আর মা যে কতখানি সত্যি তো বলাই বাহুল্য। মুগ্ধ হয়ে শাসা দেখে কীভাবে ধীরে ধীরে সচল কনভেয়ার বেল্টে করে মিল হাউজের চূর্ণ পাথর এনে ওয়াশিং প্লান্টে ফেলা হয়। তারপর ধাপে ধাপে প্রকৃত নুড়িগুলোকে আলাদা করে গ্রিজের ড্রামে ধোয়া হয়। ভেজা নুড়িগুলো সহজেই উপরে উঠে আসে। কিন্তু হিরে শুকনো থাকে আর এটাই হল এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হিরে যখনই গ্রিজের গায়ে লাগে তখনই পোকার মত আটকে যায়। বিস্ময়ে শাসার চোখ সরে না। পুরো সকাল এভাবেই একটা থেকে আরেকটা বিশাল বড় বড় হলুদ ড্রামের পাশে ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দেয় শাসা।
সবশেষে ড. টুয়েন্টিম্যান জোনস এসে প্রত্যেকটা হীরেকে ওজন করে দেখেন। তারপর সাথে সাথে আবার চামড়ায় মোড়ানো খাতায় লিখে রাখেন সে হিসাব।
“তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ মাস্টার শাসা কোনো পাথরই হাফ ক্যারটের কম নয়।”
“হ্যাঁ স্যার”, ব্যাপারটা নিয়ে তো ভাবেইনি শাসা, “তাহলে ছোট পাথরগুলোর কী হয়?”
“গ্রিজের গায়ে আটকে থাকার জন্য ন্যূনতম একটা ওজন লাগে। অনেক সময় অনেক বড় বড় হীরেও কিন্তু নুড়ি পাথরের সাথে বেরিয়ে যায়। তাই হাত দিয়ে প্রতিটি পাথর চেক করে দেখতে হয়। এই কাজে অবশ্য মেয়েরাই ভালো। তাদের ধৈর্য আছে আর চোখও তীক্ষ্ণ।”
জোনস লম্বা একটা রুমে শাসাকে নিয়ে এলেন যেখানে পুরো রুম জুড়ে একটাই টেবিল; বালতি বালতি ভেজা পাথর এনে টেবিলের ওপর ফেলা হয়। আর নারী শ্রমিকরা তা থেকে হীরে বাছাই করে।
অতঃপর শিফট শেষে জোনসের সাথে ফোর্ডে চড়ে অফিস ব্লকে চলে এল। শাসা। কোলের ওপর রাখা ছোট্ট স্টিলের বাক্সটাতে রয়েছে আজ দিনের সংগ্রহ।
ওদের অপেক্ষাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সেনটেইন। জোনস আর শাসাকে নিজের অফিসে নিয়ে গেলেন। “তো, তোমার ভালো লাগেনি?”
শাসার কাছে জানতে চাইলেও ছেলের উত্তেজনা দেখে হেসে ফেললেন।
“অসাধারণ মা, আর দেখ আমরা কী এনেছি। ছত্রিশ ক্যারেট, কিমন দৈত্যকার একটা হিরে দেখেছো?!” টেবিলের ওপর বক্স রাখতেই ডালা খুলে দিলেন জোনস। শাসা এত গর্বভরে মাকে হিরেটা দেখাল যেন সে নিজ হাতে খনি থেকে তুলে এনেছে।
“সত্যিই বেশ বড় একমত হলেন সেনটেইন। “কিন্তু রঙটা তেমন নিখুঁত নয়। আলোর সামনে ধরে দেখো হুইস্কি আর সোডার মত বাদামি। ভেতরের কালো দাগগুলো তো খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে।”
শাসার আনা হিরের এত খুঁত বের হয়েছে দেখে মনমরা হয়ে গেল ছেলেটা। দেখে হেসে ফেললেন সেনটেইন, “ড, জোনস, ভল্টটা খুলবেন প্লিজ? ওকে কয়েকটা সত্যিকারের নিখুঁত হীরে দেখানো যাক।”
ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে একগোছ চাবি বের করে শাসাকে বারান্দার শেষ মাথার স্টিলের দরজার কাছে নিয়ে এলেন জোনস। তারপর তালা খুলে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডের ভল্টে। শাসার সামনেও পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে গোপন কম্বিনেশন নাম্বার ঘোরাতে ভুল করলেন না।
“ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড পাথরগুলোকে এসব পাত্রে রাখা হয়। এভাবে হাই গ্রেড় হিরেকে একেবারে আলাদা সযত্নে সংগ্রহ করা হয়।” স্ট্রংরুমে হাঁটতে গিয়ে দু’পাশে সারিবদ্ধ পাত্র দেখালেন জোনস।
এরপর ভল্টের ভেতরের দেয়ালের গায়ে লাগানো ছোট্ট স্টিলের দরোজাটা খুলে পাঁচ সংখ্যার বাদামি কাগজ মোড়ানো প্যাকেট তুলে নিলেন।
“এগুলোই হচ্ছে আমাদের শ্রেষ্ঠ হিরে।” শাসার হাতে প্যাকেট তুলে আবার একের পর এক দরজা আটকে উপরে উঠে এলেন দু’জনে।
সেনটেইন অফিসেই ছিলেন। শাসা এসে মায়ের হাতে প্যাকেট দিতেই খুলে ফেললেন।
আর বিশাল সব হিরের দ্যুতি দেখে শাসার রীতিমত দম বন্ধ হবার জোগাড়।
“মাই গড! মা! অবিশ্বাস্য!”
“চলো এবার ড, জোনসের কাছে এ সম্পর্কে কিছু শুনি।” স্মিত মুখে বসে রইলেন সেনটেইন।
“ওয়েল মাস্টার শাসা, এটা একেবারে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একটা হিরে যেটার আটটা কোনো আছে। আরেকটা আছে যেটার বারোটা মাথা। কিন্তু কতটা নিখুঁত গোল আর আকারহীন দেখেছো। তাই বুঝতে পারছো কতটা বিভিন্ন র ীতে আসে এই হীরে।” কয়েকটা হীরে দেখিয়ে শাসাকে বুঝিয়ে বললেন জোনস। কিন্তু তার নিজের বিষণ ভাব কেন যেন এতটা সম্পদ হাতে নিয়েও একটুও কমল না।
“তবে কেটে পলিশ করার পর এই তেলতেলে আভাটাও চলে যাবে।”
“এটার ওজন কত?” জানতে চাইল শাসা।
“আটচল্লিশ ক্যারট।” রিকোভারী বই দেখে জানালেন সেনটেইন।
“কিন্তু মনে রেখ, কেটে পলিশ করার পর কিন্তু এর এই ওজনের অর্ধেকও থাকবে না।”
“তখন এটার দাম কত হবে?” টুয়েন্টিম্যান জোনসের দিকে তাকালেন সেনটেইন।
“অনেক অনেক টাকা, মাস্টার শাসা।” সৌন্দর্যের পূজারিণী হিসেবে এর ওপর আর্থিক মূল্যের বোঝা চাপাতে পছন্দ করেন না জোনস; তাই আবার নিজের লেকচার শুরু করলেন, “এবার তোমাকে দেখাব কীভাবে পাথরের রঙের তুলনা
জানালার বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু সেদিকে কারো হুশ নেই। রুমের বাতি জ্বেলে দিলেন সেনটেইন। এভাবে আরো এক ঘণ্টা ধরে মনোযোগ সহকারে হিরের বিভিন্ন দিক বুঝিয়ে বললেন জোনস। শাসা নিজেও প্রশ্ন করে অনেক কিছু জেনে নিল। অতঃপর হিরেগুলোকে প্যাকেটে ভরে উঠে দাঁড়ালেন জোনস।
কী মনে হতেই সুউচ্চ কণ্ঠে আওড়াতে লাগলেন বাইবেলের পঙক্তি; খেয়াল হতেই আবার তাড়াতাড়ি ক্ষমা চেয়ে নিলেন বাকিদের কাছে, “ফরগিভ মি, আমার যে কী হয়েছে হঠাৎ করে।”
