শেষবারের মত সবকিছুর উপর চোখ বুলিয়ে দ্রুতবেগে ধাবমান গাড়ির দিকে তাকালেন। কিন্তু কেন যেন রাগও হল, “দেখো কাণ্ড কত জোরে গাড়ি চালাচ্ছে, ঠিক ঘাড় ভেঙে মরবে।” যদিও অশুভ চিন্তাটা তাড়াতাড়ি আবার মাথা থেকে তাড়িয়েও দিলেন।
শেষ মুহূর্তে গাড়ি এত জোরে ছুটে এল যে, মনে হল সব উপড়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু না, মোক্ষম সময়ে গ্রুটল বন্ধ করে দিয়ে দরজা খুলে নেমে এলেন সেনটেটন। লোথার যেখানে পরিখার মধ্যে উবু হয়ে বসে আছেন তা থেকে খুব বেশি হলে বিশ কদম সামনে। বেড়ে গেল লোথারের হৃৎপিণ্ডের গতি; আপন মনেই ভাবলেন “কেন আমি এমন করছি? এই নারী আমার সাথে এত প্রতারণা আর অবজ্ঞা করেছে?” শক্ত হতে চেয়েও পারলেন না লোথার। প্রাণশক্তিতে ভরপুর সেনটেইনের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক উজ্জ্বল দ্যুতি।
ঝট করে কাটা ঝোপে ঠিক লোখারের দিকেই যেন মুহূর্তখানেক তাকিয়ে ছেলেকে ডাক দিলেন সেনটেইন, “চলো আমরা হেঁটে গিয়ে দেখে আসি, ক্রসিং নিরাপদ হবে কিনা।”
লোথার যেখানে শুয়ে আছেন সেদিকেই এগিয়ে আসছে মা আর ছেলে। নিজের ট্রেঞ্চ থেকে সব দেখছে ম্যানফ্রেড সেনটেইন যে ওর মা সেটা ও জানে না কিংবা মায়ের দুধ পান করা অথবা কোলে ওঠা এ জাতীয় কোনো স্মৃতিও তার নেই। অতএব পুরো মনোযোগ দিল শাসার প্রতি।
শাসার সুদর্শন চেহারা দেখে জ্বলে উঠল ম্যানফ্রেড। মনে পড়ে গেল ছেলেটার বাম হাতের ঘুষির ক্ষত। যাই হোক, শুকনো নদীবক্ষে নেমে অ্যাকেশিয়া ডাল বিছানো পথটাকে আবার ঠিকঠাক করে দিল শাসা।
ছেলেকে কাজে লাগিয়ে দিয়ে ডেইমলারের দিকে ফিরে তাকালেন সেনটেইন। দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন লোথার। কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছেন না।
“অল সেট, মা।” অ্যাকেশিয়া ডালগুলোকে আবার সুন্দর করে পেতে দিয়ে উঠে এল শাসা।
“চলো তাহলে এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আবার ডেইমলারে চড়ে বসল দু’জনে। শুকনো নদী পেরিয়ে বহু দূরে চলে গেলেন সেনটেইন। মরুভূমিতে মিলিয়ে গেল ইঞ্জিনের গর্জন। আচমকাই কেঁপে উঠলেন লোথার।
কয়েক মিনিট ধরে কেউ কোনো নড়াচড়া করল না। একটু পরে সবার আগে উঠে দাঁড়ালেন হেনড্রিক। কিন্তু কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়েও লোথারের চেহারা দেখে আবার চুপ করে গেলেন।
আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ডেইমলার যেখানে থেমেছিল সেখানে দাঁড়ালেন লোথার। ইচ্ছে হল নিচু হয়ে মেনটেইনের স্পর্শ করা ধুলা ধরে দেখতে। কিন্তু হঠাৎ করেই পেছন থেকে কথা বলে উঠল ম্যানফ্রেড।
“ও একটা বক্সার।” খানিকক্ষণের জন্যে তো লোথার বুঝতেই পারলেন না যে ছেলেটা শাসার কথা বলছে।
“চলো, ক্যাম্পে যাই।” বাবার কথা শুনে হাত দুটো পকেটে ভরে চুপচাপ ডাগ আউটের উদ্দেশে হাঁটা ধরল ম্যানফ্রেড।
“তুমি বক্সিং জানো, পা?” আবারো মনে সাধ জাগতেই জানতে চাইল ছেলেটা।
“আমার তো মানুষের দুপায়ের মাঝখানে লাথি মারতেই বেশি ভালো লাগে রে ম্যানি। তারপর ধর বোতল কিংবা বন্ধুকের হাতল দিয়ে ঠাস করে একটা বারি। ব্যস।
“আমি বক্সিং শিখতে চাই।” বলে উঠল ম্যানফ্রেড।
হয়ত আইডিয়াটা অনেক দিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল; তবে এবারে একেবারে ঘোষণা হিসেবে আবির্ভূত হল এ সিদ্ধান্ত।
***
“ওহ, অ্যাবি আপনি জানেন এ ধরনের লোকজন আমি কতটা অপছন্দ করি। রুম ভর্তি সিগারেটের ধোয়া, অপরিচিতদের সাথে বকবক উফ”, বিরক্তি বাড়ল সেনটেইনের কণ্ঠে।
“এই লোকটা হয়ত কখনো অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে সেনটেইন।”
গোমড়া মুখে বসে রইলেন সেনটেইন। কারণ কথাটা সত্যি। অ্যাডমিনিস্ট্রেটরই বলতে গেলে এ অঞ্চলের হর্তাকর্তা।
“আগেরগুলোর মতন এও বোধ হয় কোনো এক বুড়ো হামবড়া হবে।”
“আমি অবশ্য এখনো দেখিনি।” স্বীকার করলেন আবি।
“উইন্ডহক মাত্রই পৌঁছেছেন আর আগামী মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আমাদের সুমেরু অঞ্চলের খনির কাগজ তার ডেস্কের উপরেই সিগনচারের আশায় পড়ে আছে।”
সেনটেইন চোখ উল্টাতেই অ্যাবি মনে করিয়ে দিলেন, “দুই হাজার স্কয়ার মাইল উর্বরা জমির অধিকার নেয়ার জন্যে কয়েক ঘণ্টা কষ্টে কাটানো যায় না?”
কিন্তু সেনটেইন এত সহজে রাজি হবার পাত্রী নন; বললেন, “আমরা তো আজ সন্ধ্যায় ট্রেনে ওঠার কথা। শাসা বুধবার থেকে কলেজে যাবে।” নিজের প্রাইভেট কোচের স্যালুনের ভেতরে পায়চারি করছেন সেনটেইন।
“মঙ্গলবারেই আরেকটা ট্রেন ছাড়বে। আপনি তখন যাবেন। মাস্টার শাসা আজ চলে যাক। স্যার গ্যারি আর উনার স্ত্রী কেপটাউনে শাসাকে তুলে নেবেন। তারপর শাসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন আব্রাহাম, “একা একা নিশ্চয়ই যেতে কোনো কষ্ট হবে না, ইয়ং ম্যান?”
আব্রাহামের চতুর বুদ্ধি টের পেলেন সেনটেইন; এটা শাসার জন্যে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল।
“অবশ্যই মা। তুমি এখানে থাকো। নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের সাথে দেখা করাটা অত্যন্ত জরুরি।”
বাতাসে হাত ছুড়লেন সেনটেইন, “আব্রাহাম যদি আমি বিরক্তির চোটে মরে যাই তাহলে সারা জীবন আপনি এর দায়িত্ব বয়ে বেড়াবেন কিন্তু।”
প্রথমে হিরের স্যুট পরতে চাইলেও মত বদলে হলুদ সিল্কের ইভনিং ড্রেসটাই বেছে নিলেন। সাথে কানে একজড়ো সলিটেয়ার ডায়মন্ড। তবে গলায় পরলেন বিশাল হলুদ ডায়মন্ডের পেনড্যান্ট। যা প্রাটিনাম চেইনের সাথে চমৎকার আবহ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
