“ওহ, শাসা, আমার নিজেকে ঠিক স্কুল গার্লদের মত মনে হচ্ছে। আগামী দুদিন পুরোপুরি নিজেদের মত করে কাটানো যাবে।”
“দেখো তোমার আগে ওই ঝরনার ধারে যাব।” মাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল শাসা। কিন্তু মেঘের সাথে পাল্লা দেবার ক্ষমতা প্রিস্টর জনের নেই। তাই ঝরনার ধারে পৌঁছে দেখা গেল স্ট্যালিয়ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেনটেইন।
ছেলে দুজনেই ঘোড়ায় চড়ে ঢুকে গেল কালাহারির একেবারে বুনো এলাকার গভীরে। স্যান-এর বুশম্যানদের কাছে প্রশিক্ষিত সেনটেইন এখনো সব কৌশল মনে রেখেছেন। তাই সব অরণ্যের গভীরে টিকে থাকার সমস্ত রহস্যই তার জানা আছে।
দুপুরের ঠিক পরপরই দিগন্তে দেখা গেল একপাল জেমসবক। এক সারিতে হাঁটতে থাকা জন্তুগুলোর উন্নত মাথা আর লম্বা শিং দেখে দূর থেকে মনে হচ্ছে ইউনিকর্ন।
অতঃপর সূর্য যখন মরুভূমির গভীরে ডুবে যেতে বসেছে একপাল স্প্রিংবক দেখলেন সেনটেইন। ছেলেকে বললেন, “আমাদের ক্যাম্প আর মাত্র আধ মাইল দূরে আছে। ডিনার রেডি করা দরকার।”
সাগ্রহে নিজের ম্যানলিচার তুলে নিল শাসা। “সাবধানে, একেবারে পরিষ্কার হওয়া চাই।” ছেলেকে সাবধান করে দিলেন সেনটেইন।
পিছনে দাঁড়িয়ে শাসাকে ঘোড়া থেকে নামতেও দেখলেন। হরিণের পালের কাছে থেকে দুইশ কদম দূরে গিয়ে উবু হয়ে বসল শাসা। তারপর কনুই দুটো হাটুর ওপর রাখল। আর সাথে সাথেই একটা হরিণকে পড়ে যেতে দেখে স্বস্তি পেলেন সেনটেইন। এর আগে একবার এমনভাবেই অনিন্দ্যসুন্দর এক হরিণকে গুলি করেছিলেন লোথার ডি লা রে। মনে পড়ে গেল সেই স্মৃতি।
স্যার গ্যারি যেভাবে শিখিয়েছেন ঠিক সেভাবেই জন্তুটার কাঁধের পিছনে গুলি লাগাতে পেরেছে শাসা। কাঁধের পেছনে লেগে মোটা হৃৎপিণ্ডে চলে গেছে বুলেট। প্রিস্টর জনের কাঁধে তুলে দেয়া হল গোটা হরিণ। আরামদায়ক আর নিরাপদ ক্যাম্পটাতে গতকালই পৌঁছে গেছে তিনজন পরিচারকের দল।
রাতের বেলা স্প্রিংকের গ্রিলড কাবাব দিয়ে ডিনার সারল মা আর ছেলে। তারপর ক্যাম্পফায়ারের কাছে বসে বহু রাত অব্দি কফি হাতে গল্প করল দুজনে।
পরের দিন সকালবেলা শীত পড়াতে গায়ে ভেড়ার চামড়ার জ্যাকেট পরে নিলেন সেনটেইন আর শাসা, আর তারপর যে যার ঘোড়ায় চেপে শুরু হল যাত্রা। মাইলখানেক এগোবার পরেই মেঘের লাগাম টেনে ধরে মাটির দিকে তাকালেন সেনটেইন।
“কী হয়েছে মা?” মায়ের মুড় সম্পর্কে সদা সচেতন শাসার চোখে পড়ল সেনটেইনের উত্তেজিত চাহনি।
“তাড়াতাড়ি এসো।” তারপর নরম মাটিতে পায়ের ছাপ দেখিয়ে জানতে চাইলেন, “বলো তো কী?”
ঘোড়া থেকে নেমে উপুড় হয়ে পরীক্ষা করে দেখল শাসা। “মানুষ?” দ্বিধায় পড়ে গেছে,
“কিন্তু বেশ ছোট তো। বাচ্চা?” চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতেই বাকিটা বুঝে গেল।
“বুশম্যান!” সহাস্যে চিৎকার করে উঠল শাসা, “বুনো বুশম্যান।”
“হুম, ঠিক তাই।” সেনটেইনও হেসে ফেললেন।” একজোড়া শিকারি জিরাফের পেছনে লেগেছে দেখো!”
“আমরা ওদের পিছু নিতে পারি না মা? প্লিজ?” এবার শাসাও মায়ের মতই উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।
“ঠিক আছে। পায়ের ছাপগুলো মাত্র একদিনের পুরনো, তাই তাড়াতাড়ি করলে ধরে ফেলা যাবে।” সম্মত হলেন সেনটেইন।
“দেখো একটা বুশম্যানের টুথব্রাশ।” তরতাজা গাছের ছোট একটা ডাল তুলে দেখালেন সেনটেইন। জিরাফের পায়ের ছাপের কাছেই পড়ে আছে চিবানো ডালটা।
“তার মানে এখানেই জিরাফটাকে প্রথম দেখেছে।”
“তুমি কীভাবে বুঝলে?”
“ওই তো ওদের ধনুকের চিহ্ন।”
“দেখো শাসা, ওরা এখান থেকে দৌড়াতে শুরু করেছে। যদিও শাসা ছাপ দেখে কিছু বুঝল না। সেনটেইন বলে চললেন, “শরীরের সমস্ত ভার বুড়ো আঙুলের ওপর দিয়ে শক্ত পায়ে এগিয়েছে সামনের দিকে। তারপর কয়েকশ কদম সামনে গিয়ে আবার ব্যাখ্যা করে বললেন, “এবার দেখো পেটের উপর ভর দিয়ে সাপের মত এগিয়েছে। তারপর ওখানে হাটু গেড়ে বসে তীর ছুঁড়েছে।” আরো বিশ কদম গিয়ে তো সেনটেইন মহাখুশি হয়ে উঠলেন, “দেখো এখানে এসে জিরাফ ফাঁদ বুঝতে পেরেছে। তারপর লাফ দিয়ে সরে গেছে, আরে দেখো শিকারিরাও পিছু পিছু দৌড়ে তীরের প্রভাব দেখার চেষ্টা করেছে।”
ছাপ দেখে দেখে খানিক দৌড়ে যাবার পর আচমকা ঘোড়র ওপর সিধে হয়ে বসলেন সেনটেইন।
“শকুন!”
চার থেকে পাঁচ মাইল সামনে নীলাকাশ জুড়ে দেখা গেল কালো ফুটকির মেঘ। মাটি থেকে অনেক উপরে আস্তে আস্তে উড়ে বেড়াচ্ছে শকুনের পাল।
“এবার একটু ধীরে ধীরে যেতে হবে, শাসা।” ছেলেকে সাবধান করে দিলেন সেনটেইন। “ওদেরকে ভয় পাইয়ে দিলে কিন্তু ব্যাপারটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।”
ঘোড়ার গতি হন্টনের পর্যায়ে নামিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন মা আর ছেলে।
খানিক দূরেই পড়ে আছে জিরাফের বিশাল মৃতদেই। আশপাশের ছোট ছোট কাটা ঝোঁপগুলোর ওপরে ঝুলছে মাংসের স্তূপ, জিরাফের নাড়ি-ভুড়ি। সূর্যের তাপে শুকানোর জন্যই এই ব্যবস্থা। ওজনের ভারে নুইয়ে পড়েছে ঝোঁপের ডালপালা। আর সর্বত্র চড়ে বেড়াচ্ছে বুশম্যানদের পায়ের ছাপ।
“মাংস কাটা আর বহন করার জন্য নারী আর শিশুদের কেউ নিয়ে এসেছে।” খর্বকায় বুশম্যানদের দেখে বলে উঠলেন সেনটেইন।
“ইয়াক। বিদঘুটে গন্ধ আসছে।” নাক কুঁচকালো শাসা, “কিন্তু ওরা কোথায়?”
“লুকিয়ে আছে।” জানালেন সেনটেইন, “মনে হয় পাঁচ মাইল দূর থেকেই আমাদেরকে আসতে দেখেছে।” তারপর মাথা থেকে চওড়া কানঅলা টুপিটা খুলে ফেললেন যেন তার চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এরপর অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলে চারপাশে ছড়িয়ে দিলেন নিজের মেসেজ।
