“হাসছ কেন মা?” জানতে চাইল শাসা।
“আরে ধুর, তোমার জন্মেরও বহু আগের কিছু কথা মনে পড়ে গিয়েছে।”
“বলো না, প্লিজ?” ছেলেটাকে যেন এই গরম আর উষ্ণতা একটুও ছুঁতে পারেনি। অবশ্য কেন পারবে? ও নিজেও তো এই মরুভূমিরই সৃষ্টি। শাসার দিকে তাকিয়ে হাসলেন সেনটেইন। তারপর সবকিছু খুলে বললেন। শুনে তো শাসার চোখ ছানাবড়া, “তোমার নিজের পী?”
চুপচাপ বসে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন সেনটেইন। একটু পরেই বদলে গেল শাসার অভিব্যক্তি। বিতৃষ্ণার বদলে দেখা গেল শ্রদ্ধা।
“দেখো!” দূরের সিংহরঙা সমতল ভূমির দিকে ইশারা করলেন সেনটেইন। তারপর ডেইমলার থামিয়ে বের হয়ে এলেন বাইরে। সামনে যেন দারুচিনি রঙা পাতলা ধোঁয়ার আস্তরণ দিগন্ত ঢেকে ফেলেছে।
“দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিংবক হরিণ। এবার এই প্রথম দেখলাম।” একসাথে একই দিকে যাচ্ছে সুদৃশ্য হরিণের দল।
“বোধ হয় হাজার হাজার হবে।”
“এগুলো এখন উত্তরে বাস করতে যাচ্ছে।” ছেলেকে জানালেন সেনটেইন, “নিশ্চয়ই সেখানে ভালো বৃষ্টিপাত হয়েছে। তাই পানির সন্ধানে যাচ্ছে।”
হঠাৎ করেই একেবারে কাছের একটা হরিণ মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে আতঙ্কিত চিৎকার জুড়ে বাকিগুলোকেও সচকিত করে দিল। পিঠ বাকা করে লম্বা মাথা নিচু করে ঠিক যেন উড়ে যাচ্ছে হরিণের পাল।
গাড়ির উপর থেকে নিচে নেমে এসে হাসতে হাসতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল মাতা-পুত্র দু’জনে। তারপর গাড়িতে উঠে শাসাকে হুইল ছেড়ে দিলেন সেনটেইন। সমভূমি হাওয়ায় ছেলেটা চালালোও বেশ খানিক বাদে শাসা বলল, “মা, আমরা একাকী থাকলে তুমি একেবারে বদলে যাও। এত মজা করতে পারো যে আমার সবসময় এমনটাই দেখতে ইচ্ছে করে।”
“দীর্ঘ সময় ধরে একটা কাজ বারবার করলে তখন কিন্তু বিরক্ত লাগবে। যেমন ধরো কাল আমরা খনিতে পৌঁছাবো আর তারপর সে কাজে তুমি নতুন আরেক উত্তেজনা টের পাবে। অভিজ্ঞতাও হবে। তাই প্রতিটি মুহূর্তের কাছ থেকে যতটুকু পারো নিংড়ে নাও। বুঝলে?”
জোনস আগেই খনিতে পৌঁছে গেছেন। তাই পরিচারকদেরকেও সতর্ক করে দিয়েছেন। সন্ধ্যায় রেস্ট হাউজে পৌঁছে হট শাওয়ার নিলেন সেনটেইন। তারপর পছন্দের শ্যাম্পেনও পেলেন।
“ঠাণ্ডা পা আর গরম মাথা- ওয়াইন বলো আর মানুষ বলো কারো জন্যই। ভালো না।”
একটা বোতল থেকে সবসময় সিংগেল একটা গ্লাসই পান করেন সেনটেইন। এরপর চলে এল সবুজ বেনগুয়েলা স্রোতের সুস্বাদু লবস্টার। সাথে উইন্ডহকের মচমচে লেটুস, টমেটো আর পেঁয়াজ, আর সবশেষে বুনো ট্রাফল; যা কাঁচা খেলেই জিভে লাগে কালাহারির স্বাদ।
পরদিন ভোরেরও আগে নিকষ কালো আঁধার থাকতেই আবার শুরু হল যাত্রা। ধীরে ধীরে উপরে উঠে এল দিগন্তের সূর্য। বদলে গেল চারপাশের রঙ। হয়ে উঠল পুরো রুপালি সাদা।
হঠাৎ করেই গাড়ি থামাবার আদেশ দিলেন সেনটেইন, “স্টপ হিয়ার!” তাড়াতাড়ি নেমে ডেইমলারের ছাদে উঠে গেলেন। অবাক হয়ে গেল শাসা।
“কী হয়েছে মা?”।
“দেখো, দেখো, ওই তো! দিগন্তের একটু উপরে।”
পুরো আকাশ জুড়ে ভেসে উঠল অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য।
“ঠিক যেন আকাশের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।” বুঝতে পেরে শাসা নিজেও উত্তেজিত হয়ে উঠল।
“আকাশে ভেসে বেড়ায় যে পাহাড়।” আপন মনেই বিড়বিড় করলেন। এতবার দেখেছেন, তবু প্রতিবারই নতুন মনে হয়।
অতঃপর আবার ডেইমলারে চড়ে শুরু হল অন্তহীন পথ। আস্তে আস্তে বদলে গেল পাহাড়ের চেহারা। কেবল শক্ত আর কর্কশ পর্বত চারপাশে। এরকমই একটা পাথুরে পাহাড়ের নিচে অবস্থিত হানি খনি। যদিও প্রকতির মাঝে দালানগুলো কেমন যেন বিসদৃশ দেখায়।
সেনটেইন জোনসকে আদেশ দিয়েছেন যতটা সম্ভব সুশ্রী দালানকোঠা নির্মাণের জন্য; যেন কাজের ক্ষতি না করেও সৌন্দর্য বজায় রাখা যায়। কিন্তু শ্রমিকদের কম্পাউন্ড, স্টিলের টাওয়ার, এলিভেটর যেমন-তেমন হলেও স্টিম বয়লারটা খুবই জঘন্য লাগে। যাই হোক, খড়ে ছাওয়া অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ের সামনে ডেইমলার থামতেই লাফ দিয়ে ছুটে এলেন জোনস।
“ভ্রমণ কেমন হয়েছে মিসেস কোর্টনি? নিশ্চয়ই হাত-পা ধুয়ে খানিক বিশ্রাম করতে চান?”
“আপনি তো তা ভালোভাবেই জানেন ডা. জোনস। চলুন কাজ শুরু করা যাক।” চওড়া বারান্দা পেরিয়ে নিজের অফিসে চলে এলেন সেনটেইন, “আমার পাশে বসো।” মায়ের পাশে বসল শাসা।
রিকোভারী রিপোর্ট থেকে শুরু করে খরচের শিডিউল পর্যন্ত হাজারটা সংখ্যা শুনে হিমশিম খেল শাসা। এর ভেতরেই হঠাৎ করে সেনটেইন ছেলের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “বলো তো যদি আমরা গড়ে প্রতি লোডে তেইশ ক্যারাট করে পাই, তাহলে প্রতি ক্যারাটের খরচ কত পড়বে?” আচমকা প্রশ্নটা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল শাসা। ছেলের আমতা আমতা ভাব দেখে ক্ষেপে গেলেন সেনটেইন। ক্রু কুঁচকে বললেন, এটা তো স্বপ্ন দেখার সময় নয়।” তারপর আবার জোনসের দিকে মনোযোগ দিলেন।
একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে অবশেষে উঠে দাঁড়ালেন সেনটেইন। “কাল তাহলে এখান থেকেই আবার শুরু হবে।” বিড়ালের মত আড়মোড়া ভেঙে সবাইকে নিয়ে চওড়া বারান্দাটাতে সবাইকে নিয়ে চলে এলেন।
হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “যেমনটা আগেই বলেছি শাসা আপনার হয়ে কাজ করবে। আমার ধারণা পরিবহনের ব্যাপারগুলো ওর শিখে নেয়া উচিত।”
