তাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “আপনিই জানেন কোনটা ভালো হবে।” মনে মনে ভাবল, “মা, মা-কে বলতে হবে। ইশ, যদি আমি নিজেই ঠিক করতে পারতাম যে কী করা হবে!” তারপরেই খেয়াল হল মা বোধ হয় ক্ষমতা বলতে এটাকেই বুঝিয়েছে।
“ক্ষমতা” আপন মনেই বিড়বিড় করল শাসা, “একদিন আমার ক্ষমতা হবে, অনেক ক্ষমতা।”
***
মিল হাউজের কাজটা আরো বেশি ইন্টারেস্টিং। বিশাল বিশাল মেশিনগুলো বেশ শক্তিশালীও বটে। এখানে ওয়াশিংগিয়ারের জন্য আকরিকগুলোকে একটা সঠিক আকারে ভেঙে ফেলা হয়। প্রতি ঘন্টায় একশ পঞ্চাশ টন আকরিক নির্দিষ্ট সাইজে ভেঙে পড়ে।
অ্যানার ভাই স্টোফেলকে শাসার দায়িত্ব দেয়া হল। আর এতে তো ছেলেটা মহা খুশি।
“রোলারের সেটিংস করার সময় তোমাকে কিন্তু বেশ সতর্ক থাকতে হবে। নয়ত এত সাধের হিরে চূর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে গুড়ো পাউডার হয়ে যাবে!” গম্ভীর মুখে সদ্য প্রাপ্ত কর্তৃত্ব ঝরল স্টোফেল।
“চলো শাসা তোমাকে গ্রিজ পয়েন্ট দেখাই। প্রতি শিফটের শুরুতেই সমস্ত পয়েন্টে গ্রিজ লাগানো হয়।” গর্জনরত রোলারের নিচে ঢুকে চিৎকার করে শাসাকে জানাল, “গত মাসে এক শ্রমিক বিয়ারিংয়ের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আর যায় কোথায়, মুরগির পাখনার মত ছিঁড়ে গেছে বেচারার হাত। কত রক্ত যে গেছে তুমি যদি দেখতে!”
দুপুরবেলায় লাঞ্চের বাঁশি শুনে মিল হাউজের ওপাশে শেড দেয়া ঘরে চলে এল শাসা আর স্টোফেল। ওয়ার্কম্যানদের নীল ওভারঅল গায়ে দিয়ে ঘুরছে, লাঞ্চবক্স খুলে স্টোফেলের সাথে খোলামেলাভাবে খেতে বসেছে; সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বোধ করল শাসা। এ ক’দিনে বয়স যেন কয়েক বছর বেড়ে গেছে।
নিজের খাবার থেকে স্টোফেলকেও সাধল শাসা। কিন্তু ছেলেটা প্রত্যাখ্যান করে বলল, “নো ম্যান। ওই তো আমার দিদি লাঞ্চ নিয়ে আসছে।” হঠাৎ করেই বাংলো থেকে আনা চিকেন, স্যান্ডউইচ আর জ্যাম রোল শাসার কাছে অখাদ্য বলে ঠেকল।
মিল হাউজের গেইট দিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে সাইকেল চালিয়ে ভেতরে এল অ্যানা। উন্মাতাল বাতাস এসে এলোমেলো করে দিল মেয়েটার পোশাক। ফলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যৌবনোদ্দীপ্ত ভরা বুক।
মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল শাসা। ভাইয়ের পাশে ওকে বসে থাকতে দেখে অ্যানার অভিব্যক্তিও বদলে গেল।
“লাঞ্চে কী এনেছে লিসা?” জানতে চাইল স্টোফেল।
“সসেজ আর ম্যাশ।” ভাইয়ের হাতে ক্যানটিন তুলে দিল অ্যানা, “সবসময় যা আনি।”
অ্যানার হাত-কাটা ড্রেসের নিচে শাসার চোখে পড়ল মেয়েটার বাহুমূলের কেশ।
“ধুর, রোজ রোজ সসেজ আর ম্যাশ,” সত্যিই বিতৃষ্ণা বোধ করল স্টোফেল।
“পরেরবার মাকে বলব স্টেক আর মাশরুম রান্না করতে।” শাসা বুঝতে পারল যে ও হাঁ করে তাকিয়ে আছে; কিন্তু চোখ নামাতেও পারছে না। মেয়েটা অবশ্য সরাসরি ওর দিকে এখনো একবারও তাকায়নি।
“তুমি চাইলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারো” স্টোফেলকে প্রস্তাব দিল শাসা।
“চলো তাহলে আজ অদল-বদল করে খাই।” শাসার প্রস্তাব লুফে নিল স্টোফেল। আর ওর বাড়িয়ে ধরা ক্যানটিনের মধ্যে শাসা দেখল পাতলা তেলতেলে ঝোলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে একতাল আলু ভর্তা।
“আমার ক্ষুধা পায়নি প্রথম বারের মত অ্যানার সাথে কথা বলল শাসা। “তুমিও একটা স্যান্ডউইচ খাও অ্যানালিসা?”
কোমরের ওপর নিজের স্কার্টটাকে ঠিকঠাক করে বুনো বিড়ালের মত তাকাল অ্যানা। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমির হাসি।
“যখন আমি তোমার কাছ থেকে কিছু চাইব শাসা কোর্টনি তখন ঠিক
বেই শিষ দেব” বলে ঠোঁট দুটোকে গোল করে সাপুড়ের মত বাঁশি দিয়ে আঙুলে গোপন এক ইঙ্গিত করল অ্যানা।
হাসতে হাসতে শাসার হাতে ঘুসি বসিয়ে দিল স্টোফেল, “তুমি এবার শেষ, বাছা?”
লজ্জায় বেগুনি হয়ে বসে রইল শাসা। নিজের সাইকেল নিয়ে চলে গেল আনা; কিন্তু ইচ্ছে করে এমনভাবে পেডাল চাপল যে নড়ে উঠল গোলাকার পশ্চাৎদেশ।
সেদিন সন্ধ্যায় ঘোড়া প্রিস্টর জনকে নিয়ে আবার পাইপ লাইনের ধারে এল শাসা। আশা নিয়ে এলেও ভাবছে যদি মেয়েটা না আসে। তাই আচমকা ওকে পাইপ লাইন খাড়া রাখার পিলারের কাছে দেখে চমকে উঠল শাসা।
“আমার হাত ধরো” শাসাকে প্রস্তাব দিল অ্যানা। তারপর উঠে এল প্রিস্টরের কাঁধে, শাসার পাশে। “বাম দিকে যাও।” রাস্তা দেখিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে। এভাবেই নিঃশব্দে কেটে গেল দশ মিনিট।
খানিক বাদে পাথুরে ছাওয়া ঢালের কিনারে এসে নিচে নেমে গেল অ্যানা।
“হেই নিচে যেও না। ব্যথা পাবে” সাবধান করে দিল শাসা। কিন্তু মেয়েটা শুনল না। নিচে নামতে গিয়ে হাঁফ ছাড়ল ছেলেটা। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল মাথার উপর সুউচ্চ টাওয়ারের মত দুলছে পাহাড়ের চূড়া।
“চলো তোমাকে গোপন একটা জিনিস দেখাচ্ছি কিন্তু শপথ করো যে কাউকে বলবে না। ঠিক আছে।”
“ওকে। শপথ করে বলছি কাউকে বলব না।” সম্মত হল শাসা।
পাথরের একগাদা বড় বড় চাইঅলা একটা স্থানে শাসাকে নিয়ে এল অ্যানা। এখানে গাছের ডাল সরাতেই পাওয়া গেল একটা ফোকর। দেখা গেল মেঝেতে বেশ কয়েকটা কাঁচের জার পড়ে আছে। কিন্তু শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে ভেতরে রাখা বুনোফুল। এর পেছনে সাদা হাড়ের তৈরি ছোট্ট একটা পিরামিড যেটার একেবারে চূড়ায় একটা নরকংকাল।
“কে?” খানিকটা ভয় পেয়ে গেল শাসা।
