উপভোগ করার মত সময় আর মন কোনোটাই সেনটেইনের নেই। বত্রিশ ঘণ্টা ধরে টানা গাড়ি চালাচ্ছেন। পথের পাশে গাড়ি রেখে মাত্র দু’ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। ক্লান্তিতে হাড়ের গিটগুলো পর্যন্ত অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু তারপরেও চোখের সামনে সূর্যের গনগনে রোদে জ্বলতে থাকা খনির টিনের ছাদগুলো দেখে নিমিষেই ভুলে গেলেন সমস্ত অবসাদ।
ডেইমলার থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খানিক হাত-পা ঝেড়ে নিলেন। রিয়ারভিউ মিররে চেহারাটাও দেখলেন। ওয়াটার ব্যাগ থেকে পানি নিয়ে কাপড় ভিজিয়ে তাই ক্লান্ত মুখখানাও মুছে নিলেন। সাদা রঙের ডাস্ট জ্যাকেট খুলে ফেলতেই সারা শরীর আবার পরিষ্কার আর নিখুঁত দেখাল। এতক্ষণ সবকিছু দেখেছে অ্যাভিনিউর কর্নারে থাকা একদল নারী আর ছোট ছেলে মেয়ের জটলা। তাদের পাশ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ে চলে এলেন সেনটেইন।
গেইটের বাইরে জনাবিশেক লোক এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মালিককে দেখে এই শ্বেতাঙ্গ কর্মীদের দলই হাতে হাত রেখে লাইন করে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ডেইমলারের হন চেপে ধরে মেঝের সাথে এক্সিলারেটর ঠেসে ধরলেন। সেনটেইন। সোজা লাইনটার মাঝ বরাবর এগিয়ে যেতেই সবাই বুঝল তাদেরকে চাপা দিতেও তিনি একটুও ভ্রূক্ষেপ করবেন না। একেবারে শেষ মিনিটে দু’পাশে ছিটকে পড়ল পিকেটারদের দল।
একেবারে বারান্দার সামনে গিয়ে গাড়ি থামালেন সেনটেইন। জ্যাকেট আর টাই ঠিক করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন জোনস।
“আমরা ভেবেছি আপনি হয়ত কালকের আগে আসতেই পারবেন না।”
“আপনার বন্ধুরা” ডেইমলার নিয়ে তেড়ে আসার সময় পিকেটারদের ছোঁড়া পাটকেলে ভাঙা কাঁচ দেখালেন সেনটেইন।
“ওরা আপনার উপর আক্রমণ করেছে? এটা ক্ষমার অযোগ্য, সত্যি।”
“ঠিক তাই, আর ক্ষমার কোনো ইচ্ছেও আমার নেই।”
জোনসের সরু কোমরে ঝুলছে বিশাল এক সার্ভিস পিস্তল। পেছনেই ছোটখাটো ব্রানটিংহ্যাম। উনার চশমা পরা চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি বুঝি কেঁদে ফেলবেন। তারপরেও কাঁপা কাঁপা হাতে ডাবল ব্যারেল শর্টগান ধরে রেখেছেন।
তাঁকে সাহস দিতে চাইলেন সেনটেইন; বললেন, “আপনি সত্যিই একজন সাহসী লোক। আমি আপনার কথা কখনো ভুলব না।
অতঃপর অফিসে গিয়ে নিজের ডেস্কে বসলেন সেনটেইন, জোনসের কাছে জানতে চাইলেন, ক’জন আমাদের পক্ষে আছে।”
“মাত্র আটজন অফিস স্টাফ।”
“রজার আর ম্যাক্সিয়ারও?”
সিনিয়র দু’জন ওভারসিয়ারের কথা জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“ওরা দুজনেই কমিটিতে আছে।
“ফুরির সাথে?”
“ওরা তিনজনই তো সর্বেসর্বা।”
“ওরা যাতে আর কখনো কাজ করতে না পারে সেটা আমি অবশ্যই নিশ্চিত করব।” তিক্ত কণ্ঠে সেনটেইনের ঘোষণা শুনে জোনস বিড়বিড় করে উঠলেন।
“আমার মনে হয় এটাও মনে রাখতে হবে যে, ওরা কোনো আইন ভঙ্গ করেনি। একত্রে জড়ো হবার লিগ্যাল অধিকার তাদের আছে”।
জোনসের আমতা আমতা কথা শুনে ক্ষেপে গেলেন সেনটেইন।
“এখন যখন আমি খনিটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করছি, ওদের জন্য এতকিছু করেছি, তারপর তো কোন অধিকারই নেই। আপনি কোন পক্ষে বলুন তো জোনস?”
ব্যথাভরা চোখ নিয়ে তাকালেন জোনস, “আপনি কেমন করে এই প্রশ্নটা করলেন? প্রথম যেদিন আপনার সাথে দেখা হয়েছে সেদিন থেকেই তো আপনার বাধ্যগত। আমি কেবল লিগ্যাল অবস্থানটা দেখাবার চেষ্টা করেছি।”
সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে জোনসের হাত ধরলেন সেনটেইন।
“আমায় ক্ষমা করুন জোনস। আমি আসলে ক্লান্ত আর বেশ দিশেহারা বোধ করছি।” বলেই কেঁপে উঠলেন সেনটেইন। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে চামড়ার মোড়া সোফায় বসিয়ে দিলেন জোনস, “শেষবার আপনি কখন ঘুমিয়েছেন?”
“এখন আপনাকে ঘুমাতে হবে। অন্তত আট ঘণ্টা। বাংলো থেকে আপনার জন্যে পরিষ্কার কাপড় আনার ব্যবস্থা করছি।”
“কিন্তু আমাদেরকে ওদের সাথে কথা বলতে হবে।”
“না।” মাথা নেড়ে পর্দা টেনে দিলেন জোনস। “খানিক বিশ্রাম না নিলে সঠিক সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন না।
চোখের পাতা চেপে ধরলেন সেনটেইন, “আপনি ঠিকই বলেছেন, যমন সবসময় বলেন।”
“সন্ধ্যা ছয়টায় আপনাকে ঘুম থেকে ডেকে দেব। আর স্ট্রাইক কমিটিকেও জানিয়ে দিচ্ছি যে আপনি আটটায় ওদের সাথে মিটিং করবেন। তাহলে নিজেদের রণকৌশল ঠিক করে নেয়ার জন্য আমরাও হাতে দু’ঘণ্টা সময় পাব।”
***
সন্ধ্যায় অফিসে এসেছে স্ট্রাইক কমিটির সদস্যরা। আর কোনো কথা না বলে একদৃষ্টে ঝাড়া তিন মিনিট তিনজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। ইচ্ছে করেই সবগুলো চেয়ার সরিয়ে কেবল তার আর জোনসদের জন্য দুটো রেখেছেন।
“বর্তমানে সারাদেশে হাজার হাজার লোক তাদের চাকরি হারাচ্ছে।” আবেগহীন গলায় সেনটেইন জানালেন, “তাদের যে কেউ এসে সানন্দে তোমাদের জায়গায় বসে যাবে।”
