কিন্তু স্যালুনে ঢুকে সেনটেইনের অনুমতি না নিয়েই একেবারে শ্রেষ্ঠ চেয়ারটাতে নিজের স্ত্রীকে বসিয়ে দিলেন ম্যালকমস। সচরাচর এখানে সেনটেইনই বসেন। সিল্ক কার্পেটের ওপর ইসাবেলার পা দুটোকে পাশাপাশি রেখে স্কার্ট দিয়ে ব্লেইন এমনভাবে ঢেকে দিলেন যে বোঝা গেল আগেও এ কাজ বহুবার করেছেন।
এরপর ইসাবেলা ব্লেইনের গালে আস্তে করে আঙুল ছুঁয়ে এমনভাবে হাসলেন যে দেখে হতাশায় ছেয়ে গেল সেনটেইনের হৃদয়। মনে হল অ্যাবি আর স্যার গ্যারির কথাই বোধ হয় ঠিক।
এতক্ষণে সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে হাসলেন ইসাবেলা আর সাথে সাথে বদলে গেল তার হালকা বাদামি আর সোনালি রঙা চোখের রঙ। সেনটেইনের গাঢ় বুনো মধুরঙা চোখের দিকে তাকিয়ে যেন চ্যালেঞ্জ জানালেন, যেন নিজের হাতের গ্লাভস খুলে সেনটেইনের মুখে চপেটাঘাত করলেন।
“কত বড় সাহস!” রাগে দিশেহারা হয়ে গেলেন সেনটেইন, “আমি ভেবেছিলাম ব্লেইনের দিকে আর হাত বাড়াব না। কিন্তু তুমি যদি যুদ্ধ করতে চাও, তবে আমিও রাজি আছি। দেখা যাক কী হয়।” নিঃশব্দে ইসাবেলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন সেনটেইন।
ডিনারের জন্য রকলবস্টারের ড্রেসিং আর রোস্টের সস তিনি নিজের হাতে বানিয়েছেন। তাই খাবারগুলো সবাই অত্যন্ত উপভোগ করল। ইসাবেলা আর সেনটেইনও পরস্পরের সাথে হাসি-খুশি আচরণ করেছেন দেখে ব্লেইন ও অ্যাবিও দারুণ খুশি। অন্যদিকে চুপচাপ বসে রইলেন র্যাচেল আব্রাহম, স্পষ্ট বুঝতে পারলেন কী ঘটছে। তাই আনমনে ইসাবেলাকেই সমর্থন করলেন। জানেন তার নিজের ছোট্ট কুটিরের উপরেও সর্বদা শিকারির নিঃশ্বাস পড়ছে।
“আপনার তো দু’জন মেয়ে তাই না মিসেস ম্যালকমস? খুব কষ্ট হয়, না? ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা থাকলেই কাজ বেশি বাড়ে।” প্রতিদ্বন্দ্বী সম্পর্কে কতটা গবেষণা করেছেন জানিয়ে দিলেন সেনটেইন।
অন্যদিকে টেবিলের শেষ মাথায় বসে কেঁপে উঠলেন র্যাচেল। ছুরির এক খোঁচায় ইসাবেলার ব্যর্থতাকে তুলে ধরেছেন এই নারী।
“ওহ, বাসার কাজের জন্য আমি যথেষ্ট সময় পাই। বাইরে ব্যবসা করি না। তো! তাছাড়া আমার ডার্লিং মেয়েরা বাবার অন্ধ ভক্ত।”
হুম, বোঝা গেল ইসাবেলাও সমানভাবে পারদর্শী। নিপুণভাবে মেয়েদেরকে ব্লেইনের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। বিষয় পরিবর্তন করে রাজনীতিতে চলে গেলেন সেনটেইন।
আর আলোচনার পুরো সময়টুকু জুড়ে উপভোগ করলেন ব্লেইনের কণ্ঠস্বরের ওঠানামা ও মাধুর্য। এতটাই শ্রুতিমধুর মনে হল যে, মাঝে মাঝেই প্রশ্ন করে, ছোট-খাটো মন্তব্য করে আরো উৎসাহ দিলেন। আপন মনে ভাবলেন, আমিই এত কাবু হয়ে পড়েছি; সাধারণ লাখ লাখ ভোটার তো অঙুলি হেলনে কেবল তাকেই ভোট দেবে। হঠাৎ করেই বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা একটু বেশিই দৃষ্টিকটু দেখাচ্ছে। তারা দুজনে এমনভাবে মগ্ন হয়ে কথা বলছেন যেন রুমে আর কেউ নেই। তাই তাড়াতাড়ি ইসাবেলার দিকে ফিরলেন।
“আপনারও স্বামীর মত একই ধারণা মিসেস ম্যালকমস?”
হা হা করে হেসে উঠে স্ত্রীর মত জানিয়ে দিলেন কর্নেল সাহেব। “আমার স্ত্রী আসলে রাজনীতি একেবারেই পছন্দ করে না, তাই না ডিয়ার?” নিজের ডিনার জ্যাকেটের পকেট থেকে সোনার ঘড়ি বের করে চোখ বোলালেন ম্যালকমস।
“মাঝরাতেরও বেশি হয়ে গেছে। সময়টা আসলে এত দারুণ কেটেছে যে, সময়েরই হুঁশ নেই।”
“ইউ আর রাইট ডার্লিং” স্বস্তি পেলেন ইসাবেলা।
“কিন্তু আমি তো ব্র্যান্ডি আর সিগার ছাড়া যেতে দেব না।” বাদ সাধলেন সেনটেইন। কিন্তু নার্ভাস ভঙ্গিতে কাঁপতে থাকা সেক্রেটারিকে দেখে থেমে যেতে হল। হাতে টেলিগ্রাফ।
“কী হয়েছে? লোকটা এমনভাবে কাঁপছে যেন নিজের মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ধরে রেখেছে।
“ড, টুয়েন্টিম্যান জোনসের কাছ থেকে এসেছে। ইটস আর্জেন্ট।”
টেলিগ্রাফের পাতা হাতে নিয়েও আগে অতিথিদের তদারক করলেন সেনটেইন। ব্লেইন আর অ্যাবিকে হাভানার চুরুট, লিকার দিয়ে এক্সকিউজ মি বলে চলে এলেন নিজের বেডরুমে। টেলিগ্রাফ মেসেজটা পড়ে দেখলেন :
গারহার্ড ফুরির নেতৃত্বে অবরোধ কমিটি সমস্ত কাজ বাতিল করে বসে আছে। তারা চাকরিচ্যুত সকলের পুনঃবহাল আর চাকরির নিশ্চয়তা দেবার দাবি তুলেছে। আপনার নির্দেশনার জন্য অনুরোধ করছি।
বিছানার উপর বসে রাগে কাঁপছেন সেনটেইন। এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা। এটা তার খনি, তার হিরে। তিনি তো তাদেরকে মজুরি দিচ্ছেন। তার মানে চাকরি দেয়া আর কেড়ে নেয়া উভয় অধিকারই তার হাতে। শিপমেন্ট বাতিল হয়ে গেছে মানে? এটার উপর নির্ভর করছে উনার ভাগ্য। কে এই গারহার্ড ফুরি? ভাবতে গিয়েই মনে পড়ল ট্রান্সপোর্ট ড্রাইভারের কথা।
এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলেন করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে তার সেক্রেটারি।
“মি, আব্রাহামকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।”
আব্রাহাম দরজার ভেতরে পা রাখতেই মেসেজ লেখা কাগজটা ধরিয়ে দিলেন সেনটেইন।
“আমার সাথে এরকম করার ওদের কোনো অধিকার নেই” ভয়ংকর রকম ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার দিলেন।
“কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল তাদের সে অধিকার সত্যিই আছে। ১৯২৪ অ্যাক্ট অনুযায়ী”
“আমার সামনে আইন কপচাবেন না” অ্যাবিকে কথা শেষ করতে না দিয়েই সেনটেইন বলে উঠলেন, “একদল বলশেভিকে বাচ্চা যে খাওয়ায় তার হাতেই কামড় দেয়।”
