“আর কোথাও কি সুখী হতে পারব?” আপন মনেই ভাবলেন লোথার; কেঁপে উঠল সকল প্রতিজ্ঞা। কিন্তু পেছনে তাকাতেই ম্যানফ্রেডকে দেখে মনে হল, “ছেলের জন্য এ সিদ্ধান্তটা কি ঠিক আছে? ওকে কি আমিই দেশান্তরীর পথে ঠেলে দিচ্ছি না?”
বহু কষ্টে মাথা ঝাঁকিয়ে সব দুশ্চিন্তা সরিয়ে দিলেন লোথার। তারপর ম্যানফ্রেডকে কাছে ডেকে আস্তে আস্তে আস্তানা থেকে বেরিয়ে একটু দূরে চলে এলেন। যেন অন্য কেউ তাদের কথা শুনতে না পায়। ছেলেকে জানালেন, “আমাদের সবকিছু চুরি করে নিয়ে নেয়া হয়েছে ম্যানি। আইনের চোখে হয়ত নয়; কিন্তু ঈশ্বর আর প্রকৃতির বিধাতা ঠিকই জানেন। তাই নিজেদের জিনিস আমরা আবার ফিরিয়ে আনব। কিন্তু এতে করে ম্যানি, ইংরেজদের আইন আমাদেরকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেবে। আর এই কারণেই আমাদেরকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হবে। তবে ওরাও ঠিক বুনো জানোয়ারের মত তাড়া করবে। তাই সাহস আর বুদ্ধি খাটিয়েই কেবলমাত্র টিকে থাকা সম্ভব।
চোখ বড় বড় করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ম্যানফ্রেড। উনি যে তার সাথে সবকিছু শেয়ার করছেন তাতেই সে উত্তেজিত বোধ করছে।
“আমরা উত্তরে এগোব। সেখানে ভালো খামারের জমি আছে। স্বগোত্রীয় অনেকেই এরই মাঝে চলেও গেছে। নাম বদলে নতুন একটা জীবন পাব তাহলে।”
“কিন্তু সারাহ?” বদলে গেল ম্যানফ্রেডের অভিব্যক্তি।
প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গেলেন লোথার, “আমরা শিকার করব আর খামারের কাজ করব।” মনোযোগ দিয়ে শুনলেও নিষ্প্রভ হয়ে গেল ম্যানফ্রেড। সে রাতে অন্যরা ঘুমিয়ে পড়ার পরেও বহুক্ষণ জেগে থেকে সারাহর কথা ভাবল। কম্বলের নিচে যেন পাশেই টের পেল মেয়েটার অস্তিত্ব : “ওই আমার একমাত্র বন্ধু।”
কিন্তু হঠাৎ করেই অদ্ভুত একটা শব্দ কানে যেতেই বাস্তবে ফিরে এল ম্যানফ্রেড। নিচের সমভূমি থেকে আসা চিৎকারটা শুনে উঠে বসলেন লোথার। চট করে কম্বলটা সরাতেই কোমর অব্দি উনাক্ত হয়ে গেল। ভয়ংকর শব্দটা আবার শোনা গেল। কোথায় যেন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কোনো দানব।
“এটা কী পা?” সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল ম্যানফ্রেডের ঘাড়ের লোম।
“সবাই বলে সবচেয়ে সাহসী মানুষটাও নাকি প্রথমবার এই ডাক শুনে আধমরা হয়ে যায়।” নরম সুরে ছেলেকে জানালেন লোথার, “এটাই ক্ষুধার্ত কালাহারি সিংহের শিকারের গর্জন বেটা!”
***
সকাল হতেই পাহাড় থেকে নেমে এল পুরো দল। সবার আগে হাঁটছেন লোথার। সমভূমিতে পৌঁছে ছেলেকে নিজের পাশে ডেকে নিয়ে বললেন, “তুমি তো ওর আওয়াজ শুনেছো, এবার দেখো পায়ের ছাপ।” হলদে নরম মাটিতে গভীরে দেবে গেছে ডিনার প্লেটের সাইজের একটা দাগ।
“এক নিঃসঙ্গ বুড়ো কেশরঅলা সিংহ।” রেখাটাকে হাত বোলালেন লোথার। আগেও তাকে বহুবার এমনটা করতে দেখেছে ম্যানফ্রেড। “দেখো কেমন করে গোড়ালির ওপর নিজের ভার দিয়ে হেঁটে বেড়ায় পশুরাজ। হয়ত র্যাঞ্চের কাছাকাছি থাকতে চায়। কারণ শাবকদেরকে ধরাটা সহজ।”
নিচু হয়ে কাঁটা ঝোঁপের তলা থেকে কিছু একটা কুড়িয়ে নিলেন লোথার। তারপর সোনালি লাল চুলের ছোট্ট একটা গোছা ম্যানফ্রেডের হাতে দিয়ে বললেন, “দেখো, তোমার জন্য নিজের কেশরের নমুনা রেখে গেছে।”
এরপর সবাইকে নিয়ে র্যাঞ্চে চলে এলেন। পুরনো জার্মান দুৰ্গটাকে আসলে হেরোরো রেজিমেন্ট রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বহুদূর থেকেই তাদের আসতে দেখেছেন কাউন্ট। লোথারের মায়ের প্রজন্মের হলেও ভদ্রলোক এখনো বেশ লম্বা আর ঋজুদেহী। সোয়ার্ট হেনড্রিককে কর্মচারীদের কোয়ার্টারে পাঠিয়ে দিলেও লোথার আর ম্যানফ্রেডকে ঠাণ্ডা আর অন্ধকার সেন্ট্রাল হলে নিয়ে এলেন। এখানে আগেই জার্মান বিয়ার আর জিনজার বিয়ার রেখে গেছেন কাউন্টেস।
গোসল করার পরে পরিষ্কার ইস্ত্রি করা পোশাক এনে দিল পরিচারকদের দল। ডিনারে এল এস্টেটের গরুর মাংস আর অত্যন্ত উপাদেয় রাইন ওয়াইন, আর তারপর হরেক পদের টার্ট আর পুডিং দেখে ম্যানফ্রেডের খুশি আর ধরে না। অন্যদিকে এতদিন পরে সভ্য জাতের বই আর সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করতে পেরে লোথারও আনন্দিত হলেন।
একটু পরে ম্যানফ্রেডকে হেরেরো পরিচারক সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর সিগার টানতে গিয়ে লোথারকে কাউন্ট জানালেন, “উইন্ডহক থেকে তোমার পাঠানো চিঠি পেয়েছি। দুর্ভাগ্যের কথা শুনে সত্যিই খারাপ লেগেছে। সময়টা আমাদের সবার জন্যই খারাপ আসলে। তোমার স্বর্গত মা অনেক ভালো একজন নারী ছিলেন। উনার ছেলের জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না। যাই হোক”।
কথাগুলো শুনে দমে গেলেন লোথার।
“তোমার চিঠি পাবার মাত্র দু’সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনির পারচেজিং অফিসারের কাছে সমস্ত বাড়তি পশুদেরকে বিক্রি করে দিয়েছি। এখন কেবল নিজেদেরগুলো আছে।”
যদিও আসার সময় র্যাঞ্চের চারপাশে চল্লিশটা উকৃষ্টমানের ঘোড়া চড়তে দেখেছেন, কাউন্টের কথা শুনে মাথা নাড়লেন লোথার।
“কিন্তু আমার কাছে এক জোড়া অসাধারণ খচ্চর আছে বেশ বড়সড়। তোমাকে একেবারে স্বল্পমূল্যে দেব, ধরো পঞ্চাশ পাউন্ড।”
“জোড়া?” জানতে চাইলেন লোথার।
“না, না, একেকটা পঞ্চাশ পাউন্ড।” দৃঢ়তার সাথে জানালেন কাউন্ট, “বন্ধুকে কখনো টাকা ধার দিতে নেই। তাহলে টাকা আর বন্ধু দুটোই হারাবে।”
এ কথায় কান না দিয়ে পুরনো প্রসঙ্গটা তুললেন লোথার। “আর্মি অফিসার কি এ অঞ্চলের সব খামার থেকে ঘোড়া কিনেছে?”
