হেনড্রিক এসে তাড়াতাড়ি তুলে লোথারকে বসিয়ে মাথা আর নাকের কাছ থেকে বালি ঝেড়ে দিলেন। লোথার দুর্বলভাবে হাত নাড়তেই তার ভয় কেটে গেল।
“তুমি দেখি ধীর আর বুড়োটে হয়ে যাচ্ছে বাস্।” হেসে ফেললেন হেনড্রিক।
“ম্যানি দেখে ফেলার আগেই আমাকে তুলে ধরো।”
হেনড্রিকের কাঁধে ভর দিয়ে বহুকষ্টে উঠে দাঁড়ালেও একের পর এক ঠিকই অর্ডার দিয়ে চললেন, “ক্লেইন বয়! লেগস্! তাড়াতাড়ি গিয়ে সিংহের গন্ধ পেয়ে পাগল হয়ে ওঠার আগেই গাধাটাকে থামাও।”
তারপর হেনড়িককে সরিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে সিংহের মতদেহের কাছে গেলেন। এরই মাঝে মাছি এসে ওড়াউড়ি শুরু করেছে সিংহের চুর্ণ-বিচূর্ণ মাথার উপর, “এটাকে লোড করার জন্য সবাইকে হাত লাগাতে হবে।” বালি থেকে নিজের রাইফেল তুলে নিয়ে সাবধানে মুছে ফেললেন লোথার। তারপর এটার উপর ভর দিয়েই উঠে দাঁড়ালেন।
গাধাটাকে নিয়ে এগিয়ে আসছে ম্যানফ্রেড। দৌড় দিলেন লোথার।
“তুমি ওটাকে ধরতে পেরেছে পা?” উত্তেজিত স্বরে জানতে চাইল ম্যানফ্রেড { গুলির শব্দ আগেই পেয়েছে।
“হ্যাঁ।” ছেলেকে গাধার পিঠ থেকে নামালেন লোথার, “ওইতো চুড়ার ওধারেই আছে।”
গাধার চিবুকের লোথার রিংয়ের সাথে বাড়তি দড়ি লাগিয়ে দুজনের হাতে ধরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর খুব সাবধানে ক্যানভাসের কাপড় দিয়ে চোখও ঢেকে দিলেন।
“দেখা যাক। কেমন কাজ করে।” দুজন মিলে গাধাটাকে টানতে চাইলেও কেন যেন নিজের জায়গা থেকে একটুও নড়ল না জটা।
তাই লেজের নিচে খোঁচা দিলেন লোথার। তারপর খানিকটা এগিয়ে চূড়ার মাথা পর্যন্ত এলেও মৃদু বাতাসে ভেসে এল সিংহের তাজা গন্ধ।
সাথে সাথে উন্মাদ হয়ে গেল গাধা। তীক্ষ্ণ হেষা দিয়ে লাফ-ঝাঁপ শুরু করায় পা বেঁধে পড়ে গেল দড়ি ধরে রাখা দু’জন, পেছনের খুড়ের ভেতর আটকা পড়লেন লোথার। আর তারপরেই এক হ্যাঁচকা টানে চারজনসহ আধ মাইল দৌড়ে গেল গাধা। হাঁচোড়-পাঁচোড় করে চিৎকার দিচ্ছে লোথার আর তাঁর সহকারীরা। অবশেষে যখন নিজের তৈরি ধূলিমেঘের ভিতর থামল, দেখা গেল আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে বোবা গাধা।
চোখের পট্টি ভালোভাবে বসিয়ে টানতে টানতে আবার এটাকে ফিরিয়ে আনা হলেও সিংহের গন্ধ পাবার সাথে সাথে শুরু হল দৌড়। এবার অবশ্য কয়েকশ’ গজের বেশি যেতে পারল না। এরকম আরো দু’বার করার পর অবশেষে অবসন্ন হয়ে থেমে গেল গাধা। সুযোগ পেয়ে সবাই মিলে মৃত সিংহকে তুলে দিল কাঁধের উপরে। আর সাথে সাথে সিংহের থাবার স্পর্শ পেতেই লাথি দিয়ে দেহটাকে ফেলে দিল গাধা।
এভাবে ঘণ্টাখানেক যুদ্ধ করার পর অবশেষে সিংহের দেহ বাঁধা হল গাধার ওপর।
দড়ি ধরে আস্তে আস্তে গাধাটাকে নদী তীরে হটিয়ে নিয়ে এলেন লোথার।
***
সোয়াকোপ নদী আর ওপারের গ্রামের দিকে তাকালেন লোথার। নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে ঠিক সেখানেই তিনটা ছোট ছোট সবুজরঙা পুকুর। এখানেই ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়ানো হচ্ছে। কাউন্টের কথাই ঠিক। আর্মির ক্রেতা খুঁজে খুঁজে সেরাগুলোকেই নিয়ে এসেছে। দূরবিন চোখে দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন লোথার। বেশ লোভও জাগলো মনে। মরুভূমিতে জাত হওয়ায় এতদূর থেকেও স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছে জম্ভগুলোর সামর্থ্য।
মনোযোগ সরিয়ে সহিসদের দিকে তাকাতেই দেখা গেল সংখ্যায় পাঁচজন খাকি ইউনিফর্ম পরিহিত কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য থাকলেও কোনো অফিসার নেই।
“বোধ হয় ক্যাম্পের ভেতরে।” আপন মনেই বিড়বিড় করে আস্তাবলের পেছনে সারি সারি বাদামি তাবুর উপর ফোকাস করলেন লোথার।
পেছনে হালকা হুইসেলের আওয়াজ পেয়ে কাঁধের উপর দিকে তাকাতেই দেখা গেল হেনড্রিক। রক্তাক্ত বোঝা নিয়ে শেডের ভেতরে বসে আছে গাধাটা। বাকিরা ক্যান থেকে খাবার খাচ্ছে। এমন সময় শুয়োর জন এল। কোপজে থেকে নিচে নেমে এলেন লোথার।
“দেরি করেছো।” জনের বুকের কাছটায় খামচে কাছে টেনে গন্ধ শুঁকে জানালেন, “তোমার মত বদমাশ আর হয় না।”
“এক ফোঁটাও না মাস্টার। আমার বোনের কুমারীত্বের কসম।”
জনের পোঁটলা খুলে ভয়ংকর কেপ স্মোক ব্রান্ডির বোতল বের করলেন। লোথার। আলোর কাছে ধরতেই দেখা গেল ভেতরের গাঢ় বাদামি বিষাক্ত পানি।
“গ্রামে কি দেখলে?” বোতলটাকে আবার পোটলার ভেতরে রেখে দিয়ে জানতে চাইলেন লোথার।
“ক্যাম্পে সাতটা সহিস।”
“আমি তো শুনেছি পাঁচটা।
“সাত।” একেবারে নিশ্চিত শুয়োর জন।
“আর সাদা অফিসার?”
“তারা সবাই গতকাল আরো ঘোড়া কেনার জন্য অটজিওনোঙ্গতে গেছে।”
“এক ঘণ্টার মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে।” সূর্যের দিকে তাকিয়ে হিসাব করে জানালেন লোথার, “যাও, পোটলা নিয়ে ক্যাম্পে যাও।”
“কী বলব?”
“বলবে অনেক কম দামে বেচছে, তারপর ফ্রি একটু টেস্ট করতে দেবে। মিথ্যে বলায় তো তোমার জুড়ি নেই। তাই যা খুশি বলে দিও।”
“আর যদি না খায়?”
লোথার হাসলেও কোনো উত্তর দিলেন না। জানেন এর সম্ভাবনা শূন্য।
“চাঁদ গাছের মাথায় উঠে এলেই আমি চলে আসব। কাজ করার জন্য তুমি আর তোমার ব্র্যান্ডি হাতে চার ঘণ্টা সময় পাবে।”
শুয়োর জন কাঁধের ওপর পোঁটলাটা তুলে নিতেই কাঁচের বোতলের টুংটাং শব্দ শোনা গেল।
“আরেকটা কথা শুয়োর, নিজে কিন্তু ভদ্র হয়ে থাকবে। নয়ত আমি তোমার গলা কাটব।”
এদিকে নিজের জায়গা থেকে দূরবিন দিয়ে সবকিছু দেখলেন লোথার। প্রথমে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যের দল জনকে বাধা দিলেও একটু পরেই ঢুকতে দিল। একই সাথে শুয়োরের পোটলার মধ্যেও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল সবাই।
