ভারি গোথিক ইমপেরিয়াল রীতিতে তৈরি ইঙ্ক প্যালেসে ঢুকেই বলরুমের চারপাশে চোখ বোলালেন সেনটেইন। যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাই এসেছেন, সাথে তাদের স্ত্রী আর শহরের বিখ্যাত জমিদার ও ব্যবসায়ীর দলও আছে।
এদের ভিড়ে সেনটেইনের নিজস্ব কয়েকজন ম্যানেজার আর জুনিয়র ম্যানেজারও আছেন। যাই হোক, সবার সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ সারতে অ্যাবি এসে তাড়াতাড়ি সেনটেইনকে নিয়ে গেলেন যেন তিনি তটস্থ হবার আগেই কাজ সারা যায়। সেনটেইনের হাত ধরে রিসেপশন লাইনের দিকে নিয়ে গেলেন আবি, “অ্যাডমিনিস্ট্রেটর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ব্লেইন ম্যালকমস। যুদ্ধ শেষে মিলিটারি ক্রুসের সাথে বারও পেয়েছেন। আর ব্যক্তিগত জীবনে একজন আইনজীবী আর
এতক্ষণ হোস্টের দিকে তেমন একটা নজর দেননি সিনটেইন। মনোযোগ দিয়ে অ্যাবির আরেক হাত ধরা র্যাচেলের মুখে স্যুপের রেসিপি শুনেছেন। যদিও মওকা পেলেই র্যাচেলকে হটিয়ে দিতেও প্রস্তুত আছেন। এমন সময় আচমকা মাইকে তাদের নাম ঘোষণা করল এ.ডি.সি, “মি. অ্যান্ড মিসেস আব্রাহাম ও মিসেস সেনটেইন ডি থাইরি কোর্টনি চোখ তুলে সামনে তাকাতেই মোহিত হয়ে গেলেন সেনটেইন। এমনকি অবচেতনেই আঁকড়ে ধরাতে আব্রাহামের কনুইতে ঢুকে গেল সেনটেইনে নখ।
কৃষ্ণকায় ব্লেইন ম্যালকম লম্বায় ছয় ফুট হবেন। এমন আমুদে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন যেন যেকোনো সময় নাচ শুরু করবেন।
“মিসেস কোর্টনি” হাত বাড়িয়ে দিলেন ব্লেইন, “আপনি আসায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী এতক্ষণ আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।” পরিষ্কার, মার্জিত আর শিক্ষিত এই কণ্ঠস্বর শুনে সেনটেইনের ঘাড়ের নিচে যেন শিরশির করে উঠল।
ম্যালকমসের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন সেনটেইন। পাশাপাশি ভদ্রলোকের চেহারাটাও পরীক্ষা করে দেখলেন। পাথরের মত ভারি আর বিশাল কপাল, চোয়ালের হাড় এবং গাল। ঠিক যেন তরুণ সুদর্শন আব্রাহাম লিংকনের প্রতিমূর্তি, বয়সও কম। মাত্র চল্লিশ।
হঠাই খেয়াল করলেন যে এখনো ম্যালকমসের হাত ধরে আছেন। আর সেনটেইনের মত আগ্রহ নিয়েই ওর দিকে তাকিয়ে আছেন কর্নেল সাহেব। ওদিকে র্যাচেল আর অ্যাবি আগ্রহ নিয়ে ওদের দুজনকেই দেখছেন।
আস্তে করে হাত ছাড়িয়ে নিলেন সেনটেইন। আতঙ্কিত হয়ে অনুভব করলেন যে গাল দুটো লাল হয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে যা একবারও ঘটেনি।
“আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান যে এর আগেও আপনার পরিবারের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে।” উজ্জ্বল সাদা দাঁত দেখিয়ে বলে উঠলেন ম্যালকমস। বড়সড় মুখটা হাসলে আরো বৃহৎ দেখায়। খানিকটা কেঁপে উঠে সেনটেইনও হাসলেন। “তাই নাকি?” স্কুল গার্লদের মত লজ্জায় লাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন। লোকটার অদ্ভুত সবুজাভ চোখ দুটো বারবার তাকে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে।
“আমি ফ্রান্তে জেনারেল শন কোর্টনির অধীনে যুদ্ধ করেছি। উনি সত্যিকারের একজন জেন্টলম্যান ছিলেন।” ম্যালকম বলে চললেও তার মাথার ওপর টাক দেখে একটু বিরক্ত হলেন সেনটেইন।
“আমি শুনেছি আপনি নাকি ১৯৭১ সালে কয়েক সপ্তাহের জন্য জেনারেলের হেড কোয়ার্টারেও ছিলেন। আমি সে বছরের শেষ দিকেই উনার স্টাফ হয়েছি।” গভীরভাবে দম নিয়ে অবশেষে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেন সেনটেইন। মাইকেল আর শাসার কথাও ভাবতে হবে। তাই বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি দিয়ে সরে পড়াই ভালো হবে।
“আমি খুব সম্মানিত বোধ করব, মিসেস কোর্টনি-” হাত বাড়িয়ে দিলেন ব্লেইন আর মুহূর্তখানেকের দ্বিধা ছাড়াই আঙুল দিয়ে তার কনুই স্পর্শ করলেন সেনটেইন।
অন্যান্য জুটিরা নাচতে নাচতে দূরে সরে তাদের জন্যে খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। আর ব্লেইন সত্যিই একজন অসাধারণ ড্যান্সার। নিজেকে এতটা হালকা আর স্বাচ্ছন্দ্য কখনো বোধ করেননি সেনটেইন।
প্রজাপতির মত ঘুরে ঘুরে নাচলেন দু’জনে। প্রতিটি মুদ্রা কাউন্টার টার্নে এত মজা পেলেন যে, মিউজিক বন্ধ করে বাদক দল ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেও সেনটেইন একটুও ক্লান্ত হলেন না। বরঞ্চ বাজনেদারদের ওপর রাগই হল। আরেকটু বাজালে কী হত! মেঝেতে সবার মাঝখানে হাত ধরে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসছেন ব্লেইন ম্যালকমস আর সেনটেইন কোর্টনি। বাকি জুটিরা তাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে হাততালি দিচ্ছে।
এখন আর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকাটা শোভা পায় না। তাই আস্তে করে পিছিয়ে দাঁড়ালেন সেনটেইন।
“আমার মনে হয় শ্যাম্পেন হলে খারাপ হবে না” সাদা জ্যাকেট পরিহিত ওয়েটারকে ইশারা দিলেন ব্লেইন।
ভিড়ে ভিড়াকার পুরো রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন দু’জনে। এক দু’জন সাহসী আত্মা কাছে আসতে চাইলেও কাধ আর মাথা দিয়ে স্পষ্ট বিরক্তির ভাব প্রকাশ করলেন সেনটেইন। তা দেখে বাকিরাও দূরে সরে গেল।
খানিক বাদে দ্বিতীয়বার ডান্স ফ্লোরে একসাথে নাচার পর ব্লেইন জানালেন, “আমি আমার স্ত্রীর সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে চাই মিসেস কোর্টনি, মে আই?”
হঠাৎ করেই প্রচণ্ড হিংসা অনুভব করলেন সেনটেইন। কিছু না বলে কেবল মাথা নাড়লেন। নিজের কণ্ঠস্বরকেও বিশ্বাস নেই।
মেঝের উপর দিয়ে মেইন সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন ব্লেইন। মুখগুলোর মধ্যে খোঁজ করলেন সেনটেইন। না জানি কে হবেন সেই ভাগ্যবতী। দু’পাশে সরে পথ করে দিল বাকি নারী-পুরুষের দল। আর ওই তো সে, অনিন্দ্যসুন্দর বিষণ্ণ মাখা দু’চোখ তুলে সেনটেইনকে দেখছে। বয়সেও তরুণ মেয়েটার পুরো অবয়বে তা আর বিনয় ছড়িয়ে থাকলেও হাসিতেও কেমন দুঃখের ছাপ!
