তারপর আস্তে করে গাধার মাথা থেকে দড়ি খুলে পিঠ চাপড়ে জন্তুটাকে মুক্ত করে দিলেন। আর সত্যি সত্যিই খুশিতে প্রথম একশ গজ টগবগ করে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেল গাধাটা।
সবাই একটা করে ঘোড়ায় চড়ে পিছনে দড়ি বাঁধা আরো তিন-চারটা ঘোড়া নিয়ে চলে এল পাহাড়ের উপরের গোপন আস্তানাতে।
পরের দিন ভোরবেলা চেক করে দেখা গেল মাত্র দু’টো ঘোড়া আহত হয়েছে। আর শুয়োর জনও চেতনা ফিরে পেয়ে জেগে উঠেই বমি করে দুর্গন্ধযুক্ত ব্র্যান্ডি উগরে দিয়েছে পেট থেকে।
“তোমার সাথে আমার বোঝাপড়া এখনো বাকি আছে। বুঝলে শক্ত মুখে জনকে জানিয়েই হেনড্রিকের দিকে তাকালেন লোথার, “সবকটা ঘোড়াকে নিয়ে যাবো। তারপর মরুভূমিতে কয়েকটাকে ছেড়ে দেব।” এরপর কমান্ডো স্টাইলে ডান হাত নেড়ে বললেন, “মুভ আউট!”
পাহাড় থেকে নামিয়ে সবকটা ঘোড়াকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি খাওয়ানো হল। তারপর আবার আস্তানাতে ফিরে এসে সমস্ত বোঝাসহ নিজেরাও একেকটা করে ঘোড়া পছন্দ করে চড়ে বসল।
এই ফাঁকে হেনড্রিক জানতে চাইলেন, “হাতে ক’দিন সময় পাব?”
“কৃষ্ণাঙ্গরা তো অফিসার ছাড়া কিছু করতে পারবে না। তারা ফিরবে আবার উইন্ডহক থেকে অর্ডার আর বাড়তি সেনা আনাতে গিয়ে ধরো চার থেকে পাঁচদিন।”
“তিনদিনেই আমরা বহুদূর কেটে পড়ব।” সন্তুষ্ট হলেন হেনড্রিক।
“তো এখন যাব? জিজ্ঞেস করতেই লোথার জানালেন, “দাঁড়াও আরেকটা কাজ বাকি।” এরপর নিজের ব্যাগ থেকে বাড়তি চামড়ার একটা লাগাম টেনে বের করে শেডের ভেতর বসে থাকা জনের দিকে এগিয়ে গেলেন। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখায় পায়ের আওয়াজও পায়নি জন।
“আমি কিন্তু প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।” বলে হাতের চামড়া ফালিটাকে নাড়ালেন।
“মাস্টার আমার কোনো দোষ নেই।” কেঁপে উঠে তাড়াতাড়ি পায়ের ওপর দাঁড়াতে চাইল জন।
লোথার লাগামটাকে ঘোরাতেই তামার তৈরি অগ্রভাগ গিয়ে পাঁজর ঘুরে পিছনে আঘাত করল। আর জনের বাহুমূলের নিচে মাংস কেটে গেল।
ঘোঁত ঘোত করে উঠল জন, “ওরাই তো আমাকে বাধ্য
পরের আঘাতেই পা ভাজ করে পড়ে গেল জন। ছিঁড়ে গেল শার্ট। এত আর্ত চিৎকার করছে যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একের পর এক আঘাত করে হাঁপাতে হাঁপাতে থেমে গেলেন লোথার। জনও চিৎকার থামিয়ে দিল। তার কেটে যাওয়া ক্ষত দেখে অন্যরাও সাবধান হয়ে গেল।
সবার আগে কথা বললেন হেনড্রিক, “একদম ঠিক হয়েছে। বাকিটা কি আমি সারব?”
“না! ওর জন্য একটা ঘোড়া রেখে দাও। যদি মন চায় আমাদের পিছু নেবে। নয়তো মন যেখানে চায় সেই নরকে যাবে।” ছেলের দিকে একবারও তাকিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন লোথার, “অল রাইট, এগোও সবাই।”
বহুদিন পরে এতটা উজ্জীবিত বোধ করছেন। মাদকের নেশার মত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে অ্যাড্রেনালিনের গতি। আবারো তিনি হয়ে পড়েছেন এক ফেরারি আসামি; সমাজের সকল শৃঙ্খল থেকে মুক্ত।
“ওহ, ঈশ্বর, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে কাঁধে একটা রাইফেল আর দু’পায়ের নিচে একটা ঘোড়া থাকলে কেমন লাগে।”
“আবারো নিজেকে পুরুষ বলে মনে হচ্ছে।” পাশ থেকে বলে উঠলেন হেনড্রিক। ঝুঁকে ম্যানফ্রেডের উদ্দেশে বললেন, “আর তুমিও। তোমার বয়সেই তোমার বাবা আর আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। এখন আবার আরেক যুদ্ধে যাচ্ছি।” একটু আগেই দেখা দৃশ্য ভুলে গেল ম্যানফ্রেড। নিজেকে দলের একজন হিসেবে গণ্য করে গর্বে ভরে উঠল বুক।
সে রাতেই গভীর খাদের ক্যাম্পে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাবার পর হঠাৎ করেই পাহারাদারের মৃদু শিসে সবার ঘুম ভেঙে গেল। রাইফেল কাঁধে নিয়ে অন্ধকারে গা ঢাকা দিল সবাই। একটু পরেই আঁধার কুঁড়ে এগিয়ে এল শুয়োর জন। ফোলা মুখ নিয়ে এসে দাঁড়াল ক্যাম্প ফায়ারের কাছে। এবার ওর দিকে একবারও না তাকিয়ে সবাই আবার ফিরে এসে যে যার জায়গায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। যেন কখনোই কিছু ঘটেনি।
কেবল লোথার কর্কশ কণ্ঠে জানালেন, “আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে শোও। গা থেকে ভুরভুর করে ব্র্যান্ডির গন্ধ বেরোচ্ছে।”
দলে পুনরায় জায়গা পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল জন। সকাল হতেই পুনরায় উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে শুরু হল যাত্রা।
***
হানি খনির পথটাই হল পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ রাস্তা। আর এখানে এলে প্রতিবার সেনটেইন ভাবেন আর নাহ, এবার মেরামত করতেই হবে। কিন্তু পরক্ষণেই জোনসের হাতের বিশাল খরচের হিসাব দেখে উঠে যায়। এ সাধ। ভাবেন, “মাত্র তো তিনদিনের ব্যাপার। বেশ অ্যাডভেঞ্চারও হয়ে যায়।”
খনিকে উইন্ডহকের সাথে টেলিগ্রাফ লাইন বসিয়ে সংযুক্ত করার জন্যও অনেক খরচ করতে হয়েছে। তাছাড়া সীমাহীন পোলের লাইনের সাথে লাগানো তামার তার নষ্ট করে দিয়েছে কালাহারির বন্য সৌন্দর্য।
প্রথম বছরের ভূমি শয়ান আর পানি পরিবহনের কথা মনে হলে এখনো নস্টালজিয়ায় ভোগেন সেনটেইন। এখন তো গভীর গর্ত থেকে পানি ভোলার জন্য উইন্ডমিল, প্রত্যেকটি স্টেশনে স্থায়ী পরিচারকের দল আছে কালাহারির প্রচণ্ড শীতে গরম খাবার আর আগুন জ্বেলে দেয়ার জন্য। এমনকি রেফ্রিজারেটরও আছে।
যাই হোক, এই তপ্ত গরমে ডেইমলারের ভেতরে বসে গায়ে ফোস্কা পড়ার দশা। কোচের মত গাড়ির ভেতরেও যদি বাতাস ঠাণ্ডা করার মেশিন বসানো যেত, হেসে ফেললেন সেনটেইন। এখনো মনে আছে কেমন করে দু’জন বুড়ো বুশম্যান তাকে উদ্ধার করেছিল। মরুভূমির মধ্যাহ্নের দানবীয় গরম থেকে বাঁচার জন্য গায়ের উপর নিজেদের প্রস্রাব আর বালি মেখে দিয়েছিল।
