“আমাকে বলতে চাইছে না?” ছেলের চেহারা দেখেই মনের ভাব আঁচ করে ফেলেছেন সেনটেইন।”
মাকে বললে কিছু হবে না। মনে হবে কোন আগন্তুককেই বলছি, আপন মনে খানিক ভেবে-চিন্তে গড়গড় করে মাকে সবকিছু উগরে দিল শাসা, “উপরের খাদের ভেতরে এক বুশম্যানের কংকাল আছে। তোমাকে দেখাব?”
বিবর্ণ হয়ে গেল সেনটেইনের চেহারা, “কী বললে? একটা বুশম্যান? কীভাবে জানলে যে বুশম্যানেরই কংকাল?” ফিসফিস করে জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“খুলির গায়ে এখনো চুল লেগে আছে, কিউয়ি আর ওর গোত্রের লোকদের মত চুল।”
“কীভাবে খুঁজে পেয়েছে এই জায়গা?”
“অ্যানা-” বলতে গিয়েও অপরাধবোধে চুপ করে গেল শাসা।
“মেয়েটা তোমাকে দেখিয়েছে?
“হ্যাঁ।” চোখ নামিয়ে নিল শাসা।
“আবার খুঁজে বের করতে পারবে?” ফিরে এল সেনটেইনের মুখের রঙ। আর কেমন যেন উত্তেজিতও হয়ে উঠল।
“হ্যাঁ বোধ হয় পারব। জায়গাটাতে চিহ্ন দিয়ে রেখেছি।” মুখ তুলে চূড়ার দিকে তাকিয়ে জানাল শাসা।
“চলো আমাকে নিয়ে যাও।” আদেশ দিলেন সেনটেইন।
“ঘোড়া রেখে পায়ে হেঁটে যেতে হবে কিন্তু।”
তবে উঠতে গিয়ে জান বের হয়ে যাবার দশা। প্রচণ্ড গরম আর কাঁটা ঝোপে লেগে ছিঁড়ে গেল হাত-পা।
খানিক বাদে মাতা-পুত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে খুঁজতে লাগল। শিস দিয়ে আর নাম ধরে ডেকে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখল যেন হারিয়ে না যায়।
হঠাৎ করেই শাসার ডাকে আর কোনো সাড়া দিচ্ছেন না সেনটেইন। ছেলেটা তো চিন্তায় পড়ে গেল।
“মা, তুমি কোথায়?
“এই তো! এখানে!” মনে হচ্ছে সেনটেইন ব্যথা পেয়েছেন।
গলার আওয়াজ অত্যন্ত অস্পষ্ট। তাড়াতাড়ি পাথর ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে গেল শাসা। সূর্যের আলোয় মাকে দেখে মনে হচ্ছে তার গায়ের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। মাথার টুপি খুলে কোমরের কাছে ধরে রেখেছেন। গাল দুটোও ভেজা। প্রথমে শাসার মনে হল ঘাম। কিন্তু না একটু পরেই বুঝতে পারল মা কাঁদছেন।
“মা?” আস্তে আস্তে মা’র পেছনে এসে দাঁড়াল শাসা। বুঝতে পারল মা মন্দিরটা খুঁজে পেয়েছেন।
ডালপালা কাঁচের জার সব সরিয়ে ফেললেন সিনটেইন। তাই দেখে ভয় পেল শাসা।
“অ্যানালিসা বলেছে এটা নাকি এক জাদুকরের কংকাল।”
কিছু না বলে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।
“অ্যানা আরো বলেছে এই জাদুকর নাকি সবার একটা করে ইচ্ছে পূরণ করে।”
“হানি” দম বন্ধ করে যেন নামটা উচ্চারণ করলেন সেনটেইন, “আমার অত্যন্ত প্রিয় বুড়ি মা।”
“মা!” সেনটেইন কাঁপতে থাকায় মায়ের কাধ ধরে দাঁড়াতে সাহায্য করল শাসা। “তুমি কীভাবে জানো?”
ছেলের বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেও কোনো উত্তর দিলেন না সেনটেইন।
“পুরো পাহাড়ের গুহায় হয়ত এমন আরো শত শত কংকাল আছে।” নাছোড়বান্দার মত তীব্র বেগে মাথা নাড়লেন সেনটেইন।
“এটা হানি।” দুঃখে কষ্টে বুজে আসতে চাইছে সেনটেইনের গলা। “এই তো উটের হাড়ের থেকে তৈরি পুঁতি লাগানো আছে পোশাকে।” এতক্ষণে ধুলার মাঝে অর্ধেক ঢেকে রাখা শুকনো চামড়ার ফালিটাকে দেখতে পেল শাসা। “আমার কোনো প্রমাণেরও দরকার নেই। কারণ আমি জানি ও হানি।”
“বসো মা।” মাকে ধরে পড়ে থাকা একটা পাথরের ওপর বসিয়ে দিল শাসা।
“আমি ঠিক আছি। আসলে হঠাৎ করে চমকে উঠেছি। বছরের পর বছর ধরে ওকে খুঁজেছি, জানতাম ওকে কোথায় পাওয়া যাবে।” চারপাশে মাথা ঘুরিয়ে কী যেন দেখলেন সেনটেইন, “ওয়ার দেহও নিশ্চয় এখানেই আশপাশে কোথাও আছে।” চোখ তুলে উপরের গির্জার ছাদের মত ঝুলে থাকা চূড়ার অংশের দিকে তাকালেন সেনটেইন,
“দুজনেই শয়তানটার বন্দুকের হাত থেকে বাঁচার জন্য বোধ হয় ওখানে এসে লুকিয়ে ছিল। একসাথেই নিচে পড়েছে।”
“কে ওদেরকে গুলি করেছে মা?” দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় সেনটেইন জানালেন, “লোথার। লোথার ডিলা রে!”
***
তারপর পুরো একঘণ্টা ধরে খাদের তলায় আর আশপাশে দ্বিতীয় কংকালের খোঁজ করল শাসা আর সেনটেইন। কিন্তু অবশেষে হাল ছেড়ে দিলেন, “নেই। থাক তাকে এভাবেই পড়ে থাকতে দাও শাসা, কেউ যেন বিরক্ত না করে।”
ছোট্ট পাথুরের মন্দিরটা থেকে নিচে নেমে এল দু’জনে। ফেরার সময় তুলে আনল বুনোফুল।
“প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছে দেহাবশেষ তুলে সুন্দরভাবে সমাধিস্থ করি।” মন্দিরের সামনে আবার হাঁটু গেড়ে বসে ফিসফিস করে জানালেন সেনটেইন, “কিন্তু হানি তো খ্রিস্টান নয়। এই পাহাড়ই তাঁর পবিত্র ভূমি। এখানেই সে শান্তিতে থাকবে।”
যত্ন করে ফুলগুলোকে সাজিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন।
“তোমাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে আমি সে ব্যবস্থা করব প্রিয়তম মাতামহ। আবার তোমার কাছে আসব।” শাসার হাত ধরলেন সেনটেইন। একসাথে উঠে এসে বসলেন নিজ নিজ ঘোড়ার পিঠে।
***
পরের দিন সকালবেলা নাশতার সময় মোটামুটি সহজ হয়ে গেলেন সেনটেইন। যদিও চোখের নিচে অনিদ্রার গাঢ় কালি লেগে আছে; ছেলেকে জানালেন, “কেপটাউনে ফেরার আগে এটাই এখানে আমাদের শেষ সপ্তাহ।”
“ইশ, এখানেই যদি থেকে যেতে পারতাম।”
“এটা তো বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। কিন্তু তোমাকে তো স্কুলে যেতে হবে। আর আমারও অনেক দায়িত্ব আছে। তবে আমরা আবার ফিরে আসব, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। এই শেষ সপ্তাহে তুমি ওয়াশিং প্লান্ট আর সেটিং রুমে কাজ করবে। দেখো বেশ ভালো লাগবে।”
