কী ঘটতে পারে ভেবে কেঁপে উঠল শাসা।
“অবাধ্য হওয়াটাই খারাপ। তুমি যেটা করেছে তা ক্ষমা করারও অযোগ্য?”
“গাধার মত কাজ করেছ বুঝেছো?” বলেই চললেন সেনটেইন, “হদার মত ধরা পড়েছে। এটাই হল সবচেয়ে বড় অপরাধ।”
“খনির প্রত্যেকে এখন তোমাকে নিয়ে হাসবে। নিজেকে যদি এতটা সস্তা দরের করে ফেলে তাহলে আদেশ আর নেতৃত্ব দেবে কীভাবে?”
“আমি এতটা ভেবে দেখিনি মা। ব্যাপারটা এমনিই ঘটে গেছে।”
“ওয়েল, এবার ভাবো তাহলে,” জানালেন সেনটেইন, “হাফ বোতল ডিটারজেন্ট মেখে গোসল করার সময় ভেবো। গুড নাইট।”
“গুডনাইট মা।” মায়ের দিকে এগিয়ে এল শাসা। খানিক ভেবে গাল পেতে দিলেন সেনটেইন। মাকে কিস করে শাসা জানাল, “সরি মা, আমার জন্যে তোমাকে এত লজ্জায় পড়তে হল।”
মন চাইল ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু কিছু না করে শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন সিনটেইন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল শাসা।
হঠাৎ করেই বহু বছর বাদে মদের নেশা অনুভব করলেন সেনটেইন। দ্রুত বিশাল কেবিনেটের কাছে গিয়ে ঢকটক করে মুখ ভর্তি ক্যানকে খেয়েও শান্তি হল না। ধপ করে চেয়ারের উপর বসে পড়তেই মনে হল শেষ হয়ে যাবেন। নিজেকে বড় তুচ্ছ, শূন্য মনে হল।
“ব্যাপারটা ঘটেছে।” আপন মনেই ফিসফিস করলেন সেনটেইন, “নোংরা বেশ্যা মেয়েটা তৈরি হবার আগেই বের করে এনেছে এ রাক্ষস।”
“ওহ! মাই বেবি, মাই ডার্লিং” মনে হচ্ছে যেন নিজের কোনো একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছেন।
এই একাকিত্ব বুঝি কেউ আর গোছাবার নয়। কেননা মাইকেল কোর্টনি আর লোথার ডিলার দু’জনেই এখন তার কাছে মৃত।
চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার কাছে এগিয়ে গেলেন সেনটেইন। একদৃষ্টে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন, “আমি বুঝি আমার ছোট্ট সোনাটাকে হারাতে বসেছি। এরপর একদিন আরো একা, বুড়ি আর দেখতে জঘন্য হয়ে যাবো” ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠলেন সেনটেইন।
কিন্তু না; অন্ধকার আর নৈঃশব্দে মোড়ানো বাড়িটার ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজেকে দিয়ে করালেন ইস্পাত-কঠিন প্রতিজ্ঞা “যে পথ বেছে নিয়েছি সেখানে দুর্বলতার কোনো স্থান নেই। ফিরে আসা নেই। এভাবেই শেষপর্যন্ত এগিয়ে যেতে হবে।
***
লাঞ্চের সময় স্টোফেলকে খুঁজল শাসা। “আসেনি কেন ছেলেটা?”
ওর প্রশ্ন শুনে সুপারভাইজার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “কে জানে? শুধু মেইন। অফিস থেকে নোট পেয়েছি যে ও আসবে না। হয়ত চাকরি চলে গেছে। যাই হোক, শয়তানটাকে নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। নিজের ভেতর অপরাধবোধের কাঁটা টের পেল শাসা।
যাই হোক বিকেলে কাজ সেরে প্রিস্টর জনের উপর চেপে বসল। গন্তব্য অ্যানাদের বাসা। জানে এতে করে মায়ের হাতে ঝাড়ি খেতে হবে, কিন্তু ভেতরে কেমন যে একরোখা জেদ চেপে বসল। দেখা গেল ওর জন্য তাদের কতটা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু মিল হাউজের গেইটে ওর গতি রোধ করা হল।
উইদারিং গ্রাউন্ডের বস বয়, মোজেস এগিয়ে এসে প্রিস্টর জনের মাথায় হাত বুলিয়ে শাসাকে বলল, “আমি তোমার বই নিয়ে এসেছি।” মোটা মোটা হিস্ট্রি অব ইংল্যান্ড শাসার হাতে ধরিয়ে দিল মোজেস।
“তুমি বোধ হয় বই পড়োনি” তাড়াতাড়ি ওকে বাধা দিল শাসা, “এত দ্রুত তো শেষ হবার কথা নয়। আমার তো কয়েক মাস লেগে যায়।”
“আমি এটা আর পড়ব না। আসলে হানি মাইনও ছেড়ে যাচ্ছি। কাল সকালে ট্রাকে চেপে উইন্ডহক চলে যাব।”
“ওহ, নাহ!” তাড়াতাড়ি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল শাসা, “কেন চলে যাচ্ছো মোজেস?”
“এসব আসলে আমার হাতে নেই।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল লম্বা মোজেস, “কাল সকালে ট্রাকে অনেকেই চলে যাচ্ছে। জলা মানে জোনস্ বাছাই করেছে এদের সবাইকে। আর তোমার মা ছাঁটাইয়ের কারণ জানিয়ে আমাদেরকে এক মাসের পারিশ্রমিকও দিয়েছে।” তিক্তভাবে হাসল মোজেস, “এই নাও তোমার বই।”
“রেখে দাও। এটা আমার তরফ থেকে তোমার জন্য উপহার।” বইটা ফিরিয়ে দিল শাসা।
“ঠিক আছে। তোমার স্মৃতি হিসেবে রেখে দিলাম। ভালো থেকো।” অন্যদিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করল মোজেস।
“মোজেস-” পেছন থেকে ডাক দিলেও কী বলবে ভেবে পেল না শাসা। কেবল নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। কিন্তু পিছিয়ে গেল ওভাম্বো। একজন শ্বেতাঙ্গ আর একজন কৃষ্ণাঙ্গ কখনো করদর্শন করতে পারে না।
“ভালো থেকো।” হাল ছাড়ল না শাসা। ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকিয়ে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল মোজেস, ওর হাত এত ঠাণ্ডা শাসার অবাক লাগল ভেবে বুঝি সব কৃষ্ণাঙ্গেরই এমন হয়।
“আমরা তো বন্ধু, তাই না?” অনুনয় ঝরল শাসার কণ্ঠস্বরে।
“জানি না,” উত্তর দিল মোজেস।
“মানে?”
“জানি না আমাদের পক্ষে বন্ধু হওয়া সম্ভব কিনা।” আস্তে করে নিজের হাত ছাড়িয়ে অন্যদিকে ঘুরে গেল মোজেস। শাসার দিকে একবারও না তাকিয়ে চলে গেল কম্পাউন্ডের দিকে।
***
সমতল পথ ধরে এগিয়ে চলেছে মাইন থেকে আসা ট্রাকের কনভয়। পরস্পরের সৃষ্ট ধুলা থেকে বাঁচার জন্য নিজেদের মাঝখানে অবশ্য যথেষ্ট দূরত্ব রেখেছে প্রতিটি ট্রাক, শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ উভয় পক্ষেরই চাকরিচ্যুত হতভাগ্য পরিবারসমূহ সমস্ত মালপত্রসহ ট্রাকে চড়ে চলেছে শহরের উদ্দেশে।
একদিন বয়সী চাঁদটার আলোয় গলিত প্লাটিনামের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা মরুভূমি, খুব কাছেই কোথাও ডেকে উঠল একজোড়া শিয়াল, ক্যাম্পে চুলার খাবারের ঘ্রাণে বুনো হয়ে উঠেছে জম্ভ দুটো।
