হঠাৎ করেই একেবারে কাছ থেকে মাটি খুঁড়ে যেন উদয় হল এক বুশম্যান। আচানক এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠল স্ট্যালিয়ন। লোকটার গায়ে কেবল এক টুকরো পশুর চামড়ার পোশাক। আকারে ছোটখাটো হলেও দেহের গড়ন একেবারে নিখুঁত।
মাথা উঁচু করে এগিয়ে এল মঙ্গোলিয়ানদের মত কুতকুতে চোখ আর উজ্জ্বল আম্বার রঙা বুশম্যান পুরুষ। ডান হাত তুলে অভিবাদনের ভঙ্গি করে প্রায় পাখির মত কিচির-মিচির করে বলে উঠল “আমি তোমাকে দেখেছি নাম চাইল্ড।” নামটা শুনেই আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন সেনটেইন,
“আমিও তোমাকে দেখেছি কিউয়ি!”
“তোমার সাথে ও কে?” জানতে চাইল বুশম্যান।
“আমার ছেলে গুড ওয়াটার। তোমাকে বলেছিলাম না, ও এখানেই জননছে। ওয়া ওর পিতামহ আর হানি মাতামহ।”
শূন্য মরুভূমির দিকে তাকিয়ে সজোরে সবাইকে ডাক দিল কিউয়ি, “স্যানের মানুষেরা সত্যিই তাই। এই নারীর নাম চাউন্ড, আর ছেলেটা তো সেই কিংবদন্তী, ওদেরকে অভিবাদন জানাও।”
শুষ্ক মাটির বুক থেকে উদয় হল খর্বকায় সোনালি সব দেহ। কিউয়িসহ মোট বারোজন হাসতে হাসতে পিলপিল করে এগিয়ে এল। ঘোড়া থেকে নেমে সবার সাথে আলিঙ্গন করলেন সেনটেইন। প্রত্যেককে নাম ধরে ডেকে সম্ভাষণ জানিয়ে সবশেষে দুটো বাচ্চাকে দুই কোমরের উপর নিয়ে আদরও করলেন।
“তুমি ওদেরকে এত ভালোভাবে কীভাবে চেন মা?” অবাক হয়ে জানতে চাইল শাসা।
“কিউয়ি আর ওর ভাই ওয়ার আত্মীয়, তুমি ছোট থাকতেই ওদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। তারপর সবাই মিলে গড়ে তুলেছি হানি খনি, এটা ওদের শিকারের এলাকা।”
এভাবেই কেটে গেল বাকি দিন। ফেরার সময় হাত মুঠো করে সেভেন এম এমের পিতলের কার্টিজ বুশম্যান নারীদের বিলিয়ে এল সেনটেইন। যেন নেকলেসে লাগাতে পারে; যা তাদেরকে অন্যান্য স্যান নারীদের চোখে ঈর্ষার পাত্রী করে তুলবে। শাসা কিউয়িকে নিজের হান্টিং নাইফটা দিয়ে দিল। কিউয়ি তো বেশ খুশি।
কিউয়ির ভাই ফ্যাট কিউয়ি পেল সেনটেইনের বেল্ট। চকচকে পিতলের বাকলে নিজের চেহারার প্রতিবিম্ব দেখে তো মুগ্ধ মোটা কিউয়ি।
আসার সময় চোখ ঘুরিয়ে পেছনে নৃত্যরত ক্ষুদে মানুষগুলোকে দেখে শাসা ভাবল,
“আহারে ওরা কত অল্পতে খুশি হয়।”
“ওরা হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।” সেনটেইন বলে উঠলেন, “কিন্তু জানি না কতদিন থাকবে।”
“তুমি কখনো এভাবে থাকার চেষ্টা করেছিলে মা?” জানতে চাইল শাসা, সত্যিই কি চামড়ার পোশাক পরতে? শিকড়-বাকড় খেতে?”
“তুমিও তাই করেছিলে শাসা। মাঝে মাঝে ক্ষুদে বামনগুলোর মত গায়ে কিছুই রাখতে না।”
চোখ কুঁচকে কী যেন ভাবার চেষ্টা করল শাসা; তারপর বলল, “মাঝে মাঝে আমার খুব অন্ধকার, পানির গুহার মত একটা জায়গার কথা মনে পড়ে।”
“সেটাই হল উষ্ণপ্রস্রবন, যেখানে আমরা গোসল করতাম আর ওখানেই হানি মাইনের প্রথম হিরেটা পেয়েছি।”
“আমি আবার ওখানে যেতে চাই মা।”
“কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।” মায়ের মুড বদলে যেতে দেখল শাসা, “ঝরনাটা হানি পাইপের একেবারে মাঝখানে। মাটি খুঁড়তে গিয়ে আমরা ঝরনাটাকে নষ্ট করে ফেলেছি।” খানিকক্ষণ দু’জনেই নীরব হয়ে রইল। “জায়গাটা ম্যানের জনগণের জন্যে পবিত্র ভূমি হলেও অদ্ভুত ব্যাপার হল আমাদের পরিকল্পনাতে কিন্তু ওরা বাধা দেয়নি।” খুলে বললেন সেনটেইন।
“অনেক আগেই এ ব্যাপারে কিউয়ির সাথে কথা বলে নিয়েছি। তার মতে গোপন জায়গাটা তাদের নয়। এখানে যে আত্মা বাস করে সে-ই তাদের আপন কিন্তু বহু আগেই হয়ত বিরক্ত হয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে সেই আত্মা; তাই এখন আর এতে তাদের কোনো আক্ষেপ কিংবা আপত্তি নেই।”
“তুমি যে কখনো মানের মেয়েদের মত জীবন কাটাতে আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না মা।”
“ব্যাপারটা সত্যিই বেশ কঠিন।” নরম স্বরে জানালেন সেনটেইন, কিন্তু সেই কষ্ট ছাড়া আজকের আমি হতে পারতাম না। তুমি জানো শাসা। মরুভূমির বুকে আমি যখন সহ্যের একেবারে শেষ সীমায় চলে গিয়েছিলাম তখন একটা শপথ করেছি; আর তা হল আমার ছেলে কখনো অভাবে পড়বে না। আমি শপথ নিয়েছি যে ভয়ংকর দিনগুলো আর কখনো আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনব না।”
“কিন্তু তখন তো আমি তোমার সাথে ছিলাম না।”
“হ্যাঁ ছিলে” মাথা নাড়লেন সেনটেইন, “তোমাকে গর্ভে নিয়েই আমি স্কোলিনি কোস্টে গিয়েছি। আর উপকূলের বার্লি বাড়িতে তুমি আমার অংশ হয়েই ছিলে। আমরা এই মরুভূমির সৃষ্টি ডালিং তাই সবাই যখন ব্যর্থ হবে আমরা তখন কেবল সমৃদ্ধির পথেই এগোব। কথাটা মনে রেখো শাসা ডার্লিং।”
৩. সকালবেলা ক্যাম্প গুটিয়ে
পরের দিন সকালবেলা ক্যাম্প গুটিয়ে রাখার জন্য পরিচারকদের রেখে বিরস বদনে নিজ নিজ ঘোড়ায় চেপে মাইনের পথ ধরল শাসা আর তার মা। দুপুরে খানিক কাটা ঝোঁপের নিচে বিশ্রাম নিলেও ক্রমেই সূর্যের তাপ বেড়ে যাওয়ায় ঘোড়া নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে চলে এল দুজনে।
হঠাৎ করেই সিধে হয়ে বসে হাত দিয়ে চোখের ওপর ছায়া বানিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকাল শাসা।
“কী হয়েছে সোনা?”
অ্যানালিসা ওকে এই পাথুরে খাদের ভেতরেই নিয়ে এসেছিল।
“কিছু একটা তোমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।” সেনটেইনের কথা শুনেই শাসার মন চাইল মাকে পাহাড়ে দেবতার মন্দিরে নিয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটার কাছে করা শপথের কথা মনে হতেই আবার থেমেও গেল।
