“একশ’ টন উইন্ডিং গিয়ারে একেকবারে ষাট বার পর্যন্ত আকরিক লোড করা যায়। আমাদের টার্গেট হল প্রতি শিফটে ছয়শ’ বার লোড করা।”
মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে শাসা। জানে মা সন্ধ্যাবেলায় নির্ঘাৎ প্রশ্ন করবে। কিন্তু অন্ধকার আর গানের সুরে মনোসংযোগ খানিকটা নষ্টও হচ্ছে। হঠাৎ করেই সামনের কয়েন সাইজের উজ্জ্বল আলোর বিন্দুটা বড় হতে হতে টানেলের শেষ মাথায় এত আলোকিত হয়ে উঠল যে, মনের অজান্তেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শাসা। ওয়েল্টেভ্রেদেনে মায়ের ডেস্কে ছবি দেখলেও বাস্তবে জায়গাটা এত বিশাল হবে শাসা কল্পনাও করেনি।
পাহাড়ের মাঝখানে পুরোপুরি নিখুঁত গোলাকার একটি গর্ত পাশে ককপিটের মতই ধূসর পাথরের গোলাকার দেয়াল। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি বাঁক হয়ে এগিয়ে যাওয়া ট্র্যাক ধরে পুরো দুইশ ফুট নিচের খনন ক্ষেত্রের মেঝেতে নেমে এল সকলে। দু’পাশে তাকিয়ে শাসার নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড়।
টুয়েন্টিম্যান জোনস এখনো লেকচার দিয়ে চলেছেন, “এটা অগ্যৎপাতের ফলে সৃষ্ট একটা পাইপ। পৃথিবীর সূচনালগ্নে এই গর্ত দিয়েই উপরে উদৃগিরিত হতে উত্তপ্ত লাভা। সূর্যের কাছাকাছি তাপমাত্রা আর বিশাল চাপে পরবর্তীতে লাভা থেকেই গড়ে উঠেছে হিরে।” সমানে মাথা ঘুরিয়ে এক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত খনির বিশালতু মাথায় ধারণ করার চেষ্টা করছে শাসা।” টুয়েন্টিম্যান বলে চললেন, “তারপর পাইপের নিচের গভীরের ম্যাগমা ঠাণ্ডা হয়ে জমে যায়। তো উপরের লেয়ার যেটা বাতাস আর সূর্যের কাছাকাছি এসেছে তা অক্সিডাইজড হয়ে পরিণত হয় “ক্লাসিকাল ইয়েলো গ্রাউন্ড”। এখানে এগারো বছর ধরে কাজ করার পর মাত্র সেদিন আমরা “রু গ্রাউন্ডে” এসে পৌঁছেছি। আর বুঝতেই পারছো এটাই হল সেই গভীরের ম্যাগমা যা শক্ত হয়ে হিরেতে পরিণত হয়েছে।”
ট্রাক থেকে লাফিয়ে নিচে নামল সবাই।
“আমাদের কাজ একেবারেই সোজাসাপ্টা।” বলে চললেন জোনস, “সূর্যের প্রথম রশির সাথে সাথে শুরু হয় নতুন শিফট। গত সন্ধ্যার বিস্ফোরণ দিয়েই এদের কাজের সূচনা হয়। প্রথমেই মেঝের ভাঙা অংশ উপরে পাঠিয়ে তারপর ড্রিল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে চার্জ সেট করা হয়। সূর্য ডুবলে এ শিফট শেষ হয় আর শিফট বস ফিউজ জ্বালিয়ে দেয়। বিস্ফোরণের পর পরিবেশ শান্ত হবার জন্য সারারাত কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরের দিন সকাল বেলা পুরো প্রক্রিয়াটা আবার নতুন করে শুরু হয়। এরপর ধূসর-নীল ভাঙাচোরা পাথরের একটা অঞ্চল দেখিয়ে জোনস বললেন, “এটা হল গত রাতের বিস্ফোরণ। আজ আমরা এখান থেকেই কাজ শুরু করব।”
শাসা নিজেও বুঝতে পারেনি যে, পুরো কাজটাতে এতটা আনন্দ পাবে। তাই দিন গড়াতে লাগল আর তার আগ্রহ বাড়তে লাগল। এমনকি গরম আর ধূলাকেও গ্রাহ্য করল না। তবে ব্যাপারটাকে স্বীকার করলেন জোনস, “ধূলা শ্রমিকদের ফুসফুসে পৌঁছে পাথর হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত হোস পাইপ ব্যবহার করে আকরিককে ভেজা রাখা যেন ধূলা না ওড়ে। কিন্তু ওয়াশিং গিয়ারের জন্যও পর্যাপ্ত পানির অভাব আছে। তাই পানি নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। আর শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে পড়ে, মারা যায়। তবে হ্যাঁ, তাদেরকে কিংবা তাদের বিধবাদেরকে ভালো অংকের পারিশ্রমিকও দেই।”
এভাবেই কেটে গেল সারাদিন। দুপুরবেলা শাসাকে ডাক দিলেন জোনস, “তোমার মা তোমাকে মাত্র এক শিফট কাজ করতে বলেছেন। আমি এখন উপরে যাচ্ছি। তুমি যাবে?”
“না, স্যার।” দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিল শাসা, “ওরা কীভাবে বিস্ফোরণের জন্য গর্ত বানায় আমি সেটাও দেখতে চাই।”
বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে চলে গেলেন জোনস।
যাই হোক সন্ধ্যাবেলা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শাসাকে ফিউজ জ্বালাতে দিল শিফট বস। পেঁচানো সাদা ফিউজে আগুন ধরাতেই রঙ হয়ে গেল কালো। মাথার উপর দেখা গেল নীল ধোয়া।
কাজ শেষ করে শ্রমিকদের কণ্ঠে “ফায়ার ইন দ্য হোল!” শুনতে শুনতে উপরে উঠে গেল শাসা আর শিফট বস। খানিক বাদেই কেঁপে উঠল পায়ের নিচের মাটি।
পুনরায় ঘোড়ায় চেপে পাইপ লাইনের রাস্তা ধরে বাংলোতে ফিরে এল শাসা। কিন্তু গা ভর্তি ধূলা আর ঘাম ও ক্লান্তি সত্ত্বেও কেন যেন নিজেকে এতটা সুখী আর কখনোই বোধ করেনি।
হঠাৎ করেই রুপালি রঙা পানির পাইপের উপর উঠে এল অ্যানা। ব্যাপারটা এতটাই আকস্মিক যে শাসার ঘোড়াও চমকে লাফ দিয়ে উঠল। আরেকটু হলেই পিঠ থেকে পড়ে যেত শাসা।
চুলে বুনো ফুল গুঁজে রাখা অ্যানাকে দেখে ঠিক ওয়েল্টেভ্রেদেনের লাইব্রেরির সংরক্ষিত অংশে থাকা বইয়ের বনপরীদের মত লাগছে। মা সেগুলো পড়ার অনুমতি না দিলেও পকেট মানি বাঁচিয়ে শাসা ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়ে ঠিকই দেখেছে স্বচ্ছ পোশাক পরিহিত সেসব পরীদের ছবি।
“হ্যালো, অ্যানালিসা” কেঁপে উঠে শাসার গলা। বেড়ে গেল বুকের ধুকপুকুনি। হাসলেও কিছু বলল না অ্যানা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল শাসা। কিন্তু স্কার্ট উপরে তুলে ক্রিম রঙা ঊরুর ঝলক তুলে পাইপ লাইনের ওপারে গভীর পাহাড়ে হারিয়ে গেল মেয়েটা। পিছু পিছু দৌড় দিল শাসা। কাঁটা ঝোপে বেঁধে গেল পা, কেটে গেল মুখের চামড়া। এমনকি পাথরের উপর ধাক্কা খেয়ে দুড়ম করে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর যখন উঠল উধাও হয়ে গেছে অ্যানা।
