“আমিও সেটাই বলতে চাইছিলাম, ম্যাম।”
“তাহলে কখন আসব?” এবারে জানতে চাইল শাসা।
“শিফট তো ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মাস্টার শাসা চাইলে এক ঘন্টা পরে আসতে পারবে।” সেনটেইনের দিকে তাকালেন জোনস। কিন্তু তিনি কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। এটা আসলে শাসার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ এই বয়সী ছেলেরা ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠাটাকে বিভীষিকা বলে মনে করে। তাই সিদ্ধান্ত নেবার ভার ছেলের উপরেই ছেড়ে দিলেন সেনটেইন।
“আমি ভোর সাড়ে চারটায় মেইন গেইটে থাকব স্যার” শাসার উত্তর শুনে স্বস্তি পেলেন সেনটেইন। হাত ধরে বললেন, “তাহলে চলো আজ রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে হবে।”
রাস্তায় নেমে এল ডেইমলার। সেনটেইন নিজেই চালাচ্ছেন। শেষ মাথায় টার্ন কটেজের দোরগোড়ায় বারান্দার কিনারে হাঁটু ছড়িয়ে বসে আছে একটা মেয়ে। পরনের স্কার্ট পায়ের বেশ খানিকটা উপরে উঠে গেছে।
ডেইমলার পাশ দিয়ে যাবার সময় শাসাকে দেখে ভেংচি কাটল মেয়েটা। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল শাসা। মনে এল অপরাধবোধ। পাম্প হাউসের পেছনে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা মনে হলে এখনো লাল হয়ে ওঠে গাল। যাক! মা সোজা রাস্তার দিকে চেয়ে আছে। নিশ্চয় কিছু দেখেনি। কিন্তু বিড়বিড় করে উঠলেন সেনটেইন, “কোনো ঝামেলা হবার আগেই হতচ্ছাড়া মেয়েটাকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে।”
অবাক হয়ে গেল শাসা। কোনো কিছুই মায়ের চোখ এড়ায় না। তারপরেই মেয়েটাকে দূরে পাঠিয়ে দেয়ার কথা মনে হতেই কেন যেন মোড় দিয়ে উঠল বুক। আস্তে করে জানতে চাইল, “তাহলে ওদের কী হবে মা? মানে ওর বাবার চাকরি চলে যাবে।” মা আর জোনসের মুখে ব্যয় সংকোচের কথা শুনেছে শাসা। তখন কেবল সংখ্যা মনে হলেও মেয়েটাকে দেখে সংখ্যাগুলো রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে গেল।
“জানি না ওদের কী হবে।” শক্ত হয়ে গেল সেনটেইনের মুখে, “আর জানি যে এটা নিয়ে আমাদের চিন্তা না করলেও চলবে। বাস্তব অত্যন্ত কঠিন আর সবাইকে তা মেনে নিতেই হবে। তাই ভাবতে হবে ওদেরকে ছাঁটাই না করলে আমাদের কী হবে।”
“আমাদের লোকসান হবে।”
“ঠিক তাই। আর তাহলে খনি বন্ধ করে দিতে হবে আর এই স্বল্পসংখ্যকের জন্য সবাই একসাথে বেকার হবে। নিজেদের সবকিছু আমরা হারিয়ে ওদের মতই হয়ে যাবো। তুমি কি তাই চাও?”
হঠাৎ করে ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা রেলওয়ে ক্যাম্পের নোংরা ধূলিমাখা ছেলেটার কথা মনে পড়ে গেল। তার জায়গায় এমনকি নিজেকেই দেখল।
“না!” তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেও গলার স্বর নামিয়ে নিল শাসা; কেঁপে উঠে জানতে চাইল, “সত্যিই কি এমন হবে মা? আমরা কি গরিব হয়ে যাব?”
“হতেও পারি সোনা। প্রতিটি মিনিট যদি কাজে লাগাতে না পারি তাহলে ভয়ংকর ব্যাপারটা ঘটে যেতেও পারে। সৌভাগ্য তৈরি করা বেশ কষ্ট কিন্তু ধ্বংস করতে একটুও সময় লাগে না।”
নিজের ইয়ট, বিশপ স্কুলের বন্ধু-বান্ধব, পোলো খেলার ঘোড়া, ওয়েল্টেভ্রেদেনের আঙুর ক্ষেতের কথা ভেবে ভয় পেয়ে গেল শাসা।
“মা সত্যিই এমনটা হবে?”
“নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। হাত বাড়িয়ে ছেলের হাত ধরলেন সেনটেইন, “এটাই তো জীবনে খেলার মজা।”
“আমি গরিব হতে চাই না।”
“না!” ছেলের মতই জোর গলায় বললেন সেনটেইন। “আমরা সাহস আর সুচতুরতার সাথে যতণ কাজ করব ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম কিছুই ঘটবে না।”
“তুমি যে বললে ব্যবসা থেমে যাবে। কেউ আমাদের হিরে কিনবে না…” পূর্বে এগুলো নিছক শব্দ হলেও এখন সম্ভাবনা হয়ে দেখা দিল শাসার মনে।
“সবসময় মনে রাখবে যে কোনোদিন চাকা ভিন্ন দিকে ঘোরা শুরু করবে। তাই গোল্ডেন রুলসগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। মনে আছে সেগুলো কী কী? প্রথমটা বলো তো?” ছেলের কাছে জানতে চাইলেন সেনটেইন।
“যখন সবাই বেচবে তখন তুমি কিনবে, যখন সবাই কিনবে তখন তুমি বিক্রি করবে।” সাথে সাথে উত্তর দিল শাসা।
“গুড। আর এখন কী হচ্ছে বলো তো?”
“সবাই কেনার চেষ্টা করছে।”
ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই চওড়া হাসি হাসল শাসা।
“আমার ছেলেটা আসলেই খুব সুন্দর আর সহজাত প্রতিভার অধিকারী।” আপন মনে ভাবলেন সেনটেইন। তারপর অপেক্ষা করলেন। দেখা যাক কতদূর পর্যন্ত বুঝতে পারে শাসা। কুণ্ডুলি পাকানো সাপের বিষদাঁত খুঁজে পাবে কিনা দেখা যাক। আর তৎক্ষণাৎ বিষণ্ণ হয়ে বদলে গেল শাসার অভিব্যক্তি।
“কিন্তু মা, আমাদের কাছে টাকা না থাকলে কীভাবে কিনব?”
রাস্তার পাশে গাড়ি রেখে ইঞ্জিন বন্ধ করলেন সেনটেইন। তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে ওর দু’হাত ধরলেন।
“এখন তোমাকে আমি যা বলব তা আমাদের বিজনেস সিক্রেট। এটা কারো সাথেই শেয়ার করা যাবে না। দাদু, অ্যানা, টুয়েন্টিম্যান জোনস, আব্রাহাম কারো সাথে না। শুধু আমার আর তোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে ঠিক আছে?” শাসা মাথা নাড়তেই গভীরভাবে দম নিলেন সেনটেইন, বললেন, “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে দুনিয়ার উপর নেমে আসা এ বিপর্যয় হচ্ছে। আমাদের উন্নতির কেন্দ্রস্থল। যে সুযোগটা সবাই পায় না। তাই গত কয়েক বছর ধরেই আমি এর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। কীভাবে জানো?” মায়ের দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে না সুলভ মাথা নাড়ল শাসা।
“আমি খনি আর ওয়েন্টেভেদেন ছাড়া বাকি সবকিছুকে ক্যাশ বানিয়ে ফেলেছি। এমনকি এগুলো দেখিয়ে প্রচুর ধারও করেছি।”
