এমনকি এতটা দূর থেকে আর সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতেও খুশিতে গার্ডের সাদা দাঁতের ঝলকানি স্পষ্ট দেখলেন লোথার। সঙ্গীদেরকে ডাকতেই বেরিয়ে এল আরো দু’জনে। নিজের সম্পদ দেখাতে অবশেষে জনকে সম্মানিত অতিথির মত টেনে নিল ভেতরে। লোখারের দৃষ্টির বাইরে চলে গেল শুয়োর।
যেকোনো নাবিকের মতই সান্ধ্য বাতাসের শক্তি আর গতি ভালোই চেনেন লোথার। তাই রাত নামারও ঘণ্টাখানেক পর শিস দিয়ে হেনড্রিককে ডেকে বললেন, “নদী পেরিয়ে ক্যাম্পের চারপাশ ঘুরে এসো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে নদীর ওপার থেকে অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতেই চোখ তুলে তাকালেন দু’জনে। তাবুর সামনের ক্যাম্প ফায়ারের শিখা ধপধপ করে আকাশে উঠে যাচ্ছে। নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যদের ছায়া। “পাগলগুলো করছেটা কী? নাচছে না যুদ্ধ করছে?” অবাক হলেন লোথার।
“আসলে নিজেরাই জানে না যে কী করছে।” মিটিমিটি হাসলেন হেনড্রিক। আগুনের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নামছে, ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে আর হিহি করে হাসছে সব সেনা। একজন আবার পুরোই দিগম্বর।
“তোমার যাবার সময় হয়েছে। ম্যানিকে নিয়ে যাও। তোমার ঘোড়ার দড়ি ধরবে।” হেনড্রিকের কাঁধে চাপড় দিলেন লোথার।
হেনড্রিক ঢালু বেয়ে নামতে শুরু করলেও লোথারের কথা শুনে আবার দাঁড়িয়ে পড়লেন, “ম্যানি কিন্তু এখন তোমার দায়িত্ব। কিছু হলে নিজের জীবন দিয়েই উত্তর দিতে হবে।”
উত্তর না দিয়ে রাতের আঁধারে হারিয়ে গেলেন হেনড্রিক। আধঘণ্টা দু’জনকে নদীর বালুতীর পার হতে দেখলেন লোথার।
ওদিকে ক্যাম্পের সৈন্যদের সবাই এখন বদ্ধ মাতাল। একজনকে দেখে শুয়োর জনের মত মনে হলেও মুখ নিচু করে থাকায় নিশ্চিত হওয়া গেল না।
“এইবার ব্যাটা মরেছে।” দিগন্তে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে চাঁদ, উঠে দাঁড়ালেন লোথার। ঢালু বেয়ে নিচে নেমে গাধাটার কাছে এসে কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন।”
“চল রে, সোনা, তোর কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।” কাঁধ থেকে রাইফেল নামিয়ে কার্টিজ ভরে নদীতীরে চলে এলেন লোধার। সাথে সিংহবাহী গাধা।
নিভে গেছে ক্যাম্প ফায়ারের আগুন। সামনের আস্তাবল থেকে কোনো এক জন্তুর মৃদু নিঃশ্বাসের শব্দও কানে এল। লোথারের পেছন দিক থেকে বইছে বাতাস। এমন সময় গাধাটাকে সামনে ঠেলে দিলেন লোথার।
আর যায় কোথায়। সাথে সাথে পাগলের মত আচরণ শুরু করল সবকটা ঘোড়া। রক্তাক্ত সিংহের গন্ধ নাকে যেতেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে সবগুলো পশু। ভয়ার্ত চিৎকারের পাশাপাশি উন্মাদের মত পা ছুড়ছে ঘোড়ার দল।
আস্তাবলের দেয়ালের কাছে এসে গাধার পিঠ থেকে দড়ি কেটে সিংহের দেহটাকে মাটিতে ফেলে দিলেন লোথার। ফুসফুসের বাতাস মরা সিংহের গলা দিয়ে খানিকটা গর্জন হয়ে বেরোতেই চিৎকার দিয়ে ঘূর্ণির মত ঘুরতে শুরু করল ঘোড়াগুলো।
সিংহের পেছনের পায়ের দু’ফাঁক থেকে শুরু করে পাঁজর অব্দি পেট একটানে চিরে ফেললেন লোথার। এমনকি ব্লাডারের মধ্যেও ঢুকে গেল ধারাল ফলা। সাথে সাথে গন্ধে ভারি হয়ে উঠল বাতাস।
পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ল ঘোড়ার পাল। কাঁধের উপর রাইফেল তুলে ফাঁকা গুলি করেই ম্যাগাজিন খালি করে ফেললেন লোথার। এবার একেবারে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে আস্তাবলের বেড়া ভেঙে অন্ধকার নদীতীর ধরে ছুটল সবকটা জম্ভ। সোজা একেবারে হেনড্রিকের কাছে।
তাড়াতাড়ি গাধাটাকে ধরে রাইফেল রি-লোড করে ক্যাম্প ফায়ারের আগুনের কাছে ছুটলেন লোথার। কিন্তু মাতাল অবস্থাতেও সবকিছু টের পেয়ে আস্তাবলের দিকে ছুটল এক সৈন্য।
“ঘোড়া ঘোড়া” চিৎকার জুড়ে দিল লোকটা, “ঘোড়াগুলোকে থামাতে হবে।” লোথারকে দেখে বলে উঠল, “আমাকে সাহায্য করে। আমাদের ঘোড়া”
ওর চিবুকের নিচে রাইফেলের হাতল ধরলেন লোথার। ভয়ে লোকটার দাঁতে দাতে বাড়ি খাওয়া শুরু হল। ঝুপ করে বালির উপর পড়তেই অন্যপাশে গড়িয়ে গেল কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য।
“শুয়োর জন!” তাড়াতাড়ি ডেকে উঠলেন লোথার, “তুমি কই?” দূর থেকে দেখা শরীরটাকে সোজা করতেই চাঁদের আলোয় পিটপিট করে তাকালো জন।
“ওহ ওঠো!” বুট জুতা দিয়ে সজোরে লাথি মারলেন লোথার। তারপরেও হাসতে শুরু করল জন; যেন কোনো ব্যথাই পায়নি। আমি কিন্তু সাবধান করে দিচ্ছি।” রাইফেলের নলটাকে জনের মাথার উপর ধরলেন লোথার। পুলিশ ধরলে কয়েকটা চাবুকের ঘায়েই পরিকল্পনার যতটুকু জানে সব গড়গড় করে বলে দেবে জন।
“তাই এটাই ওর জন্য ভালো হবে।” কিন্তু পারলেন না লোথার। তাড়াতাড়ি গিয়ে গাধাটাকে ধরে নিয়ে আসলেন।
পিঠের ভেজা কাপড়ের মত গাধার পিঠের দু’পাশে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে রইল জন। পেছনে লাফ দিয়ে চড়ে বসলেন লোথার। তারপর গাধাটাকে এটার সর্বোচ্চ গতিতে ছোটালেন।
মাইলখানেক যাবার পর মনে হল বুঝি বাকিদেরকে হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু না, থামতেই সামনে বেরিয়ে এল হেনড্রিকের ছায়া।
“কয়টা ধরতে পেরেছো?” উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন লোথার।
হেসে ফেললেন হেনড্রিক, “যতগুলোকে থামাতে পেরেছি।”
“ছাব্বিশ!” উল্লসিত হয়ে পঁড়িতে বাধা ঘোড়াগুলোকে দেখলেন লোথার। “সবচেয়ে ভালগুলোকে বেছে নেয়া যাবে। অল রাইট। এখন এখান থেকে সরে পড়তে হবে। সেনাবাহিনি ফিরে এলেই সর্বনাশ।” তাড়াতাড়ি নিজের আনন্দের লাগাম টেনে ধরলেন লোথার।
