“এই কারণেই মাছের ফ্যাক্টরি, ওয়ালবিস বে’তে গিয়েছি? তুমি এখন টাকা চাও?”
“হ্যাঁ।” ছেলেকে উৎসাহ দিলেন সেনটেইন। এরপর হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল শাসার চেহারা।
“তুমি কি এখন কিনবে?”
“আমি শুরুও করে দিয়েছি।” খুশি হলেন সেনটেইন, “জমি, মাছের ঘের, খনি এমনকি কেপটাউনে থিয়েটার পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে বেশি কিনেছি জমি। মাত্র দুই শিলিং দিয়ে এক একর। চাইলে আরো কেনা যাবে। আর জমি-ই হল সম্পদ ধরে রাখার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায়, বুঝলে!”
শাসা সবটুকু বুঝতে না পারলেও মায়ের চোখের দৃষ্টি দেখে এর বিশালতা ঠিকই অনুভব করল।
“এখন তুমি আমাদের সিক্রেট জেনে গেলে।” হেসে ফেললেন সেনটেইন, “আর আমার ধারণা যদি সঠিক হয় তাহলে আমাদের এই ভাগ্য দ্বিগুণ, তিনগুণ রূপ নেবে বুঝলে?”
“কিন্তু যদি পরিবর্তন না ঘটে” সঠিক শব্দটা স্মরণ করে শাসা বলল, “মন্দা চলতেই থাকে তাহলে কী হবে মা?”
ঠোঁট বাঁকিয়ে ছেলের হাত ছেড়ে দিলেন সেনটেইন, “কোনো কিছু নিয়েই এত ভাবিত হতে নেই, ডিয়ার।”
এরপর ডেইমলারের ইঞ্জিন স্টার্ট করলেন সেনটেইন। গাড়ি চালিয়ে চলে এলেন পথের শেষের একাকী বাংলোর কাছে।
সিঁড়ির নিচে গাড়ি পার্ক করে ইঞ্জিন বন্ধ করে আবারো তাকালেন ছেলের দিকে।
“না, শাসা ডার্লিং, আমরা গরিব হব না। বরঞ্চ আগের চেয়েও বেশি ধনী হয়ে যাব। আর তারপর তোমার মাধ্যমে পাব ক্ষমতা। দোর্দণ্ডপ্রতাপ আর দারুণ সৌভাগ্য। ওহ, ডিয়ার এ সব কিছুই আমি প্ল্যান করে রেখেছি। খুব সাবধানে প্ল্যান করেছি!”
***
মায়ের কথাগুলোই ঘুরতে লাগল শাসার মাথায়। রাতে একটুও ঘুম হল না। স্বপ্নের ঘোরে নিজের গায়ে দেখল চিতার চামড়ার পোশাক আর প্রচণ্ড শক্তি। ছাড়া ছাড়া ঘুমের মাঝে কাছে এল অ্যানালিসা। নিজের স্কার্ট আস্তে আস্তে উঠিয়ে তাকিয়ে রইল শাসার চামড়ার পোশাকের দিকে। অবচেতনেই পাজামার নিচে চলে গেল ছেলেটার হাত। আর যতবার অ্যানার কথা ভাবছে তীব্র হচ্ছে সুখের অনুভূতি। অবশেষে উষ্ণ তরলে ভিজে গেল শাসার পাজামার কোমরের অংশ। এত অবসন্ন হয়ে পড়ল যে ওঠার শক্তিটুকুও রইল না।
ভোরবেলা কফি আর শক্ত মিষ্টি বিস্কিটের ট্রে হাতে ঘুম হতে জাগাল গৃহপরিচারক। বাইরে তখনো গাঢ় অন্ধকার। মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল শাসা।
কিন্তু ওভাম্বো পরিচারক জানাল, “ম্যাডাম আমাকে বলেছেন তুমি না ওঠা পর্যন্ত যেন দাঁড়িয়ে থাকি।” অগত্যা বহুকষ্টে বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুলল শাসা। তারপর বাথরুমে যাবার সময় এমনভাবে হাত দিয়ে ঢেকে রাখল যেন পাজামার সামনের অংশের শুকনো দাগ দেখা না যায়।
সহিসদের একজন টাট্ট ঘোড়া নিয়ে শাসার জন্য অপেক্ষা করছিল। বাংলোর সিঁড়ি দিয়ে নেমে লাগাম হাতে নিল শাসা। সহিস আর ঘোড়া দুটোই যেহেতু পূর্ব পরিচিত তাই খানিকটা হাসি-তামাশাও হল।
এরপর পাইপগুলোকে অনুসরণ করে শর্টকার্ট রাস্তায় পাহাড়ের কাঁধে চড়ে উঠল শাসা। এই পাইপ লাইনের মাধ্যমেই পাহাড়ি ঝরনার পানি খনি ও ওয়াশিং গিয়ারে পৌঁছায়।
পাহাড়ের চূড়ায় দেখা দিল সূর্য। জীবন্ত হয়ে উঠল নিচের সমভূমি। পাহাড়ের এই অংশে সেনটেইনের নির্দেশে কোনো হাতই দেয়া হয়নি। তাই অরণ্য তার আপন মহিমা নিয়েই বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সোজা আকাশের দিকে উঠে গেছে লম্বা লম্বা সব মোপানি।
কিন্তু পাহাড়ের চুড়ার কোনা ঘুরে এদিকে এলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। সৌন্দর্যবিহীন চারকোনা সব লোথার দালান, ওয়াশিং গিয়ারের জঘন্য স্তূপ।
ঘোড়ার পেটে আস্তে করে গোড়ালি দিয়ে গুতো দিল শাসা। কয়েক মাইল দৌড়ে জন্তুটা তাকে মেইন গেইটে পৌঁছে দিল। মাত্র একটু আগেই গ্রাম থেকে এসে পৌঁছেছে টুয়েন্টিম্যান জোনসের পুরনো ফোর্ড। হেডলাইট পর্যন্ত এখনো জ্বলছে। গাড়ি থেকে নেমে হাতঘড়ি চেক করে মন খারাপ করে ফেললেন জোনস। শাসা ওনার চেয়ে তিন মিনিট আগে পৌঁছেছে।
“আর কখনো পরিবহন শিল্প দেখেছো মাস্টার শাসা?”
“না, স্যার।” উত্তরে জানাল শাসা। মন চাইল বলে যে মা কখনো দেয়নি। কিন্তু কেন যেন বলল না। তবে প্রথম বারের মত মনে খানিকটা উম্মাও এল মায়ের সর্বময় খবরদারির প্রতি।
এরপর শাসাকে শিফট বসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন জোনস। সাথে আদেশ দিলেন, “মাস্টার শাসা তোমার সাথে কাজ করবে। কিন্তু বাড়তি কোনো খাতিরের দরকার নেই। ওর সাথে অধীনস্ত যে কোনো তরুণদের মতই আচরণ করো। তবে হ্যাঁ, একদিন সেই হবে তোমার ম্যানেজিং ডিরেক্টর।” এতটা বিষণ্ণ চেহারা নিয়ে জোনস্ তামাশা করেন যে কেউ হাসার সাহসই পায় না।
যাই হোক, সাথে আরেকটা আদেশও দিলেন, “যাও, মাস্টার শাসার জন্য একটা টিনের হেলমেট নিয়ে আসো।” একটু পরে শাসাকে নিয়ে খাড়া চূড়ার পাদদেশে চলে এলেন জোনস। চূড়ার নিচের বাকানো টানেলের মধ্য দিয়ে স্টিলের রেলপথ খানিকটা এগিয়েই পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি মোচড় খেয়ে হারিয়ে গেছে গভীর অন্ধকারে। শাসাকে নিয়ে প্রথম ট্রাকে চড়ে বসলেন জোনস।
প্রথমদিকে চারপাশের অন্ধকার দেখে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করল শাসা। কিন্তু পেছনের ট্রাকগুলোতে গান গাইছে ধূলিমাখা ওভারঅল আর হেলমেট পরিহিত কৃষ্ণাঙ্গ ওভাষো শ্রমিক। তাদের সুরেলা কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পুরো টানেল জুড়ে। শাসার আচরণও তাই সহজ হয়ে এল।
